স্মৃতিতে-ভালোবাসায় আলেয়া চৌধুরী

বিজ্ঞাপন

, যু

default-image

নীরবে-নিভৃতে চলে গেলেন একজন কবি, একজন সংগ্রামী নারী আলেয়া চৌধুরী। সৃষ্টিকর্তা মাঝেমধ্যে বড়ই একচোখা। তা না হলে যে মানুষটি সারা জীবন কেবল কষ্টই করে গেলেন, মৃত্যুকালেও কেন তাঁকে দিলেন না এতটুকু শান্তি! পেলেন না প্রিয়জনের হাতের কোমল স্পর্শ।

আলেয়া চৌধুরীকে আমি প্রথম দেখেছিলাম উত্তর আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ‘নারী’ পত্রিকার প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে। ২০১৫ সালের ২১ মার্চ নিউইয়র্কে আসি আমি। একজন নারী হিসেবে দেশে আমার বিভিন্ন তিক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতি তো ছিলই, তার সঙ্গে যুক্ত হলো এ দেশের কিছু নারীর বিভিন্নভাবে নির্যাতিত ও হয়রানি হওয়ার ঘটনা। তাই মনে মনে ঠিক করলাম নারীদের জন্য কিছু করার। অবশেষে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশ করলাম নারীদের জন্য মাসিক পত্রিকা নারী।

এ দেশে এসে কয়েক মাসের মধ্যে একজন নারী একটি পত্রিকা বের করবেন এবং তা–ও আবার ‘নারী’ নামে!Ñবিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারলেন না অনেকেই। তাই প্রথম দিকে বেশ সমালোচনায় পড়তে হলো। তবে মজা পেতাম তখন, যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পত্রিকা বিলি করার সময় দেখতাম আগ্রহভরে হাত বাড়াচ্ছেন নারীদের পাশাপাশি অনেক পুরুষ। পত্রিকাটি দেখে অনেকে প্রশংসাও করলেন। সব প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে নারী যখন ১১ মাসে পড়ল, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম নারীর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান করার। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নিলাম আমেরিকায় বসবাসরত কিছু গুণী নারীকে সম্মাননা জানানোর। যদিও বাংলাদেশের মতো এ দেশেও সম্মাননা–বাণিজ্য আছে, তবে আমি চেষ্টা করলাম এসব গুণী নারীকে সত্যিকারের সম্মান দিতে। সিলেকশনের বিষয়ে প্রাধান্য দিলাম সিনিয়রদের। ইচ্ছে ছিল প্রতিবছর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে এই সম্মাননা দিয়ে যাব অন্য সব গুণী নারীকেও। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে পরবর্তী সময়ে আমার সেই স্বপ্নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারিনি।

প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে সম্মাননা জানানোর জন্য একটি কমিটি গঠন করা হলো। সেই কমিটিতে লেখক পূরবী বসু, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, খানস টিউটোরিয়ালের চেয়ারপারসন নাঈমা খানসহ আরও অনেকে ছিলেন। অবশ্য তাঁরা সবাই তখন নারী পত্রিকার উপদেষ্টাও ছিলেন। সবার সিদ্ধান্তে ঠিক হলো এ বছর আমরা সম্মাননা দেব সাংবাদিক-সমাজসেবক নূরজাহান কাদের, লেখক-সাংবাদিক দিলারা হাশেম, লেখক-সমাজসেবক নূরজাহান বোস, নাট্যজন রেখা আহমেদ এবং শিক্ষক ও সমাজসেবক তাহমিনা জামানকে। সংবাদটি প্রকাশ করতে আমরা বিভিন্ন পত্রিকায় নিউজ পাঠালাম এবং যথাসময়ে তা প্রকাশিত হলো। খবরটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর কয়েকজনের কাছ থেকে ফোন পেলাম আলেয়া চৌধুরীকে সম্মাননা দেওয়ার জন্য। যাঁরা ফোন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কবি নাসরিন চৌধুরী অন্যতম। আমরা পড়লাম বিপদে। আমাদের নিউজ ছাপা হয়ে গেছে, ক্রেস্ট বানিয়ে ফেলেছি এবং অনুষ্ঠানের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি! তা ছাড়া আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল প্রতিবছর আমরা পাঁচজন করে নারীকে সম্মাননা দেব। সমাধান দিলেন পূরবীদি। তিনি বললেন, ‘তাহলে আমরা আলেয়া চৌধুরী আর লিজি রহমানকে বিশেষ কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ফুল দিয়ে সম্মাননা দেব এবং সবার সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করব। এরপর লিজি রহমান এবং আলেয়া চৌধুরীর নামের সঙ্গে যুক্ত হলো আরও দুটি নাম—রুবাইয়া রহমান ও রোকেয়া আক্তার। রুবাইয়া রহমান অটিস্টিক শিশুদের জন্য এ দেশে কাজ করছেন নিরলসভাবে এবং রোকেয়া আক্তার কাজ করছেন নারীদের নিয়ে।

অবশেষে ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর জ্যাকসন হাইটসের জুইশ সেন্টার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো নারীর প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে পূরবীদি পরিচয় করিয়ে দিলেন আলেয়া চৌধুরীর সঙ্গে। ব্যস্ততার মধ্যেও ছোটখাটো মানুষটিকে অবাক হয়ে দেখছিলাম বারবার। কারণ, ইতিমধ্যেই পূরবীদি এবং অন্যদের কাছ থেকে বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু সংবাদ জানতে পেরেছিলাম তাঁর সম্পর্কে। কী অসীম ক্ষমতা লুকিয়ে আছে এ মানুষটির মাঝে! মনে মনে ভাবছিলাম সে কথা।

অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত ১১টা বেজে গেল। বারবার সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার তাগাদা দিচ্ছিল মিলনায়তন কর্তৃপক্ষ, তাই সেদিন আর কোনো কথা হলো না আলেয়া চৌধুরীর সঙ্গে। দু–তিন দিনের মধ্যে ফোন পেলাম তাঁর কাছ থেকে। অনেক কথা বললেন নিজে থেকেই। সেখানে সুখের কথার চেয়ে দুঃখ আর বেদনার কথাই বেশি। ছোটবেলা থেকে এত বেশি দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি যে নতুন করে আর কারও কষ্টের কথা শুনতে ভালো লাগে না। তবে শুনতে হলো আমাকে। কীভাবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজের গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে, কীভাবে একগাদা পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে একাকী নারী মাছ ধরার নৌকায় করে অথই সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিলেন আমেরিকায়, কীভাবে ক্যানসার এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে একাকী জীবন পার করছেন এ দেশে—এসব কথা শুনতে শুনতে নিজের অজান্তে চোখ ভিজে উঠেছিল জলে। কেমন যেন স্বজন মনে হয়েছিল তাঁকে। এরপর তিনি ফোন করতেন মাঝেমধ্যেই। কখনো কাঁদতেন, কখনো হাসতেন ফোনের মধ্যে। এভাবে জড়িয়ে পড়লাম তাঁর সঙ্গে এক গভীর মমতার বন্ধনে।

default-image

ধীরে ধীরে আলেয়াও জড়িয়ে পড়লেন আমার সৃজনশীল কাজগুলোর সঙ্গে। প্রায় প্রতি সংখ্যায়ই তাঁর কবিতা পাঠাতেন নারী পত্রিকায়, সেগুলো ছাপা হলে খুব খুশি হয়ে ফোন করতেন। ২০১৭ সালে যখন আমি ও পূরবীদি মিলে সৃজনশীল নারীদের কাজগুলো অন্য ভাষাভাষীদের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তুললাম ‘সাউথ এশিয়ান ক্রিয়েটিভ উইমেন’, তখন আলেয়া সেখানেও যোগ দিলেন। এখনো সংগঠনের ওয়েবসাইটের ওয়ালে ভলান্টিয়ারের পাতায় রয়েছে তাঁর ছবি। তবে আমি জানি, আর বেশি দিন রাখতে পারব না ছবিটি সেখানে। অচিরেই একটি শোক সংবাদ প্রকাশ করে ওয়াল থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে তাঁর ছবিটি। আমরা আমেরিকায় বসবাসরত ৩৬ জন বাঙালি নারীর লেখা ছোটগল্প নিয়ে একটি ইংরেজি বই প্রকাশ করেছিলাম সাউথ এশিয়ান ক্রিয়েটিভ উইমেন থেকে, সেখানেও ছিল আলেয়ার লেখা। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি ছুটে এসেছিলেন অসুস্থ শরীর নিয়েও।

২০১৮ সালের এক সকালে আলেয়া ফোন করলেন আমাকে। খুব কাঁদছিলেন ফোনের মধ্যে। আগামী সপ্তাহে তাঁর একটি অপারেশন হবে। কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছিলেন, ‘আমার মন বলছে আমি এবার বাঁচব না, আপনার সাথে আমার আর দেখা হবে না।’ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘কাঁদবেন না আলেয়া আপা, আপনার কিছুই হবে না, সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে।’ আলেয়ার কান্না কিছুতেই থামে না। এরপর আমি তাঁকে বললাম, ‘দ–তিন দিনের মধ্যে আপনাকে দেখতে আসছি আমি।’ শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। সে সময় কবি রওশন হাসান ছিল আমার বাসায়। এ কথা শুনে রওশনও যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। শুনে খুশি হলেন আলেয়া। উল্লেখ্য, রওশন আলেয়ার সৌজন্যে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান করেছে নিউইয়র্কে।

আলেয়া থাকেন নিউইয়র্কের রকল্যান্ডে, নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ড্রাইভের দূরত্বে। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে কথা তো দিলাম, এখন এত দূরে, অচেনা জায়গায় দুজন নারী যাব কীভাবে! চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি ও রওশন। একমাত্র উপায় আমার স্বামী তপন। তবে ওর এ সপ্তাহের ছুটি শেষ, আলেয়ার অস্ত্রোপচারের আগে আর কোনো ছুটি নেই। অবশেষে সমস্যার সমাধান করে দিল তপন নিজেই। বলল, ওই দিন সে সিক কল দেবে অফিসে।

নির্দিষ্ট দিনে খুব ভোরে উঠে আলেয়ার জন্য পোলাও, শর্ষে ইলিশ এবং মুরগির মাংস ভুনা করে নিলাম। শর্ষে ইলিশ নেওয়ার পেছনে একটি কারণ ছিল। একবার পূরবীদির সঙ্গে আলেয়া বেড়াতে এসেছিলেন আমাদের বাসায়। সেদিন দুপুরে পূরবীদি আর জ্যোতিদার খাওয়ার কথা ছিল আমাদের বাসায়। তবে এখানে আসার আগে দিদি আরেকজনের বাসায় গিয়েছিলেন এবং দিদিদের সেখান থেকে জোর করে খাইয়ে দিয়েছিল। আমি যাতে মন খারাপ না করি, তাই দিদি আমার রান্না করা খাবারগুলো বক্সে করে দিয়ে দিতে বললেন। সে সময় আমি আলেয়াকেও অন্য একটি বক্সে শর্ষে ইলিশের তরকারি দিয়েছিলাম। ওর নাকি খুব ভালো লেগেছিল শর্ষে ইলিশের তরকারি। এরপর ফোনে যখন ওর সঙ্গে কথা হতো, তখন মাঝেমধ্যেই বলত শর্ষে ইলিশের কথা।

default-image

আমাদের পেয়ে শিশুদের মতো উচ্ছল হয়ে উঠল আলেয়া। খুশিতে আমাদের কোথায় বসাবে, কী করবে, তার কোনো ঠিক নেই। লিভিং রুমের দেয়ালে টানানো বিভিন্নজনের সঙ্গে ছবি, যারা একসময়ে ক্ষণিকের অতিথি হয়েছিলেন আলেয়ার বাসায়। সেখানে কবি শামসুর রাহমানের ছবিও ছিল। রওশন, আলেয়ার জন্য চমৎকার একটি শাল নিয়ে গিয়েছিল, সেটি পরিয়ে দিল তাঁর গায়ে। এরপর আলেয়ার সঙ্গে অনেকগুলো ছবি তুললাম আমরা। এবার বিদায়ের পালা। আমাকে আর রওশনকে জোর করে শাড়ি, কিছু ইমিটেশনের গয়না এবং কিছু কাচের অ্যান্টিক থালাবাটি দিল। আমরা যতই বলি ভাড়া বাড়িতে এসব রাখার সমস্যা হবে, ও ততই জোর করতে থাকে নেওয়ার জন্য। সবশেষে মোক্ষম অস্ত্র, ‘আর যদি আমি না ফিরি’ সঙ্গে চোখের জল। আর কোনো প্রতিবাদ করতে পারলাম না আমরা। এরপর আলেয়া আমাদের জোর করে নিয়ে গেল একটি ফাস্টফুডের দোকানে। সবার জন্য বার্গার আর কফির অর্ডার দিল, আমাদের বিল দিতে দিল না কিছুতেই।

আমরা চলে আসার সময় খুব কাঁদছিলেন আলেয়া। কথা দিলাম, আবার আসব। এর পরেরবার যখন আসব, তখন এক রাত থাকব তাঁর কাছে। সারা রাত ধরে চলবে কবিতা আর গানের আড্ডা। কিন্তু কথা রাখতে পারিনি আমি, আর কখনো যাওয়া হয়নি আলেয়ার বাসায়। এক সপ্তাহ আগে তিনি ফোন করেছিলেন আমায়, ফোন সাইলেন্ট ছিল, তাই টের পাইনি। যখন দেখলাম তখন অনেক রাত, ভেবেছিলাম পরের দিন ফোন করব। কীভাবে যেন ভুলে গেলাম তা। খুব খারাপ লাগছে এখন। আর কখনো সে ফোন করবে না আমায়, কোনো দিন শোনাবে না তাঁর কষ্টের কাহিনিগুলো।

তবে তাঁকে আমার কিছুটা দুঃখবিলাসী মনে হয়। জীবনের প্রথম দিকে তিনি খুব কষ্ট করলেও শেষ জীবনটা অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারতেন আরাম-আয়েশে। দেশে ভাইবোনদের জন্য পাঁচতলা একটি বাড়ি করে দিয়েছেন, ধানমন্ডিতে আছে দুই রুমের একটি ফ্ল্যাট। নিউইয়র্কের রকল্যান্ডে আছে কয়েকটি ফ্ল্যাট এবং একটি বিশাল বাড়ি। কেবল এ দেশে ছিল না তাঁর কোনো আত্মীয়স্বজন। কারণ, এ দেশে তিনি এসেছিলেন একা। এরপর অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাঁকে এবং সরকারের কাছ থেকে নিতে হয়েছে ফুডস্ট্যাম্পসহ বিভিন্ন সাহায্য–সহযোগিতা। যে কারণে এ দেশে নিজের কোনো আত্মীয়কে আনতে পারেননি। তবে তিনি নির্দ্বিধায় এ দেশের সবকিছু বিক্রি করে দেশে গিয়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে শান্তিতে কাটাতে পারতেন বাকি জীবনটা। তাহলে হয়তো আর এ রকম করুণ মৃত্যুর শিকার হতে হতো না তাঁকে।

এ পৃথিবীতে অনেক কষ্ট পেয়েছেন তিনি। দোয়া করি ওপারে যেন পরম শান্তিতে থাকতে পারেন প্রিয় আলেয়া চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হবে না আর কখনো, তবে তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে এবং তাঁর সৃজনশীল লেখনীর মধ্যে।

*লেখক: ‘নারী’ পত্রিকার সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন