বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি ছিল ইউরোপ মহাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো সংঘটিত যুদ্ধ, যেখানে ৭৬ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। তাই স্লোভেনিয়াকে অপেক্ষাকৃতভাবে নতুন একটি রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিলেও ভুল হবে না। এ কারণে হয়তোবা দেশটি এখনো আমাদের কাছে সেভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির পর্যটনশিল্প নতুন মাত্রা পেয়েছে। সুউচ্চ আল্পস পর্বতমালা, বিভিন্ন ধরনের হ্রদ ও স্কি রিসোর্টের জন্য দেশটি ইতিমধ্যে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছে এক গন্তব্যস্থল হয়ে উঠেছে। হাঙ্গেরির সীমানা পেরিয়ে যখন স্লোভেনিয়াতে প্রবেশ করা হয়, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুউচ্চ বিভিন্ন ধরনের পর্বতমালা, যা এককথায় অসাধারণ।

default-image

স্লোভেনিয়াকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে না। কেননা, সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে স্লোভেনিয়ার ভূপ্রকৃতির সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়, আল্পস পর্বতমালাবিধৌত দুটি দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রায় একই ধরনের। উপরন্তু স্লোভেনিয়া সুইজারল্যান্ডের তুলনায় অনেকটা কম ব্যয়বহুল।

লেক বেল্ড ও পোস্তয়ানা কেভ—এ দুটি স্থান পরিদর্শনের জন্য বর্তমানে স্লোভেনিয়াতে সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগম হয়। তাই স্লোভেনিয়াতে আসার পর সবার প্রথমে যে স্থানটি পরিদর্শনের জন্য আমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ কাজ করেছিল, সেটি হচ্ছে লেক ব্লেড।

এ পর্যন্ত কয়েকবার লেক ব্লেড ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে, তবে গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারির ভ্রমণ ছিল একটু আলাদা। প্রথমত, ২৯ ফেব্রুয়ারি দিন সাধারণভাবে লিপ ডে হিসেবে পরিচিত। কেননা, প্রতি চার বছর পরপর দিনটি আমাদের সবার দুয়ারে সমাগত হয়। দিনটিকে তাই বিশেষভাবে রাঙিয়ে তুলতে সেদিনের এ সফর। লেক ব্লেডের পাশাপাশি বাড়তি পাওনা হিসেবে ছিল লেক বোহিনি এবং স্লোভেনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ট্রিগলাভ দেখার সুযোগ।

ইউরোপে তখনো করোনার প্রলয়ংকরী তাণ্ডব শুরু হয়নি, যদিও কয়েকটি দেশে ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এমনকি ২৯ ফেব্রুয়ারির পাঁচ দিন পর অর্থাৎ ৪ মার্চ স্লোভেনিয়াতেও প্রথম কোনো ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। করোনা মহামারি শুরুর আগে আমাদের অনেকের জীবন সত্যি অনেক সুন্দর ছিল, সবকিছু অত্যন্ত স্বাভাবিক গতিতে চলছিল। জীবনের স্বাভাবিক ছন্দও বজায় ছিল, কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ক্ষুদ্র কয়েক ন্যানোমিটার একত্র এক বস্তুর তাণ্ডবে কীভাবে আমাদের সবার জীবন তছনছ হয়ে পড়েছে, সেটা বিশ্লেষণ করতে হলে এ ট্যুরটির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। কঠিন এক বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে তাই আজও আমার স্মৃতিপটে বারবার ভেসে আসে ২৯ ফেব্রুয়ারি সে দিনের কথা।

default-image

এক্সচেঞ্জ স্টাডি সম্পন্ন করতে আমাদের ইউনিভার্সিটিতে তখন বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর আসেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন আলেকজান্ডার চিস্টিয়াকোভ, ভালেরিয়া কর্টুন ও নুরানা গাম্বারোভা। ডরমেটরিতে এ তিনজন ছিলেন প্রতিবেশী, একসঙ্গে আমরা এক সেমিস্টারে পড়েছি। লকডাউনের দিনগুলোতে যখন বাধ্য হয়ে সবাইকে গৃহবন্দী থাকতে হয়েছিল, সে সময়ে পারস্পরিক বন্ধুত্বভাবাপন্ন সম্পর্কগুলো উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে ধরা দিয়েছিল আমাদের সবার মধ্যে।

আলেকজান্ডার চিস্টিয়াকোভকে আমরা শাশা নামে সম্বোধন করতাম, আর ভালেরিয়া কর্টুনকে ডাকতাম লেইরা নামে। লেইরা যদিও জন্মসূত্রে ইউক্রেনের অধিবাসী, তবে তিনি রাশিয়াতে বসবাস করেন। শাশা ও লেইরার উভয়ই রাশিয়ার রোস্টোভ অন ডন ইউনিভার্সিটির স্নাতক শিক্ষার্থী, অন্যদিকে নুরানা ছিলেন আজারবাইজানের অধিবাসী। আজারবাইজানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর গাঞ্জার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি স্নাতক সম্পন্ন করছেন।

২৯ ফেব্রুয়ারিকে উদ্‌যাপন করার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম লেক ব্লেড ও লেক বোহিনি—এ দুই স্থান ভ্রমণ করব। স্লোভেনিয়াতে গণপরিবহন পরিষেবার মান খুব একটা ভালো নয়, এ জন্য বলতে গেলে প্রাপ্তবয়স্ক সবাই নিজস্ব গাড়ি ব্যবহার করেন। এমনও অনেক পরিবার আছে স্লোভেনিয়াতে যে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের পৃথকভাবে নিজস্ব গাড়ি রয়েছে। সরকারও পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ওপর তেমন একটা জোর দেয় না, তাই গণপরিবহন পরিষেবার ওপর নির্ভর করে স্লোভেনিয়ার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা বোকামি বলা চলে। যাঁদের নিজস্ব গাড়ি নেই, তাঁরা স্লোভেনিয়ার অভ্যন্তরে এক শহর থেকে থেকে অন্য শহরে যাতায়াত করতে প্রিভোজি নামক একধরনের কার রাইড শেয়ারিং সার্ভিস ব্যবহার করেন, তবে ব্যক্তিগত কোনো ট্যুরের কাজে প্রিভোজির ওপর নির্ভর করা যায় না। এ জন্য আমরা সবাই এক দিনের জন্য গাড়িভাড়া নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। চার সিটের একটি গাড়ি ভাড়া নিতে ৮০ ইউরোর মতো খরচ হয়েছিল। সঙ্গে আনুষঙ্গিক হিসেবে ছিল জ্বালানির খরচ, যা নিজেদের বহন করতে হয়েছিল।

default-image

রাজধানী লুবলিয়ানা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়, প্রথম গন্তব্য ছিল ট্রিগলাভ পর্বত। লুবলিয়ানা থেকে লেক ব্লেডের অবস্থান ৩৪ মাইল উত্তর-পশ্চিমে এবং লেক বোহিনির অবস্থান ৫২ মাইল উত্তর-পশ্চিমে।

ট্রিগলাভ ন্যাশনাল পার্কটি স্লোভেনিয়ার একমাত্র ন্যাশনাল পার্ক, ট্রিগলাভ ন্যাশনাল পার্কের মোট আয়তন ৩৪০ বর্গমাইল, যা দেশটির মোট আয়তনের ৪ শতাংশ। এ অঞ্চলের মূল আকর্ষণ হচ্ছে জুলিয়ান আল্পস পর্বতমালা। কথিত আছে, রোমের সম্রাট জুলিয়াস সিজার নাকি প্রথম স্লোভেনিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আল্পস পর্বতমালার এ অংশকে আবিষ্কার করেছিলেন। এ জন্য একে জুলিয়ান আল্পস নামে ডাকা হয়। ট্রিগলাভ ন্যাশনাল পার্কের কেন্দ্রস্থলে ট্রিগলাভ পর্বতের অবস্থান। তিন শৃঙ্গবিশিষ্ট এ পর্বত স্লোভেনিয়ানদের অন্যতম জাতীয় প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়, এমনকি স্লোভেনিয়ার জাতীয় পতাকায়ও ট্রিগলাভ পর্বতের ছাপ রয়েছে। স্লোভেনিয়ানদের মধ্যে একধরনের বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত রয়েছে, কোনো মানুষ তত দিন নিজেদের প্রকৃত অর্থে স্লোভেনিয়ান হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে না, যত দিন না তিনি ট্রিগলাভের চূড়ায় আরোহণ করতে না পারেন। খ্রিস্টানিটি প্রসারের আগে স্লোভেনিয়ার বেশির ভাগ অধিবাসী ছিলেন প্যাগান, প্যাগানদের অনেকে বিশ্বাস করতেন ট্রিগলাভ পর্বতমালার উপরিভাগে তিন শিংবিশিষ্ট এক দানব বসবাস করে। ট্রিগলাভের তিনটি শৃঙ্গের মধ্যে অপেক্ষাকৃতভাবে একটি শৃঙ্গ উচ্চতার দিক থেকে সবার ওপরে। ৯ হাজার ৩৯৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এ শৃঙ্গ এখন পর্যন্ত স্লোভেনিয়াতে আবিষ্কৃত সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। শীতকালে ট্রিগলাভসহ আশপাশের পর্বতগুলো ঘন তুষারে ঢেকে যায়, তবে গ্রীষ্মকালে হাইকিং কিংবা মাউন্টেন ট্রেকিংয়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য অভিযাত্রিক এসব পর্বতে জড়ো হন। একদিন আমিও ট্রিগলাভ পর্বতের চূড়ায় পা রাখার স্বপ্ন দেখি, তবে এ জন্য ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু অনুশীলন প্রয়োজন।

default-image

স্লোভেনিয়ার উত্তর-পশ্চিমের অংশটি আশ্চর্য রকমের সুন্দর, বিভিন্ন ধরনের পর্বতমালার পাশাপাশি স্কি রিসোর্ট এবং ছোট–বড় বিভিন্ন হৃদ, জলপ্রোপাত এবং নদীর উপস্থিতি স্লোভেনিয়ার এ অংশকে রূপকথার রাজ্যে পরিণত করেছে। এখানকার প্রতিটি গ্রামই ছবির মতো সুন্দর, বিশেষত স্থানীয় স্থাপত্যকলার আদলে নির্মিত এসব গ্রামের ছোট ছোট ঘরবাড়িও এ সৌন্দর্যের অন্যতম প্রাণ। বব চ্যাপেক যদি কোনো দিন এ স্থানে বেড়াতে আসেন, তাহলে আমার বিশ্বাস তিনি এখানে ডিজনি সিরিজের কোনো অ্যানিমেশন নির্মাণ করার জন্য সবার আগে নিজেকে মনস্থির করবেন।

ট্রিগলাভের পর্বতশৃঙ্গ থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল লেক বোহিনি। ৩১৮ হেক্টর আয়তনের লেকটি স্লোভেনিয়ার সর্ববৃহৎ লেকগুলোর মধ্যে একটি। জুলিয়ান আল্পস পর্বতমালাসংলগ্ন বোহিনি উপত্যকায় এ লেকের অবস্থান। এটি মূলত একটি গ্ল্যাসিয়াল লেক। লেক বোহিনির প্রবেশমুখে একটি পাথরের তৈরি সেতু রয়েছে, সেতুর ধরে হাঁটলে ছোট একটি চার্চের দেখা মেলে। চার্চটি আনুমানিক ৭০০ বছরের পুরোনো, স্থানীয় লোকজন একে ‘চার্চ অব সেইন্ট জনস’ নামে অভিহিত করেন। উত্তর স্লোভেনিয়ার বিভিন্ন অংশের মতো বোহিনিতেও চ্যামোয়া নামক এক বিশেষ প্রজাতির ছাগলের প্রতিকৃতি পাওয়া যায়। চ্যামোয়া এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান এন্ডেমিক প্রাণী, যদিও জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এদের সংখ্যা আজ অনেকটা কমে এসেছে। স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে চ্যামোয়াকে ঘিরেও বিভিন্ন ধরনের জনশ্রুতির প্রচলন রয়েছে।

আগেই বলেছি, বাইরের দেশ থেকে যেসব পর্যটক স্লোভেনিয়াতে বেড়াতে আসেন, তাঁদের বেশির ভাগের প্রথম গন্তব্য হয় লেক ব্লেড। অনেকটা প্রত্যাশা নিয়ে আমরা লেক ব্লেডে যাই। কিন্তু লেক ব্লেড আমাদের কারও কাছে এতটা মোহিত রূপে ধরা দেয়নি, যেমনটি দিয়েছিল লেক বোহিনি। স্লোভেনিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনে বর্তমানে খুব একটা ধর্মের প্রভাব দেখা যায় না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষই সেভাবে ধর্মের প্রতি আস্থাশীল নয়। তাই বলে স্লোভেনিয়াকে নেদারল্যান্ডস কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর মতো প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দেওয়া যাবে, তেমনটিও নয়। লেক ব্লেড স্লোভেনিয়ানদের জাতীয় প্রতীক, মূলত দেশটির সাধারণ মানুষের জাতীয় জীবনে খ্রিস্টানিটির অংশ হিসেবে এ লেক ব্লেডকে দেখা হয়। ধারণা করা হয়, প্যাগানিজম থেকে দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে খ্রিস্টানিটির প্রসারের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল এ লেক বেল্ডকে ঘিরে। পুরো লেকটার চারদিকে একবার চক্কর দিলে প্রায় ছয় কিলোমিটারের মতো হাঁটা হয়ে যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর কোনো এক সময় সুইজারল্যান্ডের এক চিকিৎসক ব্লেডে বেড়াতে আসেন, পরবর্তী সময়ে তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। তিনি মূলত লেক ব্লেডকে দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন।

default-image

লেক ব্লেডের ঠিক মধ্যস্থলে ব্লেড আইল্যান্ড নামক ছোট্ট এক দ্বীপের উপস্থিতি রয়েছে। ব্লেড আইল্যান্ডের মূল আকর্ষণ হচ্ছে ‘প্রিমিলেজ চার্চ অব দ্য অ্যাজামশন অব মারিয়া’ নামক এক চার্চ। অনেকে আবার এ চার্চকে ‘চার্চ অব দ্য মাদার অব গড’ নামে অভিহিত করেন। এটি মূলত একটি ক্যাথলিক চার্চ, তবে খ্রিষ্টধর্ম প্রসারের আগে এ স্থানে প্যাগানদের তৈরি একটি মন্দির ছিল। ১১৪২ সালে প্রথম এ স্থানে একটি ক্যাথলিক চার্চ নির্মাণ করা হয়, সে সময় এই চার্চ তৈরি করা হয়েছিল ইটের সাহায্যে।

১৪৬৫ সালে লুবলিয়ানার প্রথম বিশপ জিগা ল্যামবার্গ এ চার্চকে সংস্কার করেন এবং চার্চটিকে মধ্যযুগীয় গথিক স্থাপত্যশৈলীর রূপদান করেন। সপ্তাদশ শতাব্দীতে পুনরায় চার্চটির নকশার পরিবর্তন করা হয় এবং আজকে আমরা যেভাবে চার্চটিকে দেখি, সেটি মূলত সে সময়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

চার্চের ভেতরে উইশিং বেল নামক এক বিশেষ ঘণ্টা রয়েছে। একটি মোটা দড়ি ধরে টান দিলে ঘণ্টাটি বেজে ওঠে। স্থানীয় অধিবাসীরা বিশ্বাস করেন, কেউ যদি এ ঘণ্টাটি বাজানোর পর তাঁর মনের কোনো ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, তাহলে তাঁর মনের আশা পূরণ হয়ে যায়। উইশিং বেল নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের জনশ্রুতির প্রচলন রয়েছে।

default-image

স্লোভেনিয়ানদের চোখে লেক ব্লেড হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক জায়গা, মূলত প্রেমিক-প্রেমিকারা বিয়ে করতে এখানে আসেন। স্বর্গসম পরিবেশ তাঁদের বিবাহের স্মৃতিকে মধুর করে তোলে। প্লেটনা নামক কাঠের তৈরি এক বিশেষ নৌকার সাহায্যে ব্লেড আইল্যান্ডে পৌঁছানো যায়। অতীতে ব্লেডের ওপর দিয়ে স্পিডবোট থেকে শুরু করে লঞ্চসহ বিভিন্ন ধরনের নৌযানের চলাচল ছিল, তবে পরিবেশদূষণের কথা চিন্তা করে বর্তমানে স্লোভেনিয়ার সরকার ব্লেডের ওপর পেট্রোলিয়াম চালিত সব নৌযানের চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। ব্লেড কমিউনিটির ৪০টি পরিবারই কেবল লেক ব্লেডের ওপর নৌযান পরিচালনা করতে পারে। প্লেটনা থেকে আইল্যান্ডে নেমে ৯৯টি পাথরের সিঁড়ি বেয়ে এ চার্চে প্রবেশ করতে হয়। যদি কোনো দম্পতি এ চার্চে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান, তাহলে বরের পক্ষ থেকে তাঁর কনেকে এ ৯৯টি পদক্ষেপ পর্যন্ত সে কোনোও প্রকারে বহন করতে বাধ্য। চার্চের পাশাপাশি ব্লেড আইল্যান্ডের অভ্যন্তরে ৫২ মিটার দৈর্ঘ্যের এক দুর্গ রয়েছে, এ ছাড়া রয়েছে শৌখিন কিছু মানুষের জনবসতি।

default-image

লেক ব্লেডের উত্তর-পূর্ব বরাবর রয়েছে ব্লেড ক্যাসল, আনুমানিক ১০০৪ সালে জার্মান রাজা দ্বিতীয় হেনরির পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রিক্সেনের বিশপ আলবুইনের নেতৃত্বে প্রথম এ দুর্গটির নির্মাণে কাজ শুরু হয়। যদিও ব্রিক্সেনের কোনো বিশপই এখানে কখনো বসবাস করেননি। তবে প্রতিরক্ষার কাজে সে সময় এ ক্যাসল ব্যবহার করা হতো। আলবুইনের হাত ধরে আধুনিক কালের ব্লেড কমিউনিটির গোড়াপত্তন ঘটে, একসময় পুরো ব্লেড কমিউনিটির শাসনভার বিশপদের হাতে ন্যস্ত ছিল এবং তাঁরা জনসাধারণের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করতেন। মধ্যযুগে এ ক্যাসলকে সংস্কার করা হয় এবং ক্যাসলের ভেতরে অতিরিক্ত কয়েকটি টাওয়ার যোগ করা হয়। ক্যাসলের অভ্যন্তরে একসময় জনবসতি গড়ে উঠেছিল। ব্লেড ক্যাসলের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে ১৩ ইউরো দিয়ে আলাদাভাবে টিকিট ক্রয় করতে হয়, তবে শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা ডিসকাউন্ট রয়েছে। ক্যাসল থেকে জুলিয়ান আল্পস পর্বতমালাবেষ্টিত লেক ব্লেডের এক অসাধারণ দৃশ্যের অবলোকন করা যায়। এ অঞ্চলের বিভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন সময়ে ব্লেডে বসবাস করা জনসাধারণের বিভিন্ন নিদর্শন দিয়ে পুরো ক্যাসলটিকে সাজানো হয়েছে।

default-image

ভোজনরসিকদের জন্য ব্লেডের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে এখানকার ক্রিম কেকের স্বাদ নিতে পারেন, ব্লেডের ক্রিম কেক সত্যি অনন্য। আর যাঁরা অ্যালকোহলিক বেভারেজের স্বাদ নিতে চান, তাঁদের জন্য রয়েছে ব্লেড ওয়াইন। লোকাল ট্যুরিস্টদের চোখে অবশ্য ব্লেডের চেয়ে বোহিনি অধিক সুন্দর, তাই যখন আমরা বোহিনিতে পা রাখি, খুব একটা বিদেশি পর্যটকের দেখা না পেলেও স্থানীয় জনসাধারণের সমাগম সেখানে ছিল ভরপুর। অন্যদিকে ব্লেডে লোকাল ট্যুরিস্টের তুলনায় বিদেশি পর্যটকের দেখা পেয়েছি বেশি। দুটি লেকই আমার কাছে অনন্যসাধারণ মনে হয়েছে। চারদিকে বরফে ঢাকা সবুজ পাহাড় এবং সেই সঙ্গে লেকের স্বচ্ছ জলরাশি প্রকৃতিপ্রেমী যেকোনো মানুষের চিত্ত হরণ করতে বাধ্য।

default-image

করোনা প্রাক্কালের স্বাভাবিক পৃথিবীতে এটি হয়তো সর্বশেষ কোনো স্মৃতি, যা সত্যি আমাদের সবাইকে আলাদাভাবে প্রশান্তি দান করেছিল, আর সেদিন ২৯ ফেব্রুয়ারি হওয়ায় সেদিনের সে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বাড়তি মাত্রা পেয়েছিল। এরপর প্রায় এক বছরের অধিক সময় পার হয়ে গিয়েছে, পুরো পৃথিবী আজ করোনা নামক এক ভয়াল থাবার আঘাতে পর্যুদস্ত। গত এক বছরে অনেক কিছুই সম্পূর্ণভাবে বদলে গিয়েছে, তবু মানুষ বাঁচে আশায়। হয়তোবা একদিন পৃথিবী থেকে করোনা শেষ হয়ে যাবে এবং সবকিছু তার আগের রূপে ফিরে আসবে। সেদিন এভাবে আবার বেরিয়ে পড়ব নতুন কোনো স্থানের সন্ধানে। আমিও তো এ বিশ্বজগৎটাকে আপন হাতের মুঠোয় পুরে দেখতে চাই।

* লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন