default-image

‘মা পুডল কুকুর কি? ’ কুকুর ছানা তার মাকে প্রশ্ন করে।
-পুডল কুকুর হলো সুন্দর কুকুর। বড়লোকের বাসার ড্রয়িংরুমের সোফায় ঘুমিয়ে থাকে। মালিক কিছু বলে না। বরং মালকিন ঘরভর্তি মানুষের সামনে আদর করে চুমু দেয়। মা কুকুর উত্তর দেয়।
‘সত্যি? ’
-হ্যাঁ। মালকিনের সখীরা ঈর্ষা নিয়ে তাকিয়ে থাকে মালকিন আর পুডল কুকুরের দিকে। আহারে, আমাদের স্ট্যাটাস কবে এ রকম হবে! কুকুরকে চুমু দিতে হলে স্ট্যাটাস তো সেই রকম হতে হবে। মা কুকুর সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে।
‘সত্যি মা। আমি কি কোনো মানুষের বাসায় থাকতে পারি না? ’
-‘নারে বাবা, আমরা হইলাম রাস্তার কুকুর। আমাদের জীবন রাস্তাতেই কাটবে। ’
মা কুকুর তার এই ছেলেটাকে নিয়ে খুব চিন্তিত। মানুষ নিয়ে তার অস্বাভাবিক কৌতূহল। এসব ভালো লক্ষণ না। অজানা ভয়ে কুকুর-মার বুক ধুকপুক করে। ইদানীং মানুষরাও সব ভয়ে ভয়ে থাকে। এই তো সন্ধ্যা হয়েছে মাত্র কিছুক্ষণ। রাস্তায় মানুষ আছে ঠিকই কিন্তু সবার চোখেমুখেই ভীতি। যাক, মানুষের ভয় নিয়ে মানুষ ভাবুক। আমার ছেলেমেয়েরা ভালো থাকলেই হলো।
‘মা, হিরোইনচি জলিল অন্ধকার কোনায় দাঁড়াইয়া আছে। ’ কুকুর ছানার ডাকে মা কুকুরের চিন্তায় বাধা পড়ে।

-‘তোকে না বলেছি মানুষের আশপাশে ঘুর ঘুর করবি না। তার উপর হিরোইনচি জলিলের মতো মানুষ। ’ মা ধমক দেয়।
এমন সময় হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। বাসের মধ্যে কে যেন পেট্রলবোমা মেরেছে। নিশ্চয় হিরোইনচি জলিলের কাজ। মুহূর্তে সাতজন মানুষ পুড়ে শেষ। মা কুকুর সংবিৎ ফিরে পেয়েই দেখে ছোটো ছেলেটা হিরোইনচি জলিলের পিছে দৌড়াচ্ছে। মা কুকুরও পিছে পিছে যায়।
হিরোইনচি জলিলের মনটা ভালো। কাজটা সহজ। রিস্ক আছে একটু। কিন্তু পেমেন্ট বেশ ভালো। একদিন কাজ করলেই ১০ দিনের নেশার পয়সা জোগাড় হয়ে যায়। এখন ট্যান্ডন হারুর কাছে যাচ্ছে পেমেণ্ট নিতে। এইসব কাজে পেমেন্টও নগদ।
‘স্লামালাইকুম হারু ভাই’। জলিল বলে। মা কুকুর আর কুকুর ছানা পাশে থেকেই সব শোনে।
-‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। এই নে তোর টাকা। টাকা নিয়ে তাড়াতাড়ি ভাগ। পরে খবর দিব। ’
‘হারু ভাই। পরেরবার টাকা বেশ দিতে হবে। রিস্ক অনেক। ’
-‘বেশ নখরা করিস না। কাজের লোকের অভাব আছে নাকি। যা এখন ভাগ। ’
‘ঠিক আছে হারু ভাই। এই পেমেন্টেই কাম করমু। খবর দিয়েন। যাই তাইলে। ’
ট্যান্ডন হারুর মনটাও বেশ ভালো। এতই ভালো যে পিছে পিছে যে এক মাদী কুকুর আর কুকুর ছানা আসছে, খেয়াল করল না। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে। আগে জনসভায় লোক সাপ্লাইয়ের কাজ করত। বছর ধরে ঐতিহাসিক জনসভা লেগেই থাকত। ভুখা নাঙ্গা মানুষও ছিল অনেক। সব দলের জনসভাতেই লোক সাপ্লাই করত। আয় রোজগার ছিল ভালোই। তারপর কি এক দিনকাল আসল। নেতারা মনে হয় সব হিজড়া হয়ে গেল। রাস্তায় নামতেই ভয় পায়। জনসভা তো দূরের কথা। নেতারা মনে হয় এখনো হিজড়া। নয়তো লুকিয়ে লুকিয়ে পেট্রলবোমা মারবে কেন। ‘ধুর, কী সব ফালতু কথা ভাবতাছি। আমদানি ভালো হইতাছে, এইটাই বড় কথা। নেতারা হিজড়া নাকি শেরের বাচ্চা, তাতে আমার কী? ’ এসব ভাবতে ভাবতেই ছোট নেতার হোটেলে চলে আসল।
‘আসো আসো হারু। তোমার কাজে আমি খুব খুশি। ’ ছোট নেতা খুশি খুশি ভাবে বলে।

default-image


-‘হুম ভাই। আপনারা তো আর জানেন না, ফিল্ডে কাজ করা কত কঠিন। পেমেন্টটা আর একটু না বাড়ালে আর তো পারতাছি না নেতা। ’
‘আর একটু ধৈর্য ধরো। লেটেস্ট খবর হলো, দল ক্ষমতার গদিতে যেতে আর বেশি বাকি নাই। এইবার ক্ষমতায় গেলে তোমার ব্যাপারটা আমি দেখব। এই ধরো পদ্মা সেতুতে লেবার সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাক্ট...’
‘আপনার দল ক্ষমতায় গেলে আমাকে কিছুদিন ইন্ডিয়া যেয়ে থাকতে হবে। তবে কিছুদিন পরেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। এসব তো জানা খেলা। ’ হারু মনে মনে বলে।
‘দেখো দেখো হারু, তোমার কাজের খবর টিভিতে দেখাচ্ছে। হারামি পাবলিকদের একটা শিক্ষা হচ্ছে। আরে হরতাল-অবরোধের মাঝে বাসা থেকে বের হবার দরকারটা কী? ’
টিভিতে একটা ছোট মেয়েকে দেখাচ্ছে। মুখের অর্ধেকটাই পোড়া। সেই অর্ধপোড়া মুখেই রাজ্যের মমতা। হারুর হঠাৎ নিজের ছোট মেয়ে জরিনার কথা মনে হয়। এই পোড়া মেয়েটার চেহারার সঙ্গে জরিনার চেহারার কি কোন মিল আছে? ধুর এসব ভাবার কি কোনো মানে আছে।
-‘নেতা টাকাটা দেন। ’ হারু বলে।
‘হুম। তুমি তাড়াতাড়ি বিদায় হও। বড় নেতা ফোন করেছে। এখনই নাকি এখানে আসবে। ’
হারু টাকা নিয়ে বিদায় হতেই বড় নেতার গাড়ি এসে থামে। বড় নেতার সঙ্গে তার বেয়াই সরকারি দলের নেতাও আসে। ছোট নেতার ভালো লাগে না। আরে এখন এই সময়ে এইভাবে কেউ চলাফেরা করে। আত্মীয়তা করবি ঘরের মধ্যে। বাইরে এইসব সাইনবোর্ড নিয়া ঘোরার দরকার কী।
-‘তোমার কাজে দল খুব খুশি। ’ বড় নেতা ছোট নেতাকে বলেন।
‘আপনাদের দোয়া বড় ভাই। ’
-‘আর শোনো, টাকা-পয়সা নিয়ে ভাবতে হবে না। কোনো সমস্যা হলেই আমাকে ফোন দিবা। এইবার মনে হয় সরকারকে ফালাইয়া দেওয়া যাবে। ’
‘বেয়াই আপনারা এইভাবে মানুষ পোড়াইয়া ভাবছেন ক্ষমতায় যাইতে পারবেন। ’ সরকারি দলের নেতা বলেন।

default-image

ছোট নেতা ‘বড় ভাই আপনারা কথা বলেন’ বলে সরে যায়।
-‘এইটা তো নতুন কিছু না। আপনারাও তো লগি-বৈঠা নিয়া আমাদের গদি থেকে নামাইয়া দিছিলেন। ’
‘তার পরও পাবলিক পোড়াইয়া মারা কি ঠিক? ’
-‘ধুর পাবলিক। পাবলিক ফরমালিন খাইয়া আস্তে আস্তে মরব আর না হয় বোমার আঘাতে হঠাৎ মারা যাবে। এইটা আপনিও জানেন, আমিও জানি। ’
‘তা ঠিক। পাবলিকের কথা থাক। আমাদের কথা বলি। আপনার বুদ্ধিমতো আপনার ছেলে আর আমার মেয়ের জন্য বিদেশে বাড়িঘর তো কেনা হয়ে গেছে। টাকা-পয়সাও পাঠানো হয়ে গেছে। এখন সময় সুযোগমতো ওদের চলে যেতে বলেন। ’
-‘এই তো একটা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করছেন বেয়াই। আমার বউ আর বেয়াইনকেও পাঠাইয়া দিতে হবে। আপনি আমি যে যখন বিপদে পড়ব, খালি টিকিট কেটে প্লেনে উঠলেই হবে। ’
নিশুতি রাত। রাস্তায় বাসের পোড়া কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু নাই। কুকুর-মাতা ছানাকে নিয়ে ঘুমাবার আয়োজন করছে...
‘মা ক্ষমতার গদি কী? ’ কুকুর ছানা জিজ্ঞেস করে।
-‘ওই যে কমিউনিটি সেন্টারের সামনের ডাস্টবিন...যেখানে সব সময় ভালো ভালো খাবার পাওয়া যায় ওইটা হলো ক্ষমতার গদি। ’
‘ও বুঝেছি। ওইটা নিয়েই তো কালু কুকুর আর ভুলু কুকুরের ঝগড়া। ’
-‘হুমম। এই তো বুঝেছিস। ’ মা কুকুর বলে।
‘কিন্তু মা, কালু কুকুর আর ভুলু কুকুর তো নিজেরা নিজেরা কামড়াকামড়ি করে। আমাদের তো কিছু বলে না। মানুষেরা সাধারণ মানুষকে মারে কেন? ’
-‘মানুষের নিয়ম আলাদা। এখন চুপ করে ঘুমা। ’
‘মা আমার মনটা খুব খারাপ। ’
-‘কেন? ’
‘আজকের এই মানুষগুলো রেগে গেলেই কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দেয়। তুমিই বলো, এইসব মানুষের চাইতে কি আমরা খারাপ? এমনকি কালু কুকুর, ভুলু কুকুরও তো এদের চাইতে ভালো। ’
-‘বাবারে মানুষ খুব বিচিত্র। এখন মানুষ রাগ হলে কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা বলে। একদিন হয়তো এইসব নেতার বাচ্চা বলে মানুষ গালি দিবে। কম রাগ হলে ছোট নেতার বাচ্চা, আর একটু বেশি রাগ হলে মেজ নেতার বাচ্চা কিংবা খুব বেশি রাগ হলে বড় নেতার বাচ্চা বলে গালি দেবে। মানুষের নিয়ম আমাদের বুঝে কাজ নেই। সারা দিন অনেক বিরক্ত করেছিস। এইবার ঘুমা। ’
ছেলেকে ধমক দিলেও কুকুর-মাতা নিজেই ঘুমাতে পারে না। কুকুরের ঘ্রাণশক্তি বেশি। বাতাসে এখনো পোড়া মাংসের গন্ধ। সেই গন্ধে মা কুকুরের ঘুম আসে না। মানুষের তো এই সমস্যা নেই...

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন