default-image

৬-৮ আগস্ট একটি International Conference-এ আমার অংশগ্রহণের সুবাদে দ্বিতীয়বারের মতো হিরোশিমা দর্শনের সুযোগ হয়েছিল। যেহেতু হিরোশিমা একটি ঐতিহাসিক শহর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এর ভয়াবহতার বিশদ বিবরণ আমাদের পাঠ্যপুস্তকেও ছিল। এমন একটি ঐতিহাসিক শহরে যাব, একা গেলে কি চলে! তাই আমার স্ত্রী-পুত্রকেও সফরসঙ্গী করলাম, যাতে ভ্রমণের আনন্দটা আরও বেশি মাত্রায় উপভোগ করা যায়। আমার আবাসস্থল থেকে হিরোশিমার দূরত্ব ৬১৪ কিলোমিটার! এই দীর্ঘ ভ্রমণ আমার সাত মাস বয়সী ছেলের জন্য একটু কষ্টকর হলেও সুযোগটা হাতছাড়া করিনি। সিদ্ধান্ত হলো, আমি আমার গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে যাব। এতে করে আমার একটু কষ্ট হলেও আমার ছেলে তার সুবিধাজনক সময়ে বেবি-সিটে আরাম করে ঘুমাতে পারবে। অবশেষে ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করতে ৬ আগস্ট সকাল সাড়ে সাতটায় যাত্রা শুরু করি। পথিমধ্যে প্রতি ঘণ্টায় একবার হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে বিরতি দিয়ে লং-ড্রাইভের আনন্দ উপভোগ করতে করতে যখন হিরোশিমায় হোটেলে পৌঁছলাম, তখন রাত ৯টা ২৩। যাত্রাপথে আমরা কিয়োটো (Kyoto) ৩-৪ ঘণ্টার একটা দীর্ঘ বিরতি দিয়ে কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখি । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কিয়োটোর কিংকাকুজি (Temple of the Golden Pavilion) যা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থাপনা। উল্লেখ্য, কিয়োটো হলো জাপানের আগের রাজধানী (১১৮০-১৮৬৮)।

default-image


হিরোশিমা জাপানের সমধিক পরিচিত একটি শহর। হিরোশিমায় হিরো নেই, আছে ‘বড় এক দ্বীপ শহর’ যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্মম ভয়াবহতার শিকার জাপানের যে দুটি শহর, তার একটি হলো হিরোশিমা, অপরটি নাগাসাকি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে হিরোশিমার এটম বোমা ‘লিটল বয়’ নিক্ষেপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নিমিষেই শেষ হয়ে যায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষের প্রাণ। ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে এসে আহত এবং তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আরও মারা যায় প্রায় ৯০০০০-১৪০০০০। তৎক্ষণাৎ ধুলোর সঙ্গে মিশে যায় ৬৯ ভাগ দালানকোঠা। হিরোশিমা পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরিতে। তার পরের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকের বদৌলতে আমাদের সবারই কম-বেশি জানা। কিছুদিন আগেই ছিল হিরোশিমার ৬৯তম ‘Peace and Remembrance Memorial Ceremony’. হিরোশিমার ক্ষতবিক্ষত স্মৃতি অনাগত প্রজন্মকে জানানোর লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে ‘Hiroshima Peace Memorial Museum’ সবার জন্যে উন্মুক্ত করা হয়, যেখানে সংরক্ষিত আছে ভয়াবহতার হাজারও নিদর্শন। তা ছাড়াও আছে বিশাল আয়তনের Peace Memorial Park, যার আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে ’৪৫–এর যুদ্ধগল্প। গল্পের প্রতিটি চরিত্র নিঃশব্দে জানাচ্ছে ‘লিটল বয়ের’ তেজস্ক্রিয়ায় ক্ষয়ে যাওয়া তাদের বীরত্বের কথা। হিরোশিমা শহরটি সুন্দর, সাজানো-গোছানো। শহরের বুক চিড়ে এঁকেবেঁকে ধমনির মতো যে নদীটি সাগরে এসে মিশেছে, তার বুকে কান পেতে হিরোশিমার শত-সহস্র মানুষ আজও শুনতে পায় সেই ধ্বংসের রণসংগীত।
পরদিন অর্থাৎ, ৭ আগস্ট কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করি এবং কনফারেন্স শেষে বেরিয়ে যাই হিরোশিমার দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য। প্রথমেই গেলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত জায়গাগুলোতে যেখানে গেলে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে সত্যিই অবাক হতে হয়। ‘Hiroshima Peace Memorial Museum’ যেখানে সংরক্ষিত আছে ভয়াবহতার হাজারও নিদর্শন। তেজস্ক্রিয়ায় শরীর থেকে চামড়া খসে পড়ছে— এমন একটি ছবির সংগ্রহ দেখে আঁতকে উঠলাম । ‘লিটল বয়ের’ এমনতর ‘বড় তান্ডব’ বিশ্ব এর আগে-পরে কখনো দেখেনি। জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শনগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা আছে, যা দেখলে আপনার কাছে মনে হতে পারে যে আপনিও ইতিহাসের বিভীষিকাময় প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার নিস্ফল আর্তনাদরত একজন। কেউ শুনছে না আপনার হাহাকারভরা এই আর্তনাদ, সবাই যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। হিরোশিমার এই বিভীষিকাময় আর্তনাদ আজও যেন প্রকম্পিত করছে গোটা দুনিয়া, যেমনটি হয়েছিল ৭১-এর বাংলাদেশে। কেউবা আহা-আহা করছে আর কেউবা নীরবে ফেলছে দু-ফোঁটা অশ্রু। এহেন সকরুণ উপস্থাপনা দেখে দর্শনার্থীর অনেকেই বারবার মুছে নিচ্ছেন নিজের অজান্তেই বেরিয়ে আসা অশ্রু। এই আর্তনাদ, এই বিভীষিকাময় সকরুণ জীবন্ত চিত্র শুধু তাদের মনকেই টলাতে পারছে না, যারা আজও দুনিয়ার বুকে নিজেদের শক্তির পরীক্ষা দেখাতে উপহার দিয়ে যাচ্ছে শত শত হিরোশিমা। এ যেন বেহালার আত্মতুষ্টি, যে কিনা নিজের তারের ধার পরীক্ষা করতে বাদকের আঙুল কেটে দেয়।
তৌফিক আহমেদ, পিএইচডি গবেষক
জাপান অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি
ইশিকাওয়া, জাপান

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন