হিল অব ক্রসেসে একদিন

হিল অব ক্রসেস খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে ক্যাথলিক চার্চে বিশ্বাস করেন এমন মানুষের কাছে সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে লিথুনিয়া নামের সঙ্গে ‘হিল অব ক্রসেস’ স্থানটি বিশেষভাবে জুড়ে গিয়েছে। কেউ গুগলে লিথুনিয়া লিখে সার্চ দিলে সবার আগে এই হিল অব ক্রসেসের ছবি দেখতে পাবেন। এ স্থানটির বিশেষত্ব হচ্ছে এ স্থানে বহু ক্রস রাখা আছে। তবে কবে থেকে এ ক্রস রাখা শুরু হয় সেটা বলাটা একটু মুশকিল। ধারণা করা হয় ১৮৩০-১৮৩১ সালে পোল্যান্ডের অংশবিশেষ যখন রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিগ্রহ ঘোষণা করে (উল্লেখ্য যে সে সময় লিথুনিয়া এবং পোল্যান্ড ছিল একটি সমন্বিত রাষ্ট্র) তখন এ বিদ্রোহে যাঁরা নিহত হন তাঁদের মধ্যে একটা অংশ যাঁদের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি; পরবর্তীতে তাঁদের স্মরণ করার উদ্দেশ্যে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সর্বপ্রথম এখানে ক্রস রাখা শুরু করে; এরপর ধীরে ধীরে লিথুনিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেমন:

default-image

১৯১৮ সালে সালে লিথুনিয়া প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লিথুনিয়া আপরাইজিং মুভমেন্টসহ বিভিন্ন সময়ে প্রাণ হারানো মানুষদের স্বজনেরা তাঁদের স্মরণের উদ্দেশ্যেই এ স্থানে সমবেত হতে শুরু করে এবং এ রকম বহু ক্রস স্থাপন করে। যেহেতু সমাজতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল ধরনের ধর্ম চর্চা নিষিদ্ধ ছিল তাই এ স্থানটি ক্যাথলিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে একটা সময় প্রতিবাদের স্থানে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে ধর্মীয় মর্যাদা পেতে শুরু করে।

যাত্রাটি ছিল গত বছরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। ক্লাসের চাপ সে অর্থে ছিল না বললেই চলে। অন্যদিকে অনেক দিন ধরেই ভেবেছি বাল্টিক দেশগুলো ঘুরে দেখার।

বিজ্ঞাপন

উত্তর ইউরোপে বাল্টিক সাগরের পূর্ব উপকূল ঘেঁষে অবস্থিত তিনটি দেশ লিথুনিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়া; এ তিনটি দেশকে একত্রে বলা হয় বাল্টিক স্টেট। তবে সংস্কৃতি এবং ভাষাগত সাযুজ্যের কথা বিবেচনা করলে কেবলমাত্র লিথুনিয়া এবং লাটভিয়াই বাল্টিক রাষ্ট্র। লিথুনিয়া সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ভাষার নাম লিথুনিয়ান এবং লাটভিয়ার সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ভাষার নাম লাটভিয়ান। লাটভিয়ান এবং লিথুনিয়ান ভাষা দুটি এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর শেষ দুটি জীবিত ভাষা যেটি বাল্টিক ভাষাগোষ্ঠীর সদস্য এবং ধারণা করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ভাষাগুলোর অন্যতম।

অনেক ভাষাতত্ত্ববিদের মতে লিথুনিয়ান এবং লাটভিয়ান ভাষা সংস্কৃত ভাষার থেকেও পুরোনো। অন্যদিকে এস্তোনিয়ার সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ভাষা এস্তোনিয়ান মূলত ফিন-ইউরালিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। সাংস্কৃতিক এবং ভাষার মানদণ্ডে এস্তোনিয়া লাটভিয়া এবং লিথুনিয়া থেকে আলাদা। তারপরেও দীর্ঘ দিন সোভিয়েত ইউনিয়নের ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে এবং একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সম্পর্কের কারণে এ তিনটি দেশ একত্রে বিশ্ব মানচিত্রে বাল্টিক স্টেট নামে পরিচিতি পেয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ তো বটেই এমনকি ইউরোপের অনেকের কাছেও এ তিনটি দেশের তেমন পরিচিতি নেই। এর কারণ হতে পারে দেশ তিনটির ভৌগোলিক অবস্থান বিশেষ করে মূল ইউরোপের দেশ বলতে আমাদের কাছে পরিচিত দেশসমূহ যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দেশ তিনটির অবস্থানগত দূরত্ব। পাশাপাশি দীর্ঘদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে থাকার কারণে এক সময় সমাজতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত দেশগুলো ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার দরুন দেশ তিনটি সে অর্থে পরিচিতি লাভ করতে পারেনি। যদিও গড় আয় এবং অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর বিবেচনায় এ তিনটি দেশ ইউরোপের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় দুর্বল।

যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেনে হাতেগোনা চার থেকে পাঁচটি দেশ ছাড়া পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশে লাটভিয়ান কিংবা লিথুনিয়ানদের সেভাবে চোখে পড়ে না।

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে; তাই পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে আগত অভিবাসীদের একটা বড় অংশ আসে হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, ইউক্রেন, সার্বিয়ার মতো পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে। অনেক সময় দেখা যায় কোনো একটা নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে যে পরিমাণ বেতন দেওয়া হয়, পশ্চিম ইউরোপের দেশ যেমন: ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়ায় ওই একই কাজের জন্য দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি মজুরি পাওয়া যায়। তবুও কেন জানি যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেনে হাতেগোনা চার থেকে পাঁচটি দেশ ছাড়া পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশে লাটভিয়ান কিংবা লিথুনিয়ানদের সেভাবে চোখে পড়ে না।

বিজ্ঞাপন

অনেক দিন ধরেই পরিকল্পনা করে আসছিলাম বাল্টিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুনিয়া ভ্রমণের। প্রায় দেড় বছর চেষ্টা করার পর অবশেষে গেল ডিসেম্বরে সুযোগ মেলে। স্লোভেনিয়ার সঙ্গে সরাসরিভাবে বাস কিংবা ট্রেনে এমনকি প্লেনেও এ তিনটি দেশের সংযোগ নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে কম খরচে ফ্লাইটের টিকিট পেয়েও গেলাম। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে অবস্থিত শোয়েচাট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে রায়ান এয়ারে লাটভিয়ার রাজধানী রিগাতে যাতায়াত করার জন্য বাইশ ইউরোতে ফ্লাইটও মিলে গেল। তবে সমস্যা হচ্ছে খুব ভোরের ফ্লাইট আর এত ভোরে আসলে ভিয়েনাতে সে রকম পাবলিক ট্রান্সপোর্টেরও আনাগোনা চোখে পড়ে না।

দুপুর পৌনে তিনটার বাসে স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানা থেকে ফ্লিক্স বাসে করে রওনা দিলাম অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায়। স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানা থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে পৌঁছাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। কোনো উপায় না দেখে সে রাতটা শোয়েচাট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

শীতের দিনে ভোর ছয়টা কিন্তু সেখানে তখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার, সোয়া দুই ঘণ্টা জার্নি শেষে আমাদের অ্যারোপ্লেন লাটভিয়ার রাজধানী রিগাতে পৌঁছায়।

রিগা এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। প্রচণ্ড শীত আর ঠান্ডা বাতাস, বরফের চাদরে চারদিকে সবকিছু ঢেকে আছে। স্লোভেনিয়ায় আমার বাসা যে অঞ্চলে সেখানে সারা বছরই তাপমাত্রা সমভাবাপন্ন থাকে। শীত এখানে প্রচণ্ড নয় আবার গ্রীষ্মকালেও গরমের প্রকোপ এখানে খুব বেশি একটা নয়। রিগার প্রচণ্ড শীত তাই শরীরের ভেতর নিষ্ঠুর কামড় বসাল; তবুও অভিযাত্রিকের তো আর তাতে কাবু হওয়ার কথা না। রিগার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে সেন্ট্রাল বাস স্টেশনের ভাড়া সোয়া এক ইউরো।

সেন্ট্রাল বাস স্টেশন থেকে সরাসরি শিয়াউলিয়াইয়ের বাস রয়েছে, আগের থেকে অনলাইনে বাসের টিকিট বুক করা ছিল। হিল অব ক্রসেসের অবস্থান লিথুনিয়া রাজধানী ভিলনিয়াস থেকে প্রায় দুই শতও বিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে শিয়াউলিয়াই নামক একটি ছোট শহরের নিকটে। রিগা থেকে শিয়াউলিয়াই পৌঁছাতে প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টার মতো লাগে এবং প্রায় সাড়ে বারো ইউরোর মতো বাস ভাড়া লাগে।

কৌচ সার্ফিং নামে একটি জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট রয়েছে। ট্রাভেলারদের কাছে এ কৌচ সার্ফিং বিশেষভাবে জনপ্রিয়। কেউ কোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে সে জায়গা, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা কিংবা সে অঞ্চলের সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশেষভাবে আগ্রহী হলে কৌচ সার্ফিং থেকেই জেনে নেয়া যায়। এরপর আপনাকে তারা কয়েকজন মানুষের প্রোফাইল দেখায় যাঁরা এ অঞ্চলে বসবাস করেন। ফেসবুকের মতোই আপনি তাঁদের তখন ম্যাসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন। যদি তাঁদের কারও আপনাকে পছন্দ হয় এবং যেদিন আপনি সেখানে ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন সেদিন যদি তিনি সময় বের করতে পারেন তাহলে তিনি আপনাকে নিয়ে ওই দিন ঘুরবেন, আপনাকে স্থানীয় কৃষ্টি কিংবা সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেবেন। এমনকি ভাগ্য ভালো হলে তার বাসায় আপনি কয়েক রাত (সাধারণত দুই রাত) অতিথি হিসেবে থাকার জন্য প্রস্তাব পেতে পারেন।

কৌচ সার্ফিং-এর মাধ্যমে আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল শিয়াউলিয়াইয়ের বাসিন্দা সাউলিয়াসের সঙ্গে। তিনি তাঁর বান্ধবী এরিকাকে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটে থাকেন।

শিয়াউলিয়াইয়ের অধ্যায়কে মনের ভেতর বিশেষভাবে জায়গা দিতে পেরেছি এ দম্পতির কারণে। শিয়াউলিয়াই পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সাউলিয়াস নিজের গাড়ি নিয়ে চলে আসেন আমাকে নেওয়ার জন্য। এরপর তাঁর বাসায় নিয়ে যান; পথিমধ্যে এক জায়গায় গাড়ি পার্ক করে আমার জন্য শপিং করেন। আমাকে একজন অতিথি হিসেবে সম্মান জানাতে তিনি কোনো কার্পণ্য করেননি। আমার উদ্দেশ্যে তাঁরা একটি সান্ধ্যভোজের আয়োজন করেছিলেন। সেই ভোজে আমার সঙ্গে তাঁরা তাঁদের এক বন্ধু এবং বন্ধুর বান্ধবীকেও দাওয়াত দিয়েছিলেন।

default-image

সাউলিয়াসের বাসায় গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়েই আমরা বেরিয়ে পড়ি হিল অব ক্রসেসের উদ্দেশ্যে। তখন প্রায় সাড়ে তিনটার মতো বাজে। লিথুনিয়ায় ডিসেম্বরে সাড়ে তিনটা মানে সন্ধ্যা হবে হবে। পথিমধ্যে সাউলিয়াস আমাকে শিয়াউলিয়াই শহরেরও কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখান।

বিজ্ঞাপন

শিয়াউলিয়াই বর্তমানে লিথুনিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম শহর; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই আসলে এ শহরের প্রধান অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

লাটভিয়া কিংবা লিথুনিয়া অথবা এস্তোনিয়া তিনটি দেশের কোনোটিতে সে রকম কোনো উঁচু স্থান না থাকায় রাস্তার দুপাশে যেদিকে চোখ যায় শুধু সমতল ফসলের মাঠ আর বন-জঙ্গল।

১৯৯৩ সালে তৎকালীন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মগুরু দ্বিতীয় জন পল হিল অব ক্রসেস ভ্রমণ করার পর এ সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে জায়গাটি প্রধান তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিতি পায়।

শিয়াউলিয়াইয়ের সেন্টার থেকে হিল অব ক্রসেসের অবস্থান প্রায় এগারো কিলোমিটার উত্তরে। যখন আমরা সেখানে পা রাখি তখন চারিদিক অনেকটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। অন্ধকারের চিরে যে সামান্য আলোর দেখা মেলে তাতেই কোন রকমে কিছু ছবি তোলার চেষ্টা করি।

সাউলিয়াসের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মগুরু দ্বিতীয় জন পল হিল অব ক্রসেস ভ্রমণ করার পর এ সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে জায়গাটি প্রধান তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০০০ সালের দিকে এখানে একটি আশ্রমও স্থাপন করা হয়েছে যা ‘ফ্রান্সিসকান হেরিটেজ’ নামে পরিচিত।

default-image

দশ মিনিটে পুরো জায়গাটি পায়ে হেঁটে ঘুরে ফেলা যায় তবে জায়গাটি সত্যি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। কাঠ থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন ধরনের ধাতব বস্তুর সাহায্যে তৈরি একেকটি ক্রস অসাধারণ এক শিল্পকর্মের নিদর্শন। আগের রাতে তুষারপাত হওয়ায় ভেড়ার লোমের মতো সাদা তুষার, সন্ধ্যার লণ্ঠন এবং অসাধারণ শিল্পকর্মের এক একটি ক্রস একীভূত হয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের আধারে পরিণত হয়েছে; যা আমার দৃষ্টিসুখের উপলক্ষ হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এখনো ক্যাথলিক ধর্মপ্রাণ মানুষই সেখানে ক্রস রাখেন, তাই একটু একটু করে এ জায়গাটির পরিধিও বাড়ছে।

হিল অব ক্রসেস ভ্রমণ শেষে আমরা আবার সাউলিয়াসের বাসায় ফিরে আসি। তাঁর বান্ধবী আমাদের জন্য ততক্ষণে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রেখেছেন। তাঁর বন্ধুও বান্ধবীকে নিয়ে তাঁদের বাসায় এসে পৌঁছেছেন। সাউলিয়াসের গার্লফ্রেন্ড এরিকা লিথুনিয়া মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বর্ণনা দেন: লিথুনিয়া সাধারণ মানুষের প্রধান খাদ্য আলু এবং তাঁদের প্রায় আহারে সিদ্ধ আলু দিয়ে তৈরি কোনো পদ থাকবেই। এমনকি তাঁদের দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার সেপেলিনিয়াইও আলু দিয়ে তৈরি করা হয়। লিথুনিয়া স্থানীয় ভাষায় এয়ার শিপকে সেপেলিয়ানাই বলা হয় এবং আলু দিয়ে তৈরি এ খাবারটি দেখতে অনেকটা এয়ার শিপের এর মতো বলে এ রকম নামকরণ করা হয়েছে। আমাদের জন্য তিনি আলু দিয়ে কেক তৈরি করেছিলেন, সঙ্গে সেপেলিনিয়াইও ছিল। সিদ্ধ আলু দিয়েও ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের কত ধরনের পদ যে তৈরি করা যায় তা লিথুনিয়ায় না গেলে জানাই হতো না।

default-image

আহারের ফাঁকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলো। তাঁদের সঙ্গে কথোপকথনে একটি বিষয় অবগত হওয়া গেল, যদিও সেটা আমার কাছে একটু বিচিত্র মনে হল। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই একটি দিনকে স্বাধীনতার দিবস হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয় কিন্তু লিথুনিয়া এমন একটি দেশ যেখানে বছরে দুটি দিনকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি যেটি উদ্‌যাপিত হয় সেটি পরিচিত ‘অ্যাক্ট অব রিইনস্টেটিং ইন্ডিপেন্ডেন্স অব লিথুনিয়া’ নামে। ১৯১৮ সালের এই দিনে জার্মান শাসকদের অগ্রাহ্য করে কাউন্সিল অব লিথুনিয়া প্রথম তাঁদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। আর পরেরটি উদ্‌যাপিত হয় ১৮ মার্চ ‘অ্যাক্ট অব রিএসটাবলিস্টমেন্ট অব দ্য স্টেট অব লিথুনিয়া’ হিসেবে। ১৯৯০ সালের এ দিনে লিথুনিয়া তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে সর্বপ্রথম নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। বলা বাহুল্য, লিথুনিয়া হচ্ছে প্রথম ইউএসএসআর-এর রাজ্য যারা সর্বপ্রথম সোভিয়েত জোট থেকে বের করে নিজেদের স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।

সাড়ে সাতটায় ফিরতি বাস লাটভিয়ার রিগাতে ফেরার জন্য। সাউলিয়াস আমাকে তাঁর গাড়িতে করে শিয়াউলিয়াইয়ের বাস স্টেশনে পৌঁছে দিলেন; গাড়িতে করে তাঁর বাসা থেকে শিয়াউলিয়াইয়ের বাস স্টেশনের দূরত্ব ছয় মিনিটের মতো। বিদায়বেলা আমাকে তিনি জড়িয়ে ধরে জানতে চাইলেন, আবার কোনও দিন লিথুনিয়াতে আসব কি না? আমি উত্তর দিলাম অবশ্যই। তাঁর বন্ধু আমাকে লিথুনিয়ার একটি জনপ্রিয় পনির ট্রিগাস উপহার দেন। এটা আবার পৃথিবীর সেরা পনির বলেও জানান। অবশ্য মুখে দিয়ে আমারও মনে হয়েছে সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু এই পনির। মিষ্টি এবং নোনতা এ দুই ধরনের স্বাদের সংমিশ্রণ যখন আপনার জিহ্বাকে স্পর্শ করবে তখন আপনার মনে হবে পৃথিবীতে এর থেকে স্বাদের আর কোনো কিছু হতে পারে না।

সামান্য কয়েক ঘণ্টার জন্য শিয়াউলিয়াইতে পা রেখেছিলাম কিন্তু সাউলিয়াস ও তাঁর বান্ধবী এরিকা এবং তাঁদের বন্ধুদের যে ভালোবাসা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছি তা এক কথায় অভাবনীয়।

লিথুনিয়া এবং লাটভিয়া এ দুইটি দেশে আরও যে দুইটি জিনিস আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো সাওয়ার ক্রিম এবং মেল্টেড চিজ। লিথুনিয়া আর লাটভিয়া ছাড়া আর অন্য কোনো দেশে আমি এই ধরনের মেল্টেড চিজ খুঁজে পাই নি; সাওয়ার ক্রিম পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশে পাওয়া গেলেও লিথুনিয়া এবং লাটভিয়ার মতো এত সুস্বাদু কোনো দেশ তৈরি করতে পারে না। তাই লিথুনিয়া এবং লাটভিয়া বেড়াতে গেলে সাওয়ার ক্রিম এবং মেল্টেড চিজ এ দুইটি জিনিস অবশ্যই খাওয়ার অনুরোধ থাকল। দেশ দুটির মানুষের খাবারের সঙ্গে এই দুটি জিনিস বলতে গেলে অপরিহার্য।

সামান্য কয়েক ঘণ্টার জন্য শিয়াউলিয়াইতে পা রেখেছিলাম কিন্তু সাউলিয়াস ও তাঁর বান্ধবী এরিকা এবং তাঁদের বন্ধুদের যে ভালোবাসা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছি তা এক কথায় অভাবনীয়। এ জন্যই বারবার ফিরে যেতে চাই লিথুনিয়ায়। অসাধারণ সেখানে বসবাস করা মানুষগুলো। জানি না আর কোনো দিন সেখানে যাওয়া হবে কিনা তবে অবচেতনে বারবার আমি ফিরে যাই লিথুনিয়ায়। ফেলে আসা এক মুঠো সুন্দর সময়ের স্মৃতিমেদুরতায় পাই অবিরল আনন্দ।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন