default-image

ক্রিং... ক্রিং! ‘আরে ধুত্তরি ছাই, বেরসিক অ্যালার্ম আর বাজার সময় পেল না! দিল সুন্দর স্বপ্নটা  ভেস্তে!’ নিজের মনে বলতে বলতে আড়মোড়া ভাঙল জয়। ভাগ্যিস, আজ শুক্রবার। এই করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের যন্ত্রণায় যে পড়েনি, সে বুঝবে কী করে?
‘জয়, নাশতা ঠান্ডা হচ্ছে!’ মায়ের কড়া গলার চিৎকার শুনে একটু আগে স্বপ্নে দেখা মদিনা মুহূর্তেই উড়ে যায় জয়ের মাথা থেকে। এখন আম্মার ডাকে সাড়া না দিলে খবর আছে জয়ের!  নির্ঘাত কাঠের খুন্তি পড়বে পিঠে।  লাফিয়ে খাট থেকে নেমে জবাব দিল জয়, ‘এখনই যাচ্ছি, আম্মা!’

মেহেরুন্নেসা বেগুন ভাজি ওলটাতে গিয়ে হাসেন, ‘হায়রে ছেলে রে!’ মায়ের একটু কড়া কণ্ঠেই ঘেমে নেয়ে একশা হয় জয়। তবে যে মাকে একসঙ্গে মা-বাবা দুজনেরই দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাঁকে একটু কড়া হতে হয় বৈকি!  ‘আবদুল গফুর! কথা কানে যাচ্ছে না কেন?’ আবার হাঁক ছাড়েন মেহেরুন্নেসা।

অন্য ঘরে থাকা জয়ের ভুরু কুঁচকে যায়। সে মোটেও পছন্দ করে না নিজের এই নামটিকে। ইশ, আব্বা কেন যে এমন একটা সেকেলে নাম রাখতে গিয়েছিলেন! কবরে শুয়ে থাকা বাবার ওপর বেশ রাগ হয় জয়ের।

বিজ্ঞাপন

আয়না দেখতে দেখতে গায়ে সুতির ফতুয়াটা চাপিয়ে নিল জয়। এই বৃষ্টি-বাদলার দিনে খালি গায়ে থাকতে ভালো লাগে না! একটু চুলটা ঠিক করে নাশতার টেবিলে গেল জয়। অগোছালো চেহারা দেখলে আম্মা চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে নেবেন। প্লাস্টিকের টেবিল আর গোটা তিনেক চেয়ার। মা-ছেলের মধ্যবিত্ত সংসারে অযথা কাঠের ফার্নিচার মানে বিলাসিতা।

নাশতা বলতে খিচুড়ি আর ডিম ভাজা। মায়ের যুক্তি, ভাত খেলে অনেকক্ষণ পেটে থাকে, খিদে পাবে না।

খেতে খেতে ভালো করে ছেলেকে খেয়াল করলেন মেহেরুন্নেসা। ভদ্রস্থ ভাবে কাটা চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। ফরসা আর তামাটের মাঝামাঝি গায়ের রং। ভরাট ঠোঁটের ওপর হালকা গোঁফের রেখা। দেখে মৃদু হাসেন মা। হ্যারে জয়, মদিনা কেমন আছে? কত দিন দেখি না মেয়েটাকে।

মায়ের মুখে নিজের কলিজার টুকরাটার নাম শুনে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় জয়ের শরীরে। মদিনা! তার মদিনা!

মেহেরুন্নেসা আর একটা ডিম তুলে দিলেন ছেলের পাতে। হ্যারে আবদুল গফুর, ওই রকম একটা মিষ্টি মেয়ে কী করে তোর প্রেমে পড়ল রে? ওর কী দেখে ভালো লেগেছিল তোকে?

জয় এবার চোখ পাকিয়ে তাকাল।

‘কতবার বলেছি না আম্মা, ওই নামে ডাকবে না আমাকে! গফুর কেমন আশির দশকের নাম, ছিঃ!’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মেহেরুন্নেসা। আল্লাহর অনেক নামের একটি হলো গফুর। ওর আব্বা অনেক শখ করে একমাত্র ছেলের নাম রেখেছিলেন আল্লাহর সেবক। তা ছেলের পছন্দ নয়!

প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করেন মা। ‘বল না, কেমন করে খুঁজে পেলি মদিনাকে?’ জয় ফিরে যায় চার বছর আগে, মদিনার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটিতে।

সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাস করা আবদুল গফুর জয় তখন দেশের বেশ কয়েকটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে বাড়ির কাছের একটা ভালো মানের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। সে ভালো ছাত্র, তাই প্রথম সেমিস্টারে ফি মওকুফ করে নিতে পেরেছে ভর্তি পরীক্ষার ফলের জোরে।

প্রথম ক্লাসের দিনেই বাস-ভিড়ের ধকল সামলে ‘লেট লতিফ’ জয়। টাইলসের মেঝেতে পিছলে একেবারে সরাসরি ধাক্কা মদিনার সঙ্গে, ‘আরে ধুর! অন্ধ নাকি? দেখে চলতে পারেন না?’ মদিনার কোমল কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।

এর আগে শুধু ছেলেদের স্কুল-কলেজে পড়া জয় তেমনভাবে মেয়েদের সঙ্গে মেশার সুযোগ পায়নি। ‘মাফ করবেন... আ... আমি আসলে...’

‘আরে ধ্যাত , তোতলা কোথাকার!’ কাঁধের ব্যাগ দিয়ে জয়কে ধাক্কা দিয়ে হেঁটে যায় মদিনা।

জয় তখন কি আর মর্ত্যে আছে? সে প্রথম দেখাতেই বাঁধা পড়েছে মদিনার ফুলকাঁটা গুঁজে রাখা মোটা হাত খোঁপার মায়ায়। কেমন বকুল ফুলের সুবাস ছড়িয়ে গেল যেন? ঠিক বুঝতে পারে না জয়। এমন তো আগে কখনো হয়নি ওর মনের ভেতর? আজ তবে কী হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন

‘কিরে ছেলে? বাকি খাবারটুকু কি ভূতে খাবে নাকি?’ ছেলের কাঁধ ধরে ঝাঁকালেন মেহেরুন্নেসা। চমকে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরল জয়। ‘আম্মা, আজ মদিনা ফোন দেয়নি?’

এই মহামারিকালে খরচ বাঁচাতে বাড়িতে থাকার সময়টুকু নিজের ফোন বন্ধ রেখে মায়ের ফোনেই সব কাজ করে জয়। মেহেরুন্নেসা একটা নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে চারপাশের প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে কাপড় সেলাইয়ের অর্ডার আনেন। যতই করোনা আর লকডাউন হোক, পেট চালাতে হবে তো! মাস্ক পরে মাঝেমধ্যে দম আটকে আসে, কিন্তু মধ্যবিত্তের আর কিই-বা করার আছে?

মায়ের সঙ্গে প্রায়ই মদিনার গল্প করে আবদুল গফুর। সেই ক্লাসের ফাঁকে ক্যাম্পাসের টংদোকান। ঢুকেই মদিনা হাঁক দিত, ‘মামা, একটা মেডিসিন টি দাও তো!’ আদা, লেবুর রস আর লবঙ্গ মেশানো সেই চা বেশ তারিয়ে তারিয়ে শেষ করত মদিনা। জয় তত দিনে মদিনার বেশ ভালো বন্ধু। যতই প্রথম দিন ধাক্কা দিক, জয় যে নিজের মেধার জোরেই প্রতি সেমিস্টারে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়ে, আবার শিক্ষকের সহায়ক হয়ে বেশ ভালো টাকা আয়ও করে, আবৃত্তি আর কোরআন তিলাওয়াতেও বেশ তুখোড়! এসব ধীরে ধীরে আকৃষ্ট করতে থাকে মদিনাকে। আর জয়ের বাচনভঙ্গিতে অনেকেই ফিদা, মদিনা ও সে দলে পড়ে। প্রায়ই ক্লাসের নোট আদান-প্রদান, ক্যাম্পাসের ক্যানটিনে গিয়ে তেহারি খাওয়া। খাওয়ার ফাঁকে মদিনার মখমলের মতো আঙুল জয়ের আঙুলে লাগলে ছেলেটার কেঁপে ওঠা সবাই দেখতে পেত, কিন্তু আবদুল গফুরকে যতই জিজ্ঞাসা করা হোক, ‘কিরে জয়, তুই মদিনাকে ভালোবাসিস?’ একেবারে সোজা দুদিকে মাথা নাড়ে ছেলে, ‘আরে না না, আমরা তো স্রেফ বন্ধু!’ কিন্তু জয়ের টমেটোর মতো লাল হয়ে যাওয়া গাল দেখে যা বোঝার বুঝে নেয় সবাই।

জয়ের বাড়িতেও মদিনার যাওয়া-আসা বাড়ে। সে নিজেও মধ্যবিত্তের মেয়ে হওয়ার কারণে দুই কামরার রংচটা ফ্ল্যাট দেখে মোটেও নাক সিটকায় না। বরং জয়ের মা রান্না ঘরে মুড়োঘণ্ট রাঁধতে শেখাতেন হবু ছেলেবউকে।

প্রেম নিয়ে আবদুল গফুরের সৌভাগ্য দেখে হিংসায় জ্বলে মরত ওর বাকি বন্ধুরা, আমাদের তো প্রেমিকা নিয়ে কফি খেতে যেতে হলেও মাকে দেড় লক্ষটা মিথ্যা বলে বেরোতে হয়, জয়রে, তোর তো রাজকপাল ভাই, খালা কেমন তোর গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুরতে যান!

এখন এই ‘নতুন স্বাভাবিক’ যুগে জয় আর মেহেরুন্নেসার কানে ফোনে মধু বর্ষণ করে মদিনার কণ্ঠ।এখন যেহেতু অনলাইন ক্লাস, সেই শিক্ষকের সহকারী হয়ে রোজগার আর হচ্ছে না, শিক্ষকরাই বেতন কম পাচ্ছেন । তাই জয় এখন এক ওয়েবসাইটের ডেলিভারি ম্যান। বেতন কিছুটা কম হলেও স্বস্তি, মায়ের একার ওপর চাপ পড়ছে না।
ভার্সিটি খোলা থাকতে মদিনা ও ঘণ্টাপ্রতি ৭০ টাকায় কাজ করত লাইব্রেরিতে। এখন আর সেটা হয়ে ওঠে না বটে, তবে মদিনা ছোট বাচ্চাদের কোরআন পড়ায় অনলাইনে, তাতে ওর বেশ চলে যায়।

এত কিছুর পরও দূরত্ব কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি আবদুল গফুর আর মদিনার সম্পর্কে। হ্যাঁ, এখন আর টংদোকানে বসে মেডিসিন টি-নানখাতাই খাওয়া হয়ে ওঠে না, দুপুরের খাবার খাওয়া হয় না একসঙ্গে, তবু দুজন দুজনের কণ্ঠের মায়ায় বাঁধা। আর সব থেকে বড় কথা, ছেলের পছন্দে মেহেরুন্নেসার সমর্থন সব সময় ছিল, মদিনাকে ভীষণ ভালোবাসেন তিনি। প্রেম কি সব সময় বাবা মায়ের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলা? প্রেম তো এমন এক হৃদয়ের বন্ধন, যা যে কোনো বাধাকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন