default-image

ইউরোপে দীর্ঘদিন থাকার থাকার সুবাধে অনেক দেশই ইতিমধ্যে ঘোরা হয়ে গেছে। কিন্তু মধ্যযুগীয় চার্চ এবং কাথেড্রালে ভরা ইউরোপিয়ান শহরগুলো আর খুব বেশি শিহরণ জাগায় না। সমুদ্র নিয়ে গবেষণার কারণে বা মনের টানেই হোক, সমুদ্রই আমাকে সব সময়ই টানে। ইতিমধ্যে উত্তরমেরুর সালবার্ড (Svalbard) থেকে শুরু করে আটলান্টিকের মহাসাগরের অসম্ভব সুন্দর কিছু দ্বীপমালায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর সাগরের হেল্গোল্যান্ড নামের সুন্দর দ্বীপমালা ভ্রমণকাহিনি প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য লিখছি।

হেল্গোল্যান্ড (Helgoland) উত্তর আটলান্টিক মহসাগরে হলেও এর অবস্থান জার্মান নর্থ সি বা উত্তর সাগর সীমানায়। এটি একটি ছোট দ্বীপমালা, যা পর্যটকদের কাছে আদর্শ ও নিরিবিলি স্থান গ্রীষ্মকালে অবসর সময় কাটানোর জন্য। যদিও সেখানে জার্মান পর্যটকদের আনাগোনা বেশি। জার্মানির সমুদ্র উপকূল এবং সি বিচগুলো ততটা জনপ্রিয় নয় ইউরোপিয়ান পর্যটকদের কাছে। তাদের পছন্দ ভূমধ্যসাগর অঞ্চল, বিশেষ করে ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা।

default-image

হেল্গোল্যান্ড একটি ছোট দ্বীপমালা, মাত্র দুটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এবং আয়তনে খুব বেশি বড় নয়, প্রায় ৫৫০ একর। বড় দ্বীপটিতে কিছু স্থানীয় জার্মান বসবাস করে। হেল্গোল্যান্ডে ক্যাম্পিংই বেশি আকর্ষণীয়, যা পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত এলাকায় করতে হবে এবং সেটি অন্য ছোট দ্বীপে অনুমোদিত। কিন্তু আপনি যদি এই কোলাহলমুক্ত দ্বীপে কিছুদিন কাটাতে চান, তাহলে আপনার ক্যাম্পিং করে থাকাই শ্রেয়। জার্মান বয়স্ক পর্যটকদের কাছে এখানে ক্যাম্পিং অনেক জনপ্রিয়। কারণ, কর্মজীবন থেকে অবসরের পর জার্মানরা লম্বা সময়ের জন্য বেরিয়ে পরে বিভিন্ন দেশে, আর যারা একটু নিরিবিলিতে জার্মানিতে গ্রীষ্মকালটা পার করতে চায়, তারা মাসখানেকের জন্য চলে যায় ওই দ্বীপে। এ জন্য তাদের ক্যাম্পিং হয় একটু ভিন্ন রকম, তাদের ক্যাম্পিংয়ের তাঁবুতে জীবনযাপনের আয়োজনটা বেশি থাকে, সেখানে ১-২ দিনের জন্য ক্যাম্পিংয়ে একটি ছোটখাটো তাঁবু আর খুব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হলেই চলে যায়। আর এই দ্বীপে সামুদ্রিক সিল আর গ্যানেটরা (সামুদ্রিক পাখি) অবিরত ঘুরে বেড়ায় চারপাশে মানুশের তোয়াক্কা না করে এবং চারপাশের শান্ত সমুদ্র ভুলিয়ে দেয় জাগতিক পৃথিবীর কথা।

গত গ্রীষ্মে আমার জার্মান বন্ধুকে প্রস্তাব দিলাম, চলো যাই ঘুরে আসি ওই দ্বীপমালা থেকে। সে থাকে মিউনিখে। আমি হামবুর্গ শহর থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে গিষ্ঠাক্ট (Geesthacht) নামের ছোট শহরে। হেল্মহোল্টজ সেন্টারে (Helmholtz-Zentrum Geesthacht) অতিথি গবেষক হিসেবে কাজ করার সময় অনেক দিন থাকা হয়েছে নিরিবিলি ছোট শহরটিতে। সেবার কোন কারণে গিয়েছিলাম মিলানে এবং ফিরে আসার সময়ে মিউনিখে আমার বন্ধুর সঙ্গে যোগদান করলাম, আসলে পরিকল্পনা এভাবেই করা হয়েছিল, যেহেতু গাড়িটা তার আর সে–ই ড্রাইভ করবে। সেই ভ্রমণে আমরা প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হেল্গোল্যান্ড গিয়েছিলাম।

default-image

যাত্রা শুরু করেছিলাম মিউনিখে বন্ধু লুকাসের বাসা থেকে। মিউনিখ থেকে হামবুর্গ প্রায় ১০ ঘণ্টার ড্রাইভ, যেখানে আপনি প্রায় গড়ে ১৫০ কিলোমিটার গতিতে ড্রাইভ করতে পারবেন মহাসড়কে। মহাসড়ককে জার্মান ভাষায় অটোভান বলে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট গতিসীমা নেই।

আমার জার্মান বন্ধু খুব কঠোরভাবে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ করে গাড়ি চালাতে অভ্যস্ত, যা জাতিগতভাবে জার্মানদের নিয়মতান্ত্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। সে কখনোই ওভারটেক করবে না এবং গতিসীমা ১৩০ কিলোমিটারের আশপাশে রাখবে। পথিমধ্যে এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা হলো, দেখলাম জার্মানরা কতটা সচেতন ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলে। হঠাৎ কোনো সমস্যার কারণে জার্মান পুলিশ গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিল, কিন্তু সব গাড়ি সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে মাঝখানের লেন ফাঁকা রাখল, যাতে কোনো পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করতে পারে। কাউকে এ জন্য কোনো নির্দেশ দিতে হলো না। আমি আফসোস করি, কবে আমাদের দেশের মানুষ এ রকম সচেতন হবে। যা হোক ওই লম্বা ভ্রমণের পর এক রাত বিরতি আমাদের দরকার ছিল। সে রাত গিষ্ঠাক্টে গেস্ট হাউসে আমার ফ্ল্যাটে বিরতি দিয়ে পরদিন সকালে যাত্রা শুরু করলাম হেল্গোল্যান্ডের উদ্দেশে। এবার হামবুর্গ হয়ে আমরা পৌঁছালাম কুক্সহাভেন নামক সমুদ্রতীরবর্তী এক শহরে, যেখান থেকে ফেরিতে উঠতে হবে। কুক্সহাভেনে আমাদের গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে ফেরিতে চড়ে বসলাম, যদিও সেটিকে ফেরি না বলে শিপ বলাই শ্রেয়। উত্তাল উত্তর সাগর যেন একদল সাহসী অভিযাত্রীর অপেক্ষায় ছিল উত্তাল সমুদ্রের বুকে স্বাগত জানাতে। কালো মেঘে ঢাকা আকাশ আর উত্তাল সমুদ্র তিন ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যস্থল হেল্গোল্যান্ডে।

default-image

প্রথম দিনের বেশির ভাগ সময় আমরা বড় দ্বীপটিতে কাটালাম ফেরিতে আসা অন্য পর্যটকদের সঙ্গে, যাদের বেশির ভাগই আবার বিকেলের ফেরি ধরে ফিরে যাবে কুক্সহাভেনে। বড় দ্বীপটির নাম Hauptinsel, যার অধিবাসী প্রায় ১ হাজার ২৫০ এবং যাদের অনেকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যটকদের আগমনের ওপর নির্ভর করে। অবশ্যই গ্রীষ্মকালই, জুন-সেপ্টেম্বর এই চার মাস, পর্যটকদের ভরা মৌসুম, ইউরোপের অন্য সব জায়গার মতো পর্যটকদের আনাগোনায় হেল্গোল্যান্ড মুখর। যা হোক, এরপর আমরা বড় দ্বীপ মানে, Hauptinsel–এর চারপাশ ঘোরা শুরু করলাম অন্য সবার সঙ্গে। এই দ্বীপটির বড় আকর্ষণ সামুদ্রিক পাখি গ্যানেটের অবাধ বিচরণ। দ্বীপটির দক্ষিণ অংশ অনেকটা উঁচুতে অবস্থিত, যাকে ওবেরল্যান্ড ডাকা হয়। ওবেরল্যান্ডের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে অসংখ্য সামুদ্রিক পাখির বাসা এবং এর আশপাশের এলাকা অনেকটাই সীমানা দিয়ে সংরক্ষিত, যাতে পর্যটকেরা খুব কাছে যেতে না পারে। কিন্তু গ্যানেটদের আশপাশের মনুষ্য উপস্থিতিতে খুব বেশি যায় আসে না। বিশাল এই পাখিটি পর্যটকদের খুব কাছে বেশি ভয় পায় বলে মনে হলো না, অনবরত চিৎকার করে উড়ে বেড়াচ্ছে আর একদল পাহাড়ের সীমানায় বসে আছে আরাম করে। সবাই খুব কাছে গিয়ে ছবি তুলছে অদ্ভুত সুন্দর এই পাখিটির।

default-image

গ্যানেটের শরীর সাধারণত সাদা পালক দিয়ে আবৃত, মাঝেমধ্যে তা এতটা ধবধবে সাদা, যেন ঘোর লেগে যায় কিন্তু মাথার অংশ হলুদাভ। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে এরাই সবচেয়ে বড় পাখি, পূর্ণবয়স্ক গ্যানেট ৯০-১১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং পাখার দৈর্ঘ্য প্রায় ২ মিটার।

সারা দিন ওবেরল্যান্ডে কাটিয়ে গেলাম পরবর্তী দ্বীপ, যা আকারে অনেক ছোট, মাত্র ০.২৭ স্কয়ার কিলোমিটার, যাকে ডিউন (Düne) নামে ডাকা হয়। ছোট হলেও হেল্গোল্যান্ডের এয়ারপোর্টি এখানে অবস্থিত। এই দ্বীপের ছোট অংশে ক্যাম্পিংয়ের জন্য নির্ধারিত, যেখানে ১-২ দিন থেকে শুরু করে কয়েক মাস পর্যন্ত ক্যাম্পিং করে থাকা যায়। যদিও আমরা আগে থেকে বুক করে যায়নি, তবুও একটি জায়গা পেয়ে গেলাম তাঁবু গাড়ার জন্য, যেহেতু আমরা মাত্র ২ দিন থাকব। সম্পূর্ণ দ্বীপটি বালিয়াড়িতে পূর্ণ, চারদিকে বালুময়, আমাদের ক্যাম্পিংয়ের জায়গাটা পুরোটাই বালির ওপর।

default-image

বিকেলে ঘুরতে বের হলাম। দ্বীপটির অন্য পাশে যাওয়া মাত্র মুখোমুখি হলাম সামুদ্রিক সিলদের দলের, যারা খেলা করছে সমুদ্র তটে। আমাদের দেখা মাত্র, কিছুটা পানিতে নেমে গিয়ে আবার খেলতে লাগল। সিলদের ডাক আর সাগরের হালকা গর্জন ছাড়া অদ্ভুত নিঃশব্দ ভরা এক দুনিয়া এই দ্বীপটি। আমরা দুজন মানুষ যেন সমুদ্রের বুকে এক অজানা দ্বীপে বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজছে। পরদিনও চষে বেড়ালাম পুরো দ্বীপে, মাঝেমধ্যে ১-২ জন আমাদের মতো ক্যাম্পারের দেখা পাওয়া যায়। অন্যথায় প্রায় জনমানবহীন এক বিরান দ্বীপ। এখানে গ্রীষ্মকালের অলস দিনগুলোতে আপনি সারা দিন নির্জন সমুদ্রের পারে শুয়ে কাটিয়ে দিতে পারেন ওপরে অবারিত নীল আকাশ আর অবিরাম ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে। মাঝেমধ্যে আমাদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে শুধু সামুদ্রিক সিলগুলো ডেকে মনে করিয়ে দেয় এবার ক্যাম্পে ফিরতে হবে।

যারা ক্যাম্পিং লাইফ ভালোবাসেন, তাদের জন্য একটি আদর্শ দ্বীপমালা এই হেল্গোল্যান্ড। দুই দিনের কাম্পিং জীবনে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যারা সমুদ্র, সামুদ্রিক প্রাণী, পাখি, প্রকৃতি আর রোমাঞ্চকর ভ্রমণ ভালোবাসেন, তাদের এই ভ্রমণ সংকলন ভালো লাগবে আশা করি।

*লেখক: অতিথি গবেষক, হেল্মহোল্টজ সেন্টার গিষ্ঠাক্ট , জার্মানি। mahmudhasan.ghani2@@unibo.it

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0