বিজ্ঞাপন

আমি তাহিয়াকে বললাম, যদি তুমি রমজানের চাঁদ আগে দেখতে পাও, তাহলে আমাকে কল দেবে আর যদি আমি আগে দেখতে পাই, তোমাকে কল দেব। সকারের প্রশিক্ষণ চলাকালীন অন্য বাচ্চাদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। তারা প্রায় সবাই নেপালের মানুষ, কিন্তু বাংলাদেশের কৃষ্টি–সংস্কৃতির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। আমার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী রমজানের চাঁদ খুঁজতেছ?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও খুঁজে পাচ্ছি না।’ উনাদের একজন বললেন, কিন্তু অনেকেই তো গতকাল থেকে রোজা শুরু করে দিয়েছেন। তাঁরা কি আলাদা? আমি বললাম, আসলে তাঁরা আলাদা নন। এগুলো যার যার বিশ্বাস। এরপর সকারের প্রশিক্ষণ শেষ হয়ে গেল। ততক্ষণে পশ্চিমের আকাশ কালো হয়ে এসেছে, কিন্তু চাঁদের দেখা পেলাম না। আমরা বরাবরই উৎসব করে রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখি রোজায় এবং ঈদে বাড়তি আনন্দ যোগ করে এটা। কিন্তু এবার সেটা থেকে কিছুটা বঞ্চিত হলাম।

default-image

এরপর ভোরে ঘুম ভাঙল মুঠোফোনের অ্যালার্মে। ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে সাহ্‌রির শেষ সময়। তাই চারটার সময় অ্যালার্ম সেট করা ছিল। বিভিন্ন অজুহাতে আমাদের ঘুমাতে দেরি হয়ে যায়, উপরন্তু এখন আবার চলছে স্কুল হলিডে। ফলে বাচ্চারা রাত জেগে একটু সিনেমা দেখতে চায়। তাই ভোরবেলা আমি সবার আগে উঠে খাবার ফ্রিজার থেকে বের করে গরম করতে শুরু করলাম। তারপর গিন্নি ও মেয়েকে ডেকে উঠিয়ে একসঙ্গে খেতে বসে গেলাম। খাবার টেবিলে মেয়েটাকে বলছিলাম, কুষ্টিয়ায় আমাদের গ্রামের মাতব্বর মন্টু চাচা রমজানের প্রতি ভোরবেলা প্রতিটা বাড়ির সামনে এসে নাম ধরে ডাকতে শুরু করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ উত্তর দিচ্ছেন, উনি ডাকতেই থাকেন। কেউ একজন সাড়া দিলেই তবে উনি পরের বাড়িটার কাছে যান। এভাবে পুরো পাড়া একসময় জেগে ওঠে উনার ডাকে। অন্যদিকে গ্রামের মসজিদের মাইক্রোফোনে আমাদের মসজিদের হুজুর আবদুল মালেক চাচা সুর করে ডাকতে থাকেন।
‘উঠুন উঠুন উঠুন
সাহ্‌রির সময় হয়েছে
সাহ্‌রি খেয়ে নিন’
আবার কখনো–বা বলতেন—
‘উঠে পড়ুন, সাহ্‌রি খান
উঠে পড়ুন, সাহ্‌রি খান’

আমাদের তাই আলাদা করে কখনোই মুঠোফোনে বা ঘড়িতে অ্যালার্ম সেট করতে হতো না। অ্যালার্ম ছাড়াও আমাদের জীবন চলত, কিন্তু বর্তমান বস্তুবাদী জীবনে আমরা একেকজন আমাদের নিজেদেরই বানানো প্রযুক্তির দাসে পরিণত হয়েছি। এরপর তাহিয়াকে বললাম, ‘বেশি করে পানি খেয়ে নাও। কারণ, তা না হলে পরে খারাপ লাগবে। আর প্রথম রোজাটা একটু কষ্ট করে রাখতে পারলে বাকিগুলো রাখা অনেক সহজ হয়ে যাবে।’

সাহ্‌রি খেয়েই শুয়ে পড়তে হলো। ভোরে আবারও ঘুম ভাঙল মুঠোফোনের অ্যালার্মে। অন্যান্য দিন ব্রাশ করা, প্রসাধনকক্ষে যাওয়ার তাড়া থাকে, তাই অ্যালার্ম একটু আগে সেট করা। আজও সেই সময়ে অ্যালার্ম বাজল। আমি চোখ খুলে সেটাকে আরও ১৫ মিনিট পিছিয়ে দিলাম। ১৫ মিনিট পরের অ্যালার্মে ধড়ফড় করে উঠে পোশাকটা বদলে ওয়ালেট আর গাড়ির চাবিটা নিয়ে দৌড়। বাইরে এসে দেখি শীতের কারণে গাড়ির জানালা ও লুকিং গ্লাসে পুরু শিশির জমে আছে। সেগুলো একটা টিস্যু দিয়ে মুছে স্টেশনের দিকে এগোলাম। স্টেশনের কারপার্কে গাড়ি রেখে বের হতেই দেখি পূর্ব আকাশে সুয্যিমামা হাস্যোজ্জ্বল উঁকি দিচ্ছেন। আমি ট্রেনে উঠে দোতলার একটা ডান পাশের সিটে বসলাম, যাতে সকালের সূর্যের মিষ্টি আলো মাখতে মাখতে যেতে পারি।

অফিসে এসে ডেস্কে বসার পরই আমাদের রুটিন হচ্ছে একেক দিন একেকজন সবার জন্য কফি আনতে যাবে। সেদিন ছিল মাইকেল মিকেলপ, যার ডাক নাম মিক, তার পালা। আমার কাছে এসেই বলল, ‘ওহ! তুমি তো রোজায় আছ।’ আমি তাকে বললাম, আজকে একটা বিশেষ দিন। আজকে একই সঙ্গে রোজা শুরু এবং বাংলা নববর্ষেরও প্রথম দিন। তারপর তাকে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটা ইংরেজি করে বুঝিয়ে দিলাম। শুনে সে খুবই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল। আমি বললাম, ‘এবার আমরা এই গানের মাধ্যমে বলতে চাইছি, অগ্নিস্নানে ধরা সূচিত হয়ে আসবে এক নতুন পৃথিবী, যেখানে থাকবে না কোনো অতিমারির প্রকোপ।’ শুনেই সে ইংরেজিতে বলল, ‘গুড অন ইউ’, যার মানে হচ্ছে ‘তোমার বা তোমাদের ভালো হোক’।

‘উঠুন উঠুন উঠুন সাহ্‌রির সময় হয়েছে সাহ্‌রি খেয়ে নিন’ আবার কখনো–বা বলতেন— ‘উঠে পড়ুন, সাহ্‌রি খান উঠে পড়ুন, সাহ্‌রি খান’

প্রতিদিনই দুপুরের খাবারের বিরতির আধা ঘণ্টাকে আমি টেনেটুনে কোনো দিন ৪৫ মিনিট, আবার কোনো দিন ১ ঘণ্টা বানিয়ে ফেলি। সেই পুরো সময়ে আমি হাঁটি। কখনো খাবার হাতে নিয়ে, আবার কখনো হাঁটার শেষে খাবার নিয়ে এসে ডেস্কে বসে খাই। সেদিন তো খাবার ঝামেলা ছিল না, তাই ঢিমেতালে বের হয়ে গেলাম। অফিস থেকে বের হতেই বাইরের রোদের আঁচে শরীরটা চনমনে হয়ে গেল। অফিসের ভেতরে এতটাই ঠান্ডা যে আমাদের হাত পা জমে যাওয়ার জোগাড় হয়। তাই বাইরে যতই উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করুক না কেন, ভেতরেই আমরা জ্যাকেট পরে বসে কাজ করি। বাইরে বেরিয়ে সিগন্যাল পার হয়ে একটা চাপা গলি। সেই গলিতে শুধু একদিকে গাড়ি চলে। সেখানেরই একটা বাঁকে বাংলাদেশের কুঞ্জলতার মতো একটা ফুলের ঝাড় এবং সবুজ লতানো গাছে ঝাঁকে ঝাঁকে টকটকে লাল ফুল ফুটে থাকে।

সেই গাছের কাছে যেয়ে ফুলের ছবি তুলছি এমন সময় কানে এল, বাচ্চাদের কলকাকলি। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি দুজন প্রৌঢ়, দুজন শিশু ও একজন মধ্যবয়সী মহিলা কথা বলছেন। বুঝতে পারলাম, স্কুলের ছুটিতে দাদা–দাদির কাছে বউমা ও নাতি–নাতনি বেড়াতে এসেছেন। আমি তাঁদের দেখে বললাম, আমি দুপুরে হাঁটতে বের হলেই এখানে আসি এবং এই ফুলগুলোর ছবি তুলি। শুনে উনারা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার দেশ কোথায়?’ বললাম, বাংলাদেশ। আরও যোগ করলাম, ‘আমাদের দেশেও প্রায় হুবহু একই প্রজাতির একটা লতানো ফুলগাছ আছে। আমরা সেটাকে বাসাবাড়ির গেটের কাছে লাগিয়ে দিই, তারপর সেটা গেটের চারপাশে পেঁচিয়ে বড় হতে থাকে আর গেটটা সবুজ হয়ে যায়। এরপর যখন সেখানে লাল ফুল ফোটে, তখন আরও ভালো লাগে দেখতে। আমি গত বছর এই গাছ থেকে বীজ নিয়ে গিয়ে আমাদের বাসার পেছনের বারান্দার রেলিংয়ে লাগিয়েছিলাম। এখন সেটা পুরোপুরি সবুজ হয়ে গেছে। সকালে যখন লাল ফুলগুলো ফোটে, খুবই চমৎকার দেখায়।’

default-image

এরপর একটু এগিয়ে মূল রাস্তায় পড়তেই দেখা হয়ে গেল ম্যাক্সের সঙ্গে। ম্যাক্স একটা কুকুরের নাম। অস্ট্রেলিয়ায় কুকুর, বিড়ালসহ সব পোষা পশুপাখিকে নিজ পরিবারের সদস্যের গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাদের খাদ্য থেকে শুরু করে ডায়েট, ব্যায়াম, মনস্তাত্ত্বিক বিনোদন ও চিকিৎসার দিকে কড়া নজর রাখা হয়। অনেক সময়ই রাস্তাঘাটে বিড়াল বা পাখি হারিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞাপনও দেখতে পাওয়া যায়, সেখানে বলা থাকে সন্ধানদাতাকে উপযুক্ত পুরস্কারও দেওয়া হবে। ম্যাক্সের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগে। আমি এ কোম্পানিতে কাজ করছি প্রায় পাঁচ বছর ধরে। দুপুরে হাঁটতে বের হয়ে বুরালি পার্কের বেঞ্চে বসে গায়ে রোদ মাখি। তখন ম্যাক্সকে ওর মালিক নিয়ে আসে। কুচকুচে কালো ওর গায়ের রং। কান দুটি লম্বা হওয়ায় কিশোরী মেয়েদের দুটি বেণির মতো মাথার দুই পাশে ঝুলে থাকে। যখন দৌড়ায়, তখন হুবহু কিশোরী মেয়ের মতো দেখায়। ওর মালিকের সঙ্গে আলাপ করার পর ওর সঙ্গেও ভাব জমে গিয়েছিল। কুকুরদের স্মৃতিশক্তি অনেক প্রখর। একবার কাউকে দেখলে তাকে দ্বিতীয়বার দেখলেই চিনতে পারে। আজও সে আমাকে দেখে কুঁইকুঁই আরম্ভ করে দিল। আমি মাথার মধ্যে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। ওর মালিক জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলো।’ আমি বললাম, ‘আমি ইদানীং অন্যদিকে, মানে স্যার জোসেফ ব্যাংকস পার্কের দিকে হাঁটতে যাই। তাই তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি।’ এরপর ওদেরকে বিদায় দিয়ে পার্কের দিকে এগিয়ে গেলাম।

এরপর পার্কের বেঞ্চে বসতেই দেখি একজন পরিচিত মুখ সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমি ‘হ্যালো’ বলে সম্বোধন করতেই কাছে এসে বলল, ‘আরে তুমি, কেমন আছ।’ আমি বললাম, ‘অনেক দিন পর তোমার সঙ্গে দেখা।’ আমি আগে গ্রিন স্কয়ার স্টেশনে নেমে সেখান থেকে বাসে উঠতাম। সেই বাসেই জেমসের সঙ্গে পরিচয়। জেমস চীনের মানুষ। সব সময় মুখে একটা হাসি লেগে থাকে। ফ্রন্ট ডেস্কে জব করে বলেই হয়তো–বা মুখে একটা আলগা হাসি ধরে রাখতে হয়। জেমসকে বললাম, ‘কয়েক বছর ধরে আমি মাস্কাটে নামি। কারণ, মাস্কাট থেকে ইস্ট গার্ডেনস পর্যন্ত একটা নতুন বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। আমি সেটাতেই অফিসে আসি। জেমস নামত আমার স্টপেজের এক স্টপেজ আগে। অনেক দিন পর দেখা, তাই বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ হচ্ছিল। অতিমারি, চাকরির ব্যস্ততা, দুপুরের বিরতি, দৈনন্দিন ঘটনাবলি—সবই আলাপে উঠে আসছিল।

default-image

জেমস বলছিল, ‘আর বলো না, ফ্রন্ট ডেস্কের কাজ তো, কত রকমের মানুষের সঙ্গে যে কথা বলতে হয়। মাথাটা ঝিমঝিম করে, তাই দুপুরের বিরতিতে এ পার্কে এসে হেঁটে হেঁটে এখানের বিশুদ্ধ বাতাসে মনটা আবার সতেজ করে নিই।’ আমি বললাম, ‘আমারও একই অবস্থা। সারা দিন ইমারতের হিসাব–নিকাশ করতে করতে মগজটা রোবোটিক হয়ে যায়। দুপুরের বিরতিতে হেঁটে মগজের ক্লান্তি দূর করি।’ জেমস আবার বলল, আজকের দিনটা খুবই সুন্দর, একবারে রৌদ্রোজ্জ্বল না, আবার বেশি ঠান্ডাও পড়ছে না, অন্যদিকে বেশি বাতাসও নেই আজকে। আমি বললাম, ‘আজকে আবার আমাদের রমজান মাসের প্রথম দিন এবং একই সঙ্গে আমাদের বাংলা পঞ্জিকারও প্রথম দিন। সব মিলিয়ে দারুণ একটা বৈপরীত্য।’ জেমস বলল, এ বৈপরীত্যই তো পৃথিবীর সৌন্দর্য। আমি বললাম, ঠিক তাই। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা আরও একটা দিন এই পৃথিবীর জল–হওয়ায় বেঁচে থাকলাম। এরপর আমি জেমসকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানালাম। অফিসের দিকে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আজকের দিনটা আসলেই অনেক মধুর, হোয়াট আ বিউটিফুল ডে। আসলে জীবনের প্রতিটা দিনই নিজ নিজ গুণে মাধুর্যপূর্ণ।


*লেখক: মো. ইয়াকুব আলী, মিন্টো, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন