default-image

অফিস মেইল বক্সে একটা ই–মেইলে চোখ আটকে যাওযার পর অনেকক্ষণ টেবিলের পাশের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাইরের পৃথিবীর দিকে। তাকাই নিজের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনটার দিকে। তারও অল্প কিছুক্ষণ আগে শুনছিলাম প্রয়াত শিল্পী অ্যান্ড্রু কিশোরের একটা গান, ‘আমার সারা জীবন খেয়ো গো মাটি’...গানের লাইনগুলো মনের খুব গোপনে আলোড়ন তোলে, ঝড় তোলে—কাকে দেখতে চাই আজন্ম, আছে এমন কেউ আমার জীবনে?

শান্ত এক সকালে কথা লিখতে ইচ্ছে হয়, প্রবল তৃষ্ণা জাগে কথা বলার। পিনপতন নীরবতার এ সকালে অফিস করছি, অনলাইন অফিস। ই–মেইল এলে উত্তর দিই। টুকটাক কাজ করি। মন সদা জাগ্রত, নিজেকে বলি আমি অফিসের কাজের জন্য ‘অন’ আছি। কিন্তু ওই যে মন সে কোথায় ছোটে, কেউ কি বলতে পারি আমরা?

‘অ-সাহস’ কি সঠিক বাংলা শব্দ, যার অর্থ সাহসী হতে না পারা এ জীবন? ওই যে বলছিলাম, অফিস ই–মেইলে চোখ আটকে গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। ই–মেইলে লিখেছে এক বিখ্যাত হসপিটালের সোশ্যাল ওয়ার্কার, কিন্তু ওর নামের শেষে বড় করে লেভেল লাগানো—MSW/BSW/RSW—একাধারে মাস্টার্স অব সোশ্যাল ওয়ার্ক, ব্যাচেলর অব সোশ্যাল ওয়ার্ক, রেজিস্টার্ড সোশ্যাল ওয়ার্কার।

কত বয়স হবে কেটির? সেই হিসাবের দরকার নেই। কিন্তু কেটির কাজ আর আমার কাজ প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু আমি জানি কেটি যোগ্যতায় এগিয়ে আছে অনেক অনেক দূর। ২০০৮ সালে এই শহরে যখন কাজ পাই, তখন একজন সহকর্মী বলেছিল, মাহমুদা, এই কাজটা ছেড়ে দাও, বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডমিশন নাও। সামনে সুযোগ আছে, তোমার সন্তান ছোট, সময়ও আছে। কেন খামোখা এই দুই বছরের ডিগ্রি নিয়ে আজন্ম বাঁচবে? এখনই সময় আরও পড়াশোনা করো। কষ্টির মতো এ রকম চাকরিই তুমি আরও পাঁচ বছর পর অনেক বড় আর ভালো পজিশনে জয়েন করতে পারবে। আম্মা বলেছিলেন, ছেড়ে দে চাকরি, পিএইচডি কর, চাকরি করতে হবে না।

কারও কথা শুনিনি, একটা জাঁতাকলের সঙ্গে জীবন জুতে দিয়েছি, চলছি ‘যব কাটা’র মতো জীবন নিয়ে। কেন আরও বড় করে জীবনকে ভাবতে পারলাম না। এই জীবনে কি সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে ভয় পাই আমি? কাকে ভয়, নিজেকে?

অনেক অনেক বছর আগে বাংলাদেশ থেকে এক ছেলে আমার সঙ্গে জীবনকে জুতে দিয়ে ভালো থাকবে বলে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। বেশ বড় অঙ্কের ডলার হাতিয়ে নিয়েছিল মিথ্যা বলে, অনেক অনেক বছর ধরে জেনেছি ছেলেটা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে গত ৩০ বছর।

একাকী মানুষেরা বারবার প্রলোভন আর প্রতারণার শিকার হয়। আমি এর বাইরের কোনো প্রাণী না। খুব বেশি নোংরামি হয়নি হয়তো কিন্তু দগদগে পোড়া দাগের ভয়াভহ স্মৃতি বয়ে বেড়াই এই জীবনের কাছে। কাউকে দোষারোপ করা জীবন আমি বিশ্বাস করি না। তাই ‘অ-সাহসের’ এই জীবন একা বয়ে নিয়ে বেড়াই, ঝামেলা এড়ানো মানুষ বলেই নিজেকে বারবার স্মরণ করাই, যেকোনো বিষয়, যা আমি বয়ে বেড়াতে পারব না, সেখান থেকে আলাদা করে ফেলব, সুখ না পেলাম কিন্তু নিরন্তর নোংরামি/ইতরামি/অশান্তি টানতে চাই না।

কিন্তু জানেন তো জীবন হচ্ছে সেই পথ, যা আপনি বারবার এড়াবেন, আপনার ‘অ-মনোযোগী’ মন আপনাকে সেদিকেই টেনে নেবে বানের পানির মতো। ইদানীং আলোচিত সাহেদকে নিয়ে একটা মেয়ে লিখেছে, ‘আচ্ছা, এই যে সাহেদের মাথায় এত রকমের অন্যায় বুদ্ধি খেলা করে, সে তো এসব বুদ্ধি ভালো দিকে কাজে লাগিয়ে ভালোও হতে পারত। জীবনে এসব অর্বাচীন মানুষের চিন্তা, তবু আমরা ভাবতে ভালোবাসি।’ মেয়েটির কথা পড়ে ভাবতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা বছর দশেক আগে যে ছেলেটা আমাকে মিথ্যা আশ্বাস আর অন্যায় করে ডলার নিয়েছিল, কানাডা আসার সব প্ল্যান পাকা করেছিল সে কানাডা আসতে পারেনি কিন্তু ডলার তো নিয়েছিল। সে কি শেষ অবধি ভালো আছে? সেকি আমার রক্তে উপার্জিত ডলারটা কাজে লাগিয়ে উঠে দাঁড়াতে পেরেছে?

তাহলে সেই ছেলের বড় বোন, যাকে আমি গত ১০ বছর ‘বড় আপা’ ডাকি, যিনি আমাকে শতবার বলেছেন, লুনা, তোমাকে একবার দেখতে চাই। আমার পিচাশের মতো ভাইয়ের হাত থেকে তুমি এত সহজেই ছাড়া পাইলা ক্যামনে, তোমারে একবার দেখতে চাই। আমার ভাই তো এখন রাস্তায় ভিক্ষা করে, ওর আরও পাপ বাকি আছে। এই যে বাংলাদেশের খুব সাধারণ গ্রামের এক নারী, যিনি ১০ বছর আমার মনকে শান্ত করার জন্য কান পেতে আমাকে শুনছেন—এসব কি কেবলই কথা আর আমার বিশ্বাস? আসলেই কি এই দুনিয়ায় বা অন্য দুনিয়ায় পাপ–পুণ্য বলে কোনো শব্দ আছে? নাকি আমার মতো অনেকেই ‘অ-সাহসের’ এই জীবন যাপন করি। কারণ বিশ্বাস হারাতে ভয় পাই বলে? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জীবনজুড়ে অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, এই বয়ে বেড়ানো প্রশ্নের বোঝাই কি জীবনের সবচেয়ে বড় বোঝা?

সাহেদ যাদের কবর দিল, যাদের সঙ্গে প্রতারণা করল, মিথ্যা কোভিড নিয়ে যারা দুনিয়া থেকে চলে গেল, তাদের আত্মা কি সাহেদের সামনে আসে নির্ঘুম রাতে বা ঘুঘু ডাকা নীরব দুপুরে, সাহেদ কি নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারে সাহস নিয়ে?

সাহেদ নিজেই আন্দাজ করেছিল, মাত্র এক দিনে সব মিথ্যা পালক খসে গিয়ে সারা মিডিয়ার সামনে ন্যাংটো হবে এই জীবনেই?

দেড় মাস হয়ে গেল আমার বাবা চলে গেছেন পরপারে। কোথাও কোনো পরিবর্তন হয়নি, কারও জীবন থেমে নেই। এই দেড় মাসে আমি কারও কাছে আব্বাকে নিয়ে কোনো অভিযোগ শুনিনি, সব মৃত্যু কি এমন হয়?

অনেক অনেক বছর আগে বাংলাদেশের একটি মেয়ে রুমানা মঞ্জুর, যার স্বামী তাঁর চোখ উপড়ে ফেলেছিল, সেই রুমানার স্বামী সুমন বাংলাদেশের অন্ধ কারাগারে মারা গিয়েছিল। রুমানার মেয়ে বড় হচ্ছে কানাডার ভ্যাংকুভার শহরে, ধরে নিই মেয়েটির নাম শাওলি। ওর কি জানতে ইচ্ছে করে কেন ওর বাবা ওর মায়ের চোখ উপড়ে ফেলেছিল? কেন ওর বাবা হিংস্র ছিল? মৃত্যু কি ক্ষমা করেছে রুমানার স্বামীকে? মরে গিয়ে কি শান্তি দিয়েছে সুমন ওর মেয়েকে? এই মৃত্যু কি কাম্য আমাদের?

ডেসটিনি গ্রুপের রফিকুল আমিনের পরিবার, সন্তানেরা কানাডায় এই শহরেই থাকে শুনেছি। সেসব সন্তান কি জানে তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের খরচ তার বাবা বাংলাদেশের গরিব মানুষের কাছ থেকে প্রতারণা আর মিথ্যা কথা বলে এনেছে?

হাজারো প্রশ্ন কেন তাড়িত করে নিত্য? কেন ঘুরে দাঁড়াতে পারি না সাহসের সঙ্গে?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0