বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সারা বিশ্বে ক্যানসারের প্রকোপ দিন দিন কীভাবে বেড়ে চলেছে, তার কিছু চিত্র আমরা বুঝতে পারি, যদি দুটি প্রধান ক্যানসার—স্তন ও ফুসফুস ক্যানসারের গতিবিধি লক্ষ করি। ২০১২ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী ছিল ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ জন, যা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯২ জনে। ২০৪০ সাল নাগাদ তার সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ২৫০ জন। নতুন করে ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০১২ সালে ছিল ১৮ লাখ ১০ হাজার ৫৭২ জন, যা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ ৭৬ হাজার ১০৬ জন। অনুমান করা হচ্ছে, ২০৪৪ সালে সেটি দ্বিগুণ হয়ে পৌঁছাবে ৩২ লাখ ৯৯ হাজার ৬৫০ জনে।

সারা বিশ্বের সবখানে ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা এক নয়। অঞ্চলভেদে অনেক তারতম্য দেখা যায়। ২০১৯ সালের এক হিসাবে দেখা যায় বিশ্বের মাত্র ৩৫ শতাংশ দেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার চিকিত্সাব্যবস্থা চালু রয়েছে। ২০১৯ সালে সারা বিশ্বে রেডিওথেরাপি মেশিনের সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিলে না—সংখ্যা মানের বিচারে যার হার ৬ দশমিক ৫ (আদর্শ সূচক ০-২৩.৮)। ২০২০ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে ম্যামোগ্রাম মেশিনের পর্যাপ্ততা সূচক ছিলে ২৪.৫ (আদর্শসূচক ০-৪২৯.৫)। ২০২০ সাল পর্যন্ত PET-CT-SCAN–এর পর্যাপ্ততা সূচক ছিল শূন্য দশমিক ৭ (আদর্শ সূচক ০-৩০.৭)।

ক্যানসার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের হিসেবেও অঞ্চলভেদে ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়। ২০১৯ সালের এক হিসাবে দেখা যায় রেডিয়েশন ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সংখ্যার সূচক ১৪ (আদর্শ সূচক ০-১৮০)। ক্যানসার শল্যচিকিৎসকের সংখ্যার সূচক ৩১৯ (১১-২৮৫৪)।

বিশ্বের ৭০ শতাংশ দেশে কমবেশি জাতীয় ক্যানসার ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন আছে। বিশ্বের ৪৮ শতাংশ দেশে ক্যানসারের জন্য সুনির্দিষ্ট পেলিএটিভ কেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বের ৬০ শতাংশ দেশে সার্জারি, রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি সমন্বিত চিকিত্সাব্যবস্থা আছে। বিশ্বের ৬২ শতাংশ দেশে স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু আছে। ২০১৮ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ক্যানসার চিকিৎসায় নিয়োজিত আদর্শ ও দক্ষ মানবসম্পদের সূচক ১ (আদর্শ সূচক ০-৫)। প্রতি ১০ হাজার ক্যানসার রোগীর জন্য বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিত্সা কেন্দ্রের সূচক ২ (আদর্শ সূচক ০-৭০০)। বিশ্বের মাত্র ১৬ শতাংশ দেশে স্তন, জরায়ু, কোলন ও শিশু ক্যানসারের জন্য সমন্বিত দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিত্সা গাইডলাইন রয়েছে।

২০১৯ সালের হিসাবে দেখা যায়, শতকরা ৬৫ শতাংশ দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসারের স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু আছে। কিন্তু মাত্র ৪০ শতাংশ দেশে এটি সুসংগঠিত এবং জনসংখ্যাভিত্তিক। মাত্র ২০ শতাংশ দেশে শিশু-কিশোর ক্যানসার শনাক্তকরণের নীতিমালা রয়েছে।

এশিয়ায় বর্তমান নতুন করে ৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন মানুষ ক্যানসার আক্রান্ত হচ্ছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ ১১ দশমিক ৫ মিলিয়নে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকার তুলনায় এশিয়ায় ক্যানসার আক্রান্তের হার অর্ধেক (৩১৫.৫/প্রতি ১০০ হাজার জনের বিপরীতে ১৫২.২/প্রতি ১০০ হাজার জনে)। কিন্তু ক্যানসারজনিত মৃত্যু অনেক বেশি (০.৩৩–এর বিপরীতে ০.৬৬) এর চেয়ে বেশি মৃত্যু সুবিধাবঞ্চিত আফ্রিকাতে (০.৭৩)।

শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে বিশ্বের মোট জরায়ুমুখ ক্যানসারের ২৭ শতাংশ ঘটে। এশিয়ার অনেক দেশে জরায়ু ক্যানসার ধীরে ধীরে কমছে বলে দেখা যাচ্ছে। পক্ষান্তরে সামগ্রিকভাবে স্তন ও কোলন ক্যানসারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি মূলত মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দেরিতে সন্তান ধারণ ও কম সন্তান নেওয়া, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় ক্রনিক ইনফেকশনের কারণে লিভার এবং পাকস্থলী ক্যানসারের হার অনেক বেশি।

আবার ধূমপান, তামাক, জর্দা, গুল ইত্যাদির কারণে মুখগহ্বর, নাক, কান ও গলার ক্যানসারের হার ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বাধিক। ২০১৮ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ঠোঁট ও মুখগহ্বর ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব সারা বিশ্বের তুলনায় দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তিন গুণ বেশি। ২০১৮ সালের বিশ্ব সূচক ছিলে ৫ দশমিক ৮; পক্ষান্তরে পাকিস্তান (১৬.৩), ভারত (১৩.৯), বাংলাদেশ (১২.৪), শ্রীলঙ্কা (১২.৩), আফগানিস্তান (৯.৩), মিয়ানমার (৬.৯) ও নেপাল (৫.৯)।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি প্রাথমিক প্রতিরোধ কর্মসূচি জোরদার করা যায়, তবে সেটি হতে পারে ক্যানসার বিস্তার রোধে সবচেয়ে কার্যকরী সাশ্রয়ী পন্থা। এর জন্য প্রয়োজন সরাসরি ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত কারণগুলো চিহ্নিত করে এগুলোকে নির্মূল করা।

নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত এশিয়ার দেশগুলোয় ক্যানসার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো সুসংগঠিত হয়নি। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হতাশাজনকভাবে কম। দক্ষ জনশক্তির স্বল্পতা রয়েছে। এসব কারণে এই অঞ্চলগুলোয় ক্যানসার রোগীরা প্রায় তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ের অসুখ নিয়ে আসে এবং চিকিৎসার ফলাফলও আশানুরূপ হয় না। পল্লি অঞ্চলগুলো এখনো সামগ্রিকভাবে ক্যানসার চিকিৎসার আওতাধীন হয়ে ওঠেনি।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি প্রাথমিক প্রতিরোধ কর্মসূচি জোরদার করা যায়, তবে সেটি হতে পারে ক্যানসার বিস্তার রোধে সবচেয়ে কার্যকরী সাশ্রয়ী পন্থা। এর জন্য প্রয়োজন সরাসরি ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত কারণগুলো চিহ্নিত করে এগুলোকে নির্মূল করা। যেমন ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিহীনতার অবসান, শারীরিক পরিশ্রমকে উৎসাহিত করা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা। নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারের হার সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। কারণ ওই সব দেশে সেভাবে কার্যকরী ক্যানসার প্রতিরোধী কার্যক্রম চলমান নেই। সঠিক জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি হচ্ছে যেকোনো ক্যানসারের প্রতিরোধ পরিকল্পনার মূল শর্ত।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী পক্ষগুলোকে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবর্তী দেশগুলোয় অর্থনৈতিক সাহায্য অনেক বাড়াতে হবে এবং ক্যানসার প্রতিরোধ কার্যক্রম বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, তা না হলে ক্যানসার চিকিৎসার চাপে এসব দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এ দেশগুলোয় স্থানীয়ভাবে অতি কার্যকরী ক্যানসার ওষুধ উৎপাদনে উৎসাহ ও সুষম বিতরণের প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে, শক্তিশালী প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে। ক্যানসার রোগীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যথাযথ পরিকল্পনা নিতে হবে।

২০১০ সালে বিশ্বের ক্যানসারজনিত ব্যয় ছিল ৮৪ বিলিয়ন ডলার, ২০১১ সালে ৯০ বিলিয়ন, ২০১২ সালে ৯৪ বিলিয়ন, ২০১৩ সালে ৯৬ বিলিয়ন, ২০১৪ সালে ১০৪ বিলিয়ন, ২০১৫ সালে ১০৮ বিলিয়ন, ২০১৬ সালে ১০৯ বিলিয়ন, ২০১৭ সালে ১৩১ বিলিয়ন। ২০১৮ সালে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

যে ওষুধের দাম যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেশি, সেটি ভারতে অনেক কম। তাতেও ভারতীয়দের ওষুধ কেনার সক্ষমতা বাড়ছে না। কারণ, ওদের ক্রয় ক্ষমতা কম, এটিও একটি ভাবনার বিষয়। প্রতিদিন নিত্যনতুন উচ্চ মূল্যের ওষুধ ক্যানসার চিকিৎসায় সম্পৃক্ত হচ্ছে। উচ্চ মূল্যের ওষুধের ব্যবহার, কার্যকারিতা, রোগীর অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও চিকিৎসার খরচের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এক জটিল সমীকরণ। এ জন্য ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের ক্যানসার অর্থনীতি বিষয়সম্পর্কিত সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে।

২০১০ সালে বিশ্বের ক্যানসারজনিত ব্যয় ছিল ৮৪ বিলিয়ন ডলার, ২০১১ সালে ৯০ বিলিয়ন, ২০১২ সালে ৯৪ বিলিয়ন, ২০১৩ সালে ৯৬ বিলিয়ন, ২০১৪ সালে ১০৪ বিলিয়ন, ২০১৫ সালে ১০৮ বিলিয়ন, ২০১৬ সালে ১০৯ বিলিয়ন, ২০১৭ সালে ১৩১ বিলিয়ন। ২০১৮ সালে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

বর্তমান বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ এক অবাক বিস্ময়। বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কৃষি, মত্স্য, বস্ত্র ইত্যাদি খাতে এ দেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। বর্তমান সরকার জনবান্ধবমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ক্যানসার চিকিৎসার আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ইতিমধ্যে ৮টি বিভাগীয় শহরে সমন্বিত ও সুসজ্জিত ক্যানসার হাসপাতালের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে সব হাসপাতাল চালু হবে আশা করা যায়।

ক্যানসার রোগীদের তাদের নিজেদের কর্মস্থলে চিকিত্সাকালে পূর্ণ বেতনে ছুটি দেওয়ার জন্য নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। ওষুধ কোম্পানি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্যানসার রোগীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনাব্যবস্থা দিতে হবে। ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোকে বিনা শর্তে ক্যানসার রোগীদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসন কর্মসূচিতে ঋণদানমূলক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

এ ছাড়া মানসম্মত ক্যানসার রেজিস্ট্রি তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। সরকার ইতিমধ্যে ক্যানসার রোগীদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে এসেছেন। সরকারের একার পক্ষে ক্যানসারের এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই সরকারের পাশাপাশি বড় শিল্প উদ্যোক্তা ও সমাজসেবীদের এগিয়ে আসতে হবে। মূলত, প্রতিরোধ কর্মসূচি ও রোগীদের আর্থিক ক্ষমতায়নে তাদের অনুকূল ভূমিকা রাখতে হবে।

ক্যানসার রোগীদের তাদের নিজেদের কর্মস্থলে চিকিত্সাকালে পূর্ণ বেতনে ছুটি দেওয়ার জন্য নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। ওষুধ কোম্পানি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্যানসার রোগীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনাব্যবস্থা দিতে হবে। ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোকে বিনা শর্তে ক্যানসার রোগীদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসন কর্মসূচিতে ঋণদানমূলক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

অমিত সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। আমাদের সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা, এক কার্যকরী প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ দেশে ক্যানসার মহামারিও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

লেখক: ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, অনকোলোজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন