কঠোরভাবে মানতে হবে বিধিনিষেধ

করোনা দ্বিতীয় ঢেউ এখনো চলমান। তবে ভ্যাক্সিন হাতের নাগালে চলে এসেছে। তবুও মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। সাধারণ মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি মানা নিয়ে রয়েছে উদাসীনতা। কঠোরভাবে মানতে হবে বিধিনিষেধ।

default-image

করোনায় রোগীদের নানা ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতা ও এর প্রতিকার নিয়ে প্রথম আলো আয়োজন করে এসকেএফ নিবেদিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ের সুরক্ষা’। অনুষ্ঠানটির ত্রয়োদশ পর্বে

অনুষ্ঠানটি গত ৭ জানুয়ারি প্রথম আলো ও এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানের শুরুতে সহযোগী অধ্যাপক ডা. শিশির বসাক আলোচনা করেন করোনার ভ্যাক্সিন নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও আজ ভ্যাক্সিন নিয়েছি। এখন পর্যন্ত এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। সামাজিক যোগযোগমাধ্যমগুলোতে যে কথাগুলো বলা হচ্ছে, ভ্যক্সিন বিষয়ে এর কোনো ভিত্তি নেই। আমরা ছোট থেকেই নানা ধরনের ভ্যাক্সিন গ্রহণ করি। কিন্তু কোনোটারই বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। সুতরাং ভ্যাক্সিন নিরাপদ, এটা বলা যায়। করোনা থেকে মুক্তি পেতে এর বিকল্প নেই।’

এরপর সহযোগী অধ্যাপক ডা. শিশির বসাক আলোচনা করেন রক্ত জমাট বাঁধা সমস্যা নিয়ে। তিনি বলেন, খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে একজন মানুষের ব্রেন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হয় রক্ত জমাট বেঁধে। আর এগুলো হয়ে থাকে শরীরে ভারসাম্যহীনতার জন্য। আমাদের শরীরে নানা ধরনের সিস্টেম রয়েছে। এর মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার যেমন সিস্টেম রয়েছে তেমনই রক্ত জমাট বাঁধা রোধেরও সিস্টেম রয়েছে। শুরুতে এটি জানা ছিল না যে করোনায় রোগীর শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। পশ্চিমা দেশগুলোতেই এটি প্রথম শনাক্ত হয়। সেখানে একজন রোগীর শরীরে রক্ত জমাট বাঁধা সমস্য দেখা যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা গবেষণা করে দেখতে পান এর কারণেই সবচেয়ে বেশি রোগী মারা যাচ্ছেন।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় রক্ত জমাট বেঁধে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যাই বেশি। অর্থাৎ ভাইরাসের সংক্রমণে দেহের গভীর শিরাগুলোতে থ্রোম্বোসিস তৈরি হয়, যা সাধারণত পায়ের শিরায় দেখা যায়। এভাবে রক্ত জমাট বেঁধে শিরার জায়গায় জায়গায় আটকে পড়ে কিংবা সেগুলো যদি টুকরা বা ক্ষুদ্র হয়ে ভেঙে ফুসফুসের দিকে যায়, তখন তা রক্ত চলাচলকে আটকে দিয়ে জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং ভর্তির পর তাঁদের বিভিন্ন রকমের পরীক্ষা–নিরীক্ষা দেওয়া হয়। যেমন শ্বাসকষ্ট পালমোনারি এম্বলিজমের দিকে যাচ্ছে কি না, পায়ে রক্ত জমাট বাঁধছে কি না। কিছু ব্লাড টেস্ট করা হয় শুধু রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা নির্ণয়ের জন্য।

রক্ত জমাট যদি হার্টে হয় তবে হার্ট ফেলিওর হতে পারে, ব্রেনে হলে স্ট্রোক হতে পারে, যদি কিডনিতে হয়, তবে কিডনি ইনফেকশন হতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করতে দুই রকমের অ্যান্টি–ক্লগনেন্ট ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। একটি মুখে খাওয়ার আর অন্যটি শিরা বা চামড়ার নিচে দিতে হয়। তবে কোনো ওষুধই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে একটি প্রবণতা দেখা যায়, কোনো অসুখ হলে চিকিৎসকরে পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কিনে সেবন করে। এটি মোটেই উচিত নয়। বিশেষ করে এই অ্যান্টি–ক্লগনেন্ট জাতীয় ওষুধ।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে সহযোগী অধ্যাপক ডা. শিশির বসাক আলোচনা করেন করোনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। তিনি বলেন, করোনা থেকে সবারই সর্তক থাকতে হবে। কারণ, কখন কার ক্ষেত্রে এটি জটিল আকার ধারণ করবে বলা মুশকিল। তবে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস; যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি রয়েছে; বৃদ্ধ, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী; যাঁদের অতিরিক্ত ওজন—তাঁদেরই কোভিডে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। আক্রান্তের শুরু থেকেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। করোনা মোকাবিলায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, লাইফস্টাইল মোডিফিকেশন। অমাদের উচিত নিজের জন্য উপকারী ডায়েট চার্ট ফলো করা। আমাদের খাবারে কার্বহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি, যা নানা ধরনের রোগকে বাড়িয়ে তোলে। তাই আমদের ব্যালেন্স ডাইটের প্রয়োজন হয়। প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি খাওয়া উচিত। ফলমূল খেতে হবে। আমরা যদি কাউকে জিজ্ঞাস করি কী পরিমাণ শাকসবজি বা কাঁচা ফল খান, নির্দিস্ট করে বলতে পারেন না। রেড মিট যত কম পারা যায় খেতে হবে।

আমরা জানি না আমাদের দিনে কতটুকু ক্যালরি প্রয়োজন বা প্রোটিন প্রয়োজন। আবার দিনে কীভাবে কতটুকু ক্যালরি বার্ন করা যাবে, সে বিষয়টিও জানতে হবে। তবেই না আমরা সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারব। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলমান। যদিও আমরা এর প্রভাবের অনেকটাই বাইরে। শীতপ্রধান দেশগুলোতে এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। সেখানে মৃত্যুহার অনেক বেশি। সেই হিসাবে আমাদের দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নেই বলেলই চলে। তারপরও সর্তক থাকতে হবে। কমপক্ষে ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ঘন ঘন সাবান ও পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে, অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছেন—এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে, অসুস্থ পশুপাখির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে, মাছ-মাংস ভালোভাবে রান্না করে খেতে হবে। এ ছাড়া যতটা সম্ভব ঘরে থাকতে হবে, প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না যাওয়া ও জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন