বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফোঁটা ফোঁটা লেবুবিজ্ঞান

লেবুর যে বিজ্ঞান আছে সেটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। সাধারণ বিজ্ঞান হলো, লেবু ভিটামিন সি যুক্ত টক জাতীয় ফল। বিজ্ঞানের আরও ভেতরে প্রবেশের আগে একটি গল্প বলি।

ক্যাপ্টেন জেমস কুক (১৭২৮-১৭৭৯) নাবিকদের স্কার্ভি রোগ থেকে বাঁচাতে প্রচুর পরিমাণ লেবু নিয়েছিলেন নিজের জাহাজে। প্রতিদিন নিয়ম করে নাবিকদের সেই লেবু খেতে হতো। এর ফলে স্কার্ভি রোগে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন জেমস কুকের নাবিকেরা। বুঝতেই পারছেন, ক্যাপটেন কুক সেই বেঁচে থাকা নাবিকদের নিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন হাওয়াই দ্বীপ।

default-image

স্কার্ভি রোগ হয় ভিটামিন সির অভাবে। লেবু হচ্ছে ভিটামিন সির খুব ভালো উৎস। শুধু ভিটামিন সি-ই নয়। লেবুতে আছে ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৫, কে, কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন, রিবোফ্লোবিন, মিনারেল, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং ফসফরাস। এতে কোনো সম্পৃক্ত চর্বি ও কোলেস্টেরল নেই। ক্যালরি আছে খুব কম মাত্রার। ভিটামিন সি শুধু যে রোগ সারায়, তা-ই নয়। এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে। নিয়মিত লেবু খাওয়ার ফলে ওজন কমে, নখ ও ত্বক সুন্দর থাকে, পাকস্থলী সুস্থ থাকে। এ ছাড়া আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রোগ সারাতে লেবু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলার তথ্যটির জন্যই এই করোনাকালে মানুষ লেবুপানির প্রতি ঝুঁকেছে বেশি। এমন নয় যে বাঙালি লেবু খেত না। বাঙালির খাবার পাতে লেবুর উল্লেখ পাওয়া যায় বহু আগে থেকেই।

পনেরো শতকের কবি বিজয়গুপ্ত তাঁর ‘পদ্মাপুরাণ’ কাব্যে কমলা, নারঙ্গ, লেবু, ছোলঙ্গ, পাতি লেবু, কাগজি লেবু ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। এগুলো সবই মূলত লেবু ও লেবুজাতীয় ফল। এই লেবুজাতীয় ফলগুলো ১৭টি প্রজাতিতে বিভক্ত। তবে এর মধ্যে বেশির ভাগই বন্য প্রজাতির। লেমন, লাইম, সাইট্রোন, ম্যান্ডারিন অরেঞ্জ, সুইট অরেঞ্জ, পামেলো—সাধারণত এই কয়েকটি প্রজাতির লেবু ও লেবুজাতীয় ফল আমরা খেয়ে থাকি।

default-image

আমাদের অতি পরিচিত ও প্রিয় কাগজি লেবু লাইম প্রজাতির, শরবতি লেবু সুইট লাইম প্রজাতির। পাতি লেবু, কলম্ব, এলাচি, সিডলেস (বিচিহীন) লেবু হচ্ছে লেমন। জামির এবং এর সহোদর জারা লেবু সাইট্রোন প্রজাতির। কমলালেবু মান্ডারিন অরেঞ্জ এবং মাল্টা সুইট অরেঞ্জ প্রজাতির আর জাম্বুরা বা বাতাবি লেবু পামেলো প্রজাতির ফল। সাতকড়া হচ্ছে সাইট্রাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত লেবুজাতীয় সবজি। এ ছাড়া বারি লেবু ১, বারি লেবু ২, বারি লেবু ৩, বারি লেবু ৪, বারি লেবু ৫ এবং বারি কাগজি লেবু ১ নামের উচ্চফলনশীল লেবুর জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই সব ফলকেই আমরা ‘লেবু’ হিসেবে চিনি এবং নিয়মিত খেয়ে থাকি।

খাবার ও লেবু

একেক ধরনের খাবারে একেক লেবু ব্যবহৃত হয়। কাগজি লেবু আমাদের দেশে বহুল ব্যবহৃত। ভাত ও ডালের সঙ্গে এই লেবুর রস খাওয়া হয় বেশি। শরবত তৈরির জন্য লেমনজাতীয় অর্থাৎ পাতি লেবু বা শরবতি লেবু, কলম্ব, এলাচি লেবু, সিডলেস লেবু বেশি ব্যবহৃত হয়। কারণ, এই লেবুগুলোর রস বেশি। তবে শরবত তৈরির জন্য জামির ব্যবহার করা হয় না।

লেবুর রস দিয়ে রুই মাছ ভুনা অপূর্ব স্বাদের খাবার। এ ছাড়া লেবুর রস দিয়ে কাচকি মাছের তরকারি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। গরম জলে পরিমাণমতো চা-পাতা আর লেবুর রস দিয়ে তৈরি ‘লেবু চা’ বাংলাদেশের চা-সংস্কৃতিতে এক ভিন্ন সংযোজন। এ ছাড়া লেবুর পাতা দিয়েও চা তৈরি করা হয়।

default-image

আমাদের সংস্কৃতিতে লেবুর ব্যবহারের কথা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। কতভাবে যে আমরা লেবু ও লেবুজাতীয় ফলগুলো খাই, তার কোনো হিসেব নেই। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে এগুলো খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। যেমন, সিলেট অঞ্চলে সাতকরার ব্যবহার। সাতকরা দিয়ে গরু বা খাসির মাংস রান্নার পদ্ধতি সিলেট অঞ্চলের ট্রেডমার্ক। সারা দেশে ফল হিসেবে বাতাবি লেবু খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। মাল্টা ও কমলালেবুর কথা এখানে নাই-বা উল্লেখ করলাম।

নিম্বু ফলপানক

default-image

লেবুকাব্য শেষ করি একটি প্রাচীন পানীয়ের রেসিপি দিয়ে। এর নাম নিম্বু ফলপানক। এক গ্লাস পানিতে পরিমাণমতো লেবুর রস একটু বেশি চিনির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিন। এর সঙ্গে লবঙ্গ ও গোলমরিচের গুঁড়ো খুব ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। তারপর পান করুন। খাওয়ার পর হজমের জন্য এই পানীয় নিয়মিত পান করতে পারেন।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন