কিশোর ও তরুণদের মৃগীরোগ বেশি হয়

মৃগীরোগ আর দশটা সাধারণ রোগের মতোই। সঠিকভাবে চিকিৎসা করালে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু তারপরও রোগটি নিয়ে মানুষের বিভ্রান্তি আর ভ্রান্ত ধারণার কোনো শেষ নেই। মানুষের সব ভুল ধারণা দূর করা আর সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়াসে আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ দিবসকে সামনে রেখে প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ‘এসকেএফ নিবেদিত মৃগীরোগ সচেতনতা সপ্তাহ’–এর দ্বিতীয় পর্ব। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘মৃগীরোগের আদ্যোপান্ত’।

ডা. লুবাইনা হকের সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পরিচালক এবং নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। অনুষ্ঠানটি ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আলোচনার শুরুতেই অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ মৃগীরোগ সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেন। তিনি বলেন, মৃগীরোগ মস্তিষ্কের একটি জটিল। মস্তিষ্কে যখন একাধিক স্নায়ুতন্ত্র অনিয়ন্ত্রিত কাজ করা শুরু করে, তখনই রোগটি দেখা দেয়। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রের হঠাৎ এই অনিয়ন্ত্রিত কাজের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও কারণগুলো সব বয়সে এক রকম নয়।

default-image

দুই বছর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশে মৃগীরোগ নিয়ে একটি বড় গবেষণা হয়, যার নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মৃগীরোগের প্রকোপ নির্ণয় করা এবং এ রোগের সঠিক চিকিৎসাপদ্ধতি অবলম্বন করা। গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের দেশে ১ লাখ জনগণের মধ্যে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন মৃগীরোগে আক্রান্ত। উন্নত বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে সংখ্যাটি অনেক বেশি।

অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ মৃগীরোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে আমাদের দেশে কী কী কাজ করা হচ্ছে, তা নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, সোসাইটি অব নিউরোলজির উদ্যোগে মৃগীরোগ নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা হয়। অতিসম্প্রতি এই সোসাইটি থেকে এ রোগের চিকিৎসার একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। গাইডলাইনটি সঠিকভাবে মূল্যায়নের পর প্রকাশ করা হবে।

এ রোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত মানুষের অনেক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। শহরের থেকে গ্রামাঞ্চলে এটি আরও বেশি। সেখানে বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, মৃগীরোগ ঈশ্বরের অভিশাপ, জিন–ভূতের আসর। তারা মনে করে, নোংরা জিনিস ধরলে জিন–ভূত চলে যায়। এ জন্য কারও খিঁচুনি শুরু হলে জুতার তলা, নোংরা মোজা নাকের কাছে ধরা হয়। খিঁচুনি সাধারণত তিন–চার মিনিট পর ঠিক হয়ে যায়। তাই সবাই ধরে নেয়, এই জুতা-মোজার গন্ধ শুকানোর জন্য ঠিক হয়েছে। আসলে ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। তবে ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা এখন বেশ কমে গিয়েছে। কারণ, মানুষের বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান বেড়েছে। গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে তারা এ রোগ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাচ্ছে।

default-image

অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদের আলোচনা থেকে আরও জানা যায় যে মৃগীরোগের অনেক ধরন রয়েছে এবং একেক ধরনের জন্য একেক রকমের ওষুধ রয়েছে। এ জন্য মৃগীরোগের সঠিক নির্ণয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। দেখা গেছে, ‘সঠিক সময়ে সঠিক মৃগীরোগের ধরন নির্ণয় করে সঠিক ওষুধ’ গ্রহণে ৮০ শতাংশ মৃগী রোগ সেরে যায়। কোনো ওষুধ সেবনের মাধ্যমে যদি টানা দুই থেকে তিন বছর কোনো সিজার অ্যাটাক (খিঁচুনি) না হয়, তবে ধরে নিতে হবে মৃগীরোগ সেরে গেছে।

বিজ্ঞাপন

মৃগীরোগ নির্ণয়ের জন্য অনেক সময় ইইজি টেস্ট করা হয়। এ নিয়ে অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, একজন মৃগীরোগীর ইইজি রিপোর্ট স্বাভাবিক আসতে পারে, আবার একজন ভালো মানুষের ইইজি অস্বাভাবিক হতে পারে। এ জন্য রোগী দেখে মৃগীরোগ নির্ণয় করতে হবে। ইইজি দেখে মৃগীরোগ নির্ণয় করা হচ্ছে সর্বোচ্চ বোকামি।

default-image

ঢাকায় কেউ মৃগীরোগে আক্রান্ত হলে তাঁরা খুব সহজে চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকেন। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে কেউ অসুস্থ হলে তাঁরা কোথায় যাবেন, সে প্রশ্ন রাখা হয় অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে এখন অনেক ভালো চিকিৎসক আছেন, যাঁরা এ রোগের চিকিৎসা করতে পারেন। কিন্তু ভালো ডায়াগনোসিস টেস্টের জন্য বড় প্রতিষ্ঠানে আসা প্রয়োজন। মানুষের কাছাকাছি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারি প্রচেষ্টায় নিউরোলজি সার্ভিস বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ৭টি বিভাগে নিউরো ইউনিট করা হবে। যাতে বিভাগের সব জেলার যত রোগী আছেন, তাঁরা সেবা পান।

মৃগীরোগ কিশোর ও তরুণ বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। মানুষের ভুল চিন্তাভাবনা আর সঠিক জ্ঞানের অভাবে এ বয়সী ছেলেমেয়েদের বাবা–মায়েরা ঘরে আটকে রাখেন, বাইরে খেলতে যেতে দেন না, কারও সঙ্গে মিশতে দেন না, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয় না। এটা মোটেও ঠিক নয় বলে জানান অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। এ নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক বড় বড় মনীষী, যেমন আইনস্টাইন, আব্রাহাম লিংকন, আলফ্রেড নোবেল মৃগীরোগী ছিলেন। যথাসময়ে চিকিৎসা করালে মৃগীরোগী সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবেন। গাড়ি বা সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা বাদে সবই করতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে দর্শকদের অনেক প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল পারকিনসন এবং ডিমেনশিয়া রোগের সঙ্গে মৃগীরোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। পারকিনসনের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও ডিমেনশিয়ার সঙ্গে আছে এ রোগের সম্পর্ক আছে। এ নিয়ে ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, একবার খিঁচুনি হলে মস্তিষ্কের ১০ হাজার সেল নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে খিঁচুনি হতে থাকলে মৃগীরোগী অনেক কিছু ভুলে যেতে শুরু করবেন। এ জন্য একবার খিঁচুনি হলে যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততই ভালো।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন