default-image
বিজ্ঞাপন

সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা। দরজায় কড়া নাড়ছে মাহে রমজান। মুসলিম জাহানের সবচেয়ে পবিত্র মাস এই মাহে রমজান। সংযমের মাস রমজান। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অনেক সাধনার একটি মাস হলো এটি। ভোরের সাহ্‌রিতে রোজা শুরু আর সন্ধ্যার ইফতারিতে শেষ। রোজাদারের আনন্দ ইফতারিতে, যদিও রোজাদারের জন্য আরও অনেক উপহার আছে। এই কাঠফাটা গরমে প্রায় ১৫ ঘণ্টা রোজা রেখে শরীরকে সতেজ রাখাটা কিন্তু বেশ চ্যালেঞ্জিং। আসুন, জেনে নিই কিছু টিপস, যেগুলো আপনাকে লম্বা সময় রোজা রাখতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে।

সাহ্‌রি

কোনো কিছুই অতিরিক্ত খাবেন না। মনে রাখবেন, খাদ্য হচ্ছে মানবদেহের জ্বালানি, শরীরে সব ধরনের খাবারের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে চাহিদা থাকে, চাহিদার অতিরিক্ত খেলেই বিপত্তি ঘটবে।

সাহ্‌রি দিয়ে একজন রোজাদারের দিন শুরু হয়। অনেকে মনে করেন যে সারিতে পেটপুরে খেলে মনে হয় সারা দিনে আর ক্ষুধা লাগে না। তাই অনেককে সারিতে প্রচুর পরিমাণে খেতে দেখা যায়। এরপর পানির জাগ অথবা বোতল হাতে করে বসে থাকেন। শেষ সময়ের সাইরেন বাজার আগপর্যন্ত পানি খেতেই থাকেন। এগুলো কখনোই করবেন না। কারণ, এতে আপনার শরীরে একধরনের অস্বস্তি হবে, যা আপনাকে সারা দিন কষ্ট দেবে। সাহ্‌রির শেষ সময়ের কমপক্ষে ১৫-২০ মিনিট আগে সাহ্‌রি খাওয়া শেষ করতে হবে।

সাহ্‌রিতে আপনি আপনার স্বাভাবিক খাবারটাই খাবেন। পরিমিত পরিমাণে ভাত নেবেন সঙ্গে মাছ বা মাংস, ডাল, সবজি, সালাদ। শেষে এক কাপ দুধ বা দই আর একটু মিষ্টি ফল। সাহ্‌রিতে একটু দুধ বা দই খেলে এখান থেকে আপনি ধীরে ধীরে শক্তি পাবেন, যা আপনাকে সারা দিন বেশ সতেজ রাখবে। আতপ চালের ভাত না খেয়ে আপনি সেদ্ধ মোটা চালের ভাত খেতে পারেন। লাল চাল হলে সেটা সবচেয়ে বেশি ভালো হয়, এগুলো আপনার সারা দিনের না খেয়ে থাকার পক্ষে বেশ সহায়ক হবে। তার মানে কিন্তু আমি বলছি না যে আতপ চাল খাওয়া যাবে না, অবশ্যই খাওয়া যাবে।

আবারও বলছি, কোনো কিছুই অতিরিক্ত খাবেন না। মনে রাখবেন, খাদ্য হচ্ছে মানবদেহের জ্বালানি, শরীরে সব ধরনের খাবারের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে চাহিদা থাকে, চাহিদার অতিরিক্ত খেলেই বিপত্তি ঘটবে। শরীর প্রয়োজনীয় খাবার নিয়ে বাকিটা চর্বি হিসেবে জমা করে রাখবে। ফলাফল, আপনার ওজন বেড়ে যাবে এবং কিছু শারীরিক ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।

বিজ্ঞাপন

ইফতার

default-image

রমজানে রোজাদারের জন্য খুব আনন্দের সময় হচ্ছে ইফতারের সময়। ইফতারের ১ ঘণ্টা আগে থেকেই চলতে থাকে আমাদের ইফতারের প্রস্তুতি, তাই সারা দিনের সব ক্লান্তি যেন ইফতারের ১ ঘণ্টা আগেই উড়ে যায়। ইফতারিতে সবাই তাঁদের সাধ্যমতো আয়োজন করে থাকেন। তবে সারা দিন যেহেতু না খেয়ে থাকতে হয়, তাই ইফতারিটা অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে। সারা দিন রোজা রেখে অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে অ্যাসিডিটিসহ অন্যান্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তবে ইফতারের আয়োজনে বাড়ির সব সদস্যের কথা মাথায় রেখে ইফতারের আয়োজন করতে হবে। ছোটদের জন্য একটু প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি রাখার চেষ্টা করবেন। বয়স্ক সদস্যদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁদের জন্য প্রযোজ্য খাবার রাখার চেষ্টা করবেন। যেমন বাড়িতে হয়তো কারও কিডনির সমস্যা আছে, তাহলে তাঁর জন্য ডাল বা ডাল দিয়ে তৈরি কোনো ইফতারি রাখবেন না। প্রোটিন জাতীয় খাবার কম রাখবেন। অথবা কারও হয়তো হৃদ্‌রোগ আছে, তাহলে তাঁর জন্য তেল বা চর্বিযুক্ত খাবার রাখবেন না। বাসায় কোনো ডায়াবেটিসের রোগী থাকতে পারেন, তাহলে তাঁর জন্যও কিন্তু আয়োজনটা ভিন্ন হবে। এভাবে বুঝেশুনে সবার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের আয়োজন করতে হবে।

ইফতারিতে পানির চাহিদা বেশি থাকবে, তাই এ সময় এমন কিছু পানীয় রাখবেন যেগুলো আপনার পিপাসা মেটানোর পাশাপাশি শরীরে শক্তি জোগাবে। এ জন্য শরবত হিসেবে অল্প চিনিযুক্ত লেবুপানি, মিষ্টি ফলের রস, ডাবের পানি, মিল্কসেক, লাচ্চি এগুলো রাখতে পারেন আপনার ইফতারির তালিকায়।

খেজুর ছাড়া ইফতারি যেন অসম্পূর্ণ। তবে মনে রাখতে হবে, খেজুর একটি উচ্চ ক্যালরিসম্পন্ন ফল। ইফতারিতে খেজুরসহ বেশি বেশি অন্যান্য ফল রাখুন। বাজারে এখন অনেক রকমের ফল পাওয়া যাচ্ছে, দামও মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে, তাই ইফতারিতে বেশি করে ফল রাখুন। পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি, তরমুজ এগুলো বেশি রাখুন ইফতারির মেনুতে।

default-image

ইফতারির আর একটা অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে হালিম, ইফতারিতে একটু হালিম খেলে সারা দিনের ক্লান্ত পেশিগুলো আবার সতেজ হয়ে উঠবে। হালিমের পরিবর্তে আপনি একটু স্যুপ খেতে পারেন।

এখানে রোজার মাসের জন্য একটা নমুনা তালিকা দেওয়া হলো। সবার ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা না-ও হতে পারে। তবে এটা বেশির ভাগ মানুষের জন্যই উপযোগী হবে।

ইফতার

পানীয়

  • চিনি ছাড়া লেবু পানির শরবত।

  • ডাবের পানি।

  • একটা মাল্টা/একটা কমলার রস।

  • চিনি ছাড়া এক গ্লাস তরমুজের জুস।

  • এক কাপ টকদই, এক কাপ পানি, একটা ছোট কলা বা ছোট দুই স্লাইস আম একসঙ্গে ব্লেন্ড করে বানানো লাচ্ছি।

  • চিনি ছাড়া বেলের শরবত।

বিশেষ খাবার

১৫-২০টা ভেজানো ছোলা, সেদ্ধ করা নয়। সাহ্‌রির সময়ে ১৫-২০টা ছোলা (একজনের জন্য) পানিতে ভিজিয়ে দেবেন। সারা দিন ভিজবে। ইফতারের আগে ওই ভেজানো খোসাসহ ছোলার সঙ্গে খুবই কুচি কুচি করে কাটা আদা এবং পরিমাণমতো লবণ দিয়ে ভালো করে চটকে মেখে খেয়ে নেবেন।

বিজ্ঞাপন

ফল

খেজুর ২-৩টা সঙ্গে ১টা আপেল বা কলা নেবেন। অন্যান্য ফল যদি থাকে তাহলে সবগুলো এক টুকরা করে নেবেন। যেমন এক টুকরা তরমুজ, আনারস, কমলা, আঙুর, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি। শসা, ক্ষীরা, পেয়ারা এগুলো বেশি খেতে পারবেন।

default-image

অন্যান্য খাবার

বুট ভুনা ১ কাপ সঙ্গে ১-২ কাপ মুড়ি নেবেন। হালিম যদি থাকে তাহলে ১-২ কাপ। কোনো তেলে ভাজা ইফতারে না খাওয়াই ভালো। কারণ, সারা দিন রোজা রেখে ডুবো তেলে ভাজা খাবার খেলে শরীর খারাপ হতে পারে। ওজন বেড়ে যেতে পারে, রক্তচাপ বাড়তে পারে। চনাবুট, হালিম ও ডালের তৈরি আইটেমগুলো কিডনি রোগীদের জটিলতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

অথবা
২ কাপ ভেজানো চিড়া, এক কাপ দুধ/টক দই, ১টা কলা।

অথবা
২-৩ কাপ ভাত/২-৩টি রুটি সঙ্গে মাছ/মাংস ১ পিস, সবজি, সালাদ।

রাতের খাবার

তারাবির পরে খাবেন,
রুটি/ভাত, মাছ বা মাংস (ঝোল কম), শাকসবজি, সালাদ। এ খাবার হবে অন্যান্য সময়ের সকালের নাশতার মতো পরিমাণে কম।

সাহ্‌রি

ভাত, মাছ বা মাংস (ঝোল কম), শাকসবজি, ডাল, সালাদ। এ খাবার হবে অন্যান্য সময়ের দুপুরের খাবারের মতো। সঙ্গে এক কাপ টক দই এবং দুইটা খেজুর।
ঘুমানোর আগে এক কাপ দুধ/টক দই অথবা ১০টা কাজুবাদাম খাবেন।

ব্যায়াম

রমজান মাসে ব্যায়ামের দরকার নেই। তবে যদি সম্ভব হয় তাহলে ইফতারের পর একটু হাঁটবেন অথবা ঘরে বসে কিছু ব্যায়াম করে নেবেন। অবশ্যই তারাবির নামাজ পড়বেন, এতে ইবাদতের পাশাপাশি ব্যায়ামের কাজও হয়ে যাবে।

বুঝেশুনে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান, সুস্থ থাকুন।

লেখক: পুষ্টিবিদ, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন