ক্যানসারে সমন্বিত প্রতিরোধ প্রয়োজন
শরীরের যে অঙ্গ সরাসরি বাইরের পরিবেশের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান আদান–প্রদান করে, সেসব অঙ্গের ক্যানসার বেশি দেখা যায়। আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর ক্যানসার রিসার্চের মতে, বিশ্বে সব ক্যানসারের মধ্যে অন্যতম হলো লাং, ব্রেস্ট এবং কোলন ক্যানসার।

ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা প্রতিবছরই লক্ষাধিক মৃত্যুর জন্য দায়ী। গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে ২০২০ সালে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৯০ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এবং ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন। প্রায় প্রতিবছরই দেশে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয় এবং বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। কিন্তু এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়।

default-image

ক্যানসারের মরণথাবা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোকেও গ্রাস করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ এবং প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে সব মৃত্যুর প্রায় ২২ শতাংশ ক্যানসারের কারণে হয়ে থাকে। ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোলের (ইউআইসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা একটি সাক্ষাৎকারে জানান, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ নতুন ক্যানসার কেস ধরা পড়ে এবং প্রায় ৯৬ লাখ মানুষ মারা যায়, যার ৭০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশের মানুষ। তিনি আরও বলেন, ২০৩০ সাল নাগাদ মৃত্যুসংখ্যা বেড়ে এক কোটি তিন লাখে পৌঁছাতে পারে।

বিজ্ঞাপন
ক্যানসার যত পরে ধরা পড়বে, চিকিৎসার খরচ তত বাড়বে। অ্যাডভান্স অবস্থায় ধরা পড়লে সে যে ধরনের ক্যানসারই হোক না কেন, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনেক জটিলতাও ক্যানসারের সঙ্গে জড়িত। একটি মানুষ মারা গেলে পরিবারের একটি কিংবা একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশে ক্যানসারের চিকিৎসা করানোও অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার। ক্যানসারের চিকিৎসা করা দেশের নয়টি সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির পুরো কোর্সের জন্য ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয় এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় একই রেডিওথেরাপির পুরো কোর্সের জন্য গুনতে হয় এক থেকে তিন লাখ টাকা এবং আনুষঙ্গিক ওষুধ এবং থাকা-খাওয়ার খরচ।

ক্যানসার যত পরে ধরা পড়বে, চিকিৎসার খরচ তত বাড়বে। অ্যাডভান্স অবস্থায় ধরা পড়লে সে যে ধরনের ক্যানসারই হোক না কেন, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে, ফলে অর্থনৈতিকভাবে পরিবার–পরিজন আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে দেখা যায়, লাং বা ফুসফুসের ক্যানসার, খাদ্যনালি বা অসোফেগাস এবং নারীদের ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পরে বেশি। বায়ুদূষণ, খাদ্যাভ্যাস, খাদ্যে ভেজাল ইত্যাদি এ সব ক্যানসার তৈরির জন্য দায়ী।

বিশ্বজুড়েই এখন শিল্পায়নের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধুমপায়ীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এসব কারণে শরীরের যে অঙ্গ সরাসরি বাইরের পরিবেশের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান আদান–প্রদান করে, সেসব অঙ্গের ক্যানসার বেশি দেখা যায়। আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর ক্যানসার রিসার্চের মতে, বিশ্বে সব ক্যানসারের মধ্যে অন্যতম হলো লাং, ব্রেস্ট এবং কোলন ক্যানসার।

বিশ্বজুড়েই ক্যানসার নিয়ে এক সুপ্ত আতঙ্ক সবার মধ্যেই বিরাজ করে, কিন্তু এ ভয় নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, হয়তো এমন এক দিন আসবে, বিজ্ঞানের কল্যাণে ক্যানসারও সাধারণ সর্দি–কাশির মতো নিরাময়যোগ্য হবে। এ ধরনের মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখেই প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালন করা হয়ে থাকে।
২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে ক্যানসারের বিরুদ্ধে বিশ্ব শীর্ষ সম্মেলনে যখন বিশ্ব ক্যানসার দিবস তৈরি করা হয়েছিল, তখন এর লক্ষ্য ছিল গবেষক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, রোগী, সরকার, ব্যক্তি, মিডিয়া ক্যানসার এবং এর সর্বশ্রেষ্ঠ মিত্র ভয়, অজ্ঞতা ও আত্মতৃপ্তির বিরুদ্ধে একটি অদম্য জোট গঠন করা।

বিজ্ঞাপন

এখন বিশ্ব ক্যানসার দিবস ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা এবং শিক্ষা বাড়াতে, পাশাপাশি সরকারকে অনুপ্রাণিত করতে পুরো বিশ্বকে একত্র করে চলেছে। এ দিবসের মূল লক্ষই হলো সবাইকে ক্যানসার নিয়ে সচেতন করা। কীভাবে খাদ্যাভ্যাস ঠিক রাখলে, শরীরের যত্ন নিলে এবং আমদের পরিবেশের যত্ন নিলে বিভিন্ন দূষণের মাত্রা কমে যায় এবং সুস্থভাবে জীবন যাপন করা যায়, এ বার্তা প্রচার করাই বিশ্ব ক্যানসার দিবসের লক্ষ। এর পাশাপাশি স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকলে ক্যানসার যেমন আগে থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তেমনি চিকিৎসা খরচ কমে যায় এবং বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বহু অংশে বৃদ্ধি পায়।

২০২১ সালে বিশ্ব ক্যানসার দিবসের ক্যাম্পেইন ছিল ‘আই অ্যাম অ্যান্ড আই উইল’। গত বছর যার মূলমন্ত্র ছিল ‘টুগেদার উই ক্যান’, অর্থাৎ ‘আমরা একসঙ্গে সব পারি।’ যখন আমরা একত্র হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, আমরা আমাদের সবার জন্য যা ইচ্ছা তা অর্জন করতে পারি। ক্যানসার মুক্ত একটি স্বাস্থ্যকর, উজ্জ্বল বিশ্ব আমাদের সবার কামনা। সেটা আমরা পারি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে।

লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর মেডিকেল অনকোলোজি বিভাগ, এভারকেয়ার হাসপাতাল

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন