ক্যানসার চিকিৎসায় সঠিক ডায়াগনসিস গুরুত্বপূর্ণ

‘আই অ্যাম, আই উইল বি, আমি আছি, আমি থাকব’ প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হলো ২০২১ সালের বিশ্ব ক্যানসার দিবস। দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত হলো এভারকেয়ার হাসপাতাল নিবেদিত ক্যানসারবিষয়ক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন এভারকেয়ার হাসপাতালের হেমাটোলজি অ্যান্ড স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ এবং এভারকেয়ার হাসপাতালের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর ডা. ফেরদৌস শাহারিয়ার সাইদ। সঞ্চালনায় ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তেহরীন।

৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানটি প্রথম আলো ফেসবুক পেজ থেকে সম্প্রচার করা হয়।

প্রথমেই আলোচনা করা হয় বিশ্ব ক্যানসার দিবসের গুরুত্ব নিয়ে। ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ বলেন, সাধারণ মানুষের ভেতর ক্যানসার শনাক্ত করা এবং এ নিয়ে যে আতঙ্ক আছে, তা দূর করা আর সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী ক্যানসার দিবস পালন করা হয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ এ রোগে ভুগে থাকে। কিন্তু সারা বিশ্বে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান কত, তা নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য নেই।  

বিজ্ঞাপন

কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশে এখনকার মতো এত বেশিসংখ্যক ক্যানসারের রোগী দেখতে পাওয়া যেত না। বিগত বছরগুলোতে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এর কারণ সম্পর্কে ডা. ফেরদৌস শাহারিয়ার সাইদ বলেন, ‘আমাদের দেশে চিকিৎসা–সুবিধা অনেক উন্নত হয়েছে। তাই রোগী আগের থেকে বেশি শনাক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া পরিবেশদূষণ, খাদ্যে ভেজাল, অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড গ্রহণ এবং ব্যায়াম, কায়িক পরিশ্রম কম করার ফলে মানুষ ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।’

default-image

এখন ক্যানসার রোগের ধরনেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহের আলোচনা থেকে জানা যায়, আগে ব্লাড ক্যানসার ছিল এক রকমের, যাকে সাধারণত লিউকেমিয়া বলা হতো। এরপর আসে ব্লাড ক্যানসারের আরেকটি ধরন লিম্ফোমা। আগে মাত্র দুই রকমের লিম্ফোমা ছিল। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ১১০ রকমের। মাইলোমা ব্লাড ক্যানসারেরও একই অবস্থা। ঠিক ব্লাড ক্যানসারের মতোই প্রোস্টেট, জরায়ু, ফুসফুসের ক্যানসারের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ বলেন, পুরুষেরা প্রোস্টেট, কোলন, ফুসফুসের ক্যানসার আর নারীদের ব্রেস্ট, জরায়ুর ক্যানসার অনেক বেশি হয়ে থাকে। তাঁর আলোচনা থেকে আরও জানা যায় যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে যে হারে ক্যানসারের রোগী বাড়ছে, সেভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা ৭০ শতাংশ বেড়ে যাবে।

আমাদের দেশে নারীরা সবচেয়ে বেশি ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এর কারণ হিসেবে ডা. ফেরদৌস শাহারিয়ার সাইদ বলেন, অল্প বয়সে পিরিয়ড শুরু হয়ে বেশি বয়স পর্যন্ত চলতে থাকলে হরমোনগত কারণে ব্রেস্ট ক্যানসার হতে পারে।

স্থূলতা বা শরীরে অতিরিক্ত চর্বিও এর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী। এ ছাড়াও যাদের বংশে ব্রেস্ট ক্যানসারের ইতিহাস আছে, তাদের একটা বড় ঝুঁকি থেকে যায়। এ জন্য তিনি ২০ বছর বয়সের পর থেকে পিরিয়ড শেষ হওয়ার ১০ দিন পর সেলফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন বা নিজের ব্রেস্ট নিজে চেপে পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। আর ৩৫ বছর বয়সের পর থেকে প্রতিবছর মেমোগ্রাফ আর ব্রেস্টের ইউএসজি করতে হবে। যাঁদের পরিবারে ব্রেস্ট ক্যানসারের ইতিহাস নেই, তাঁদের ৪০ বা ৪৫ বছর বয়সের পর প্রতি দুই বছর অন্তর মেমোগ্রাফ, ইউএসজি করলেই চলবে।

default-image

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্লাড ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত কম হয়। সলিড ক্যানসারের চেয়ে এটি একটু ভিন্ন। প্রায় চার রকমের ব্লাড ক্যানসার আছে। এর লক্ষণগুলো জানা যায় ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহর আলোচনা থেকে। লিউকেমিয়ার লক্ষণ হিসেবে তিনি বলেন, জ্বর, সর্দি-কাশি, অ্যানিমিয়া, কোনো কারণে অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া, নারীদের পিরিয়ড হলে দীর্ঘদিন ধরে রক্তক্ষরণ হওয়া, ঘামাচির মতো লাল লাল দাগ হওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট হওয়া, অল্প কাজে হাঁপিয়ে ওঠা। এ রকম লক্ষণে ভোগা নারীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় বলে খুব সহজে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

এসব লক্ষণ দেখা দিলে সিবিসি টেস্ট করলেই রক্তের উপাদানের একটি অস্বাভাবিক অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। লিম্ফোমার ক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন গ্ল্যান্ড ফুলে যেতে পারে, পেটে ব্যথা বা স্প্লিন অথবা লিভার ফুলে যাওয়ার ফলে শরীরে চাকা চাকা ভাব দেখা দিতে পারে। এ জন্য শরীরের ব্যথাও হয়। এ ক্ষেত্রে সিবিসি, ইএসআর টেস্ট করলেই ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে।

default-image

বাংলাদেশে একসময় জরায়ুমুখের ক্যানসারে নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। এর একটি প্রধান কারণ আর্থসামাজিক অবস্থা আর পিরিয়ডকালীন পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার অভাব। এখন পরিস্থিতি বেশ পরিবর্তন হচ্ছে। গ্রামের নারীরাও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছেন। ডা. ফেরদৌস শাহারিয়ার সাইদ বলেন, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস মূলত এ ক্যানসারের জন্য দায়ী। তবে তা প্রকাশ হতে ১০ বা ১২ বছর লেগে যেতে পারে। এর আগেই কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায় যে কে এ রোগের ঝুঁকিতে আছে।

আমাদের দেশে এ রোগ শনাক্তের জন্য পেপস্মিয়ার, ভায়ার টেস্ট করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ছোট ছোট সার্জারি করলেই সেরে যায়। আর ছড়িয়ে গেলে কেমো, রেডিও বা ইমিউনোথেরাপি দিতে হয়। এখন এ রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা পাওয়া যাচ্ছে। টিকাটি ৯ থেকে ১৩ বছর বা বিয়ের আগে দিতে হয়।

ক্যানসারের চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে আছে। ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ জানান, আগে এখানে ব্লাড ক্যানসার ডায়াগনসিসে বেশ ভুল হতো। কিন্তু এখন ইমিউনোফেনোটাইপিং নামের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে ব্লাড ক্যানসার আর তার ধরন নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া এর অত্যাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে সব ধরনের ব্লাড ক্যানসারের কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। এখন আমাদের দেশেই ক্যানসারের ওষুধ তৈরি হচ্ছে।

default-image

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় এভারকেয়ার হাসপাতালে ক্যানসারের অত্যাধুনিক চিকিৎসার সুযোগ আছে। এ নিয়ে ডা. ফেরদৌস শাহারিয়ার সাইদ বলেন, ‘এখানে ডায়াগনসিসের দিক দিয়ে বিশ্বমানের কিছু অ্যাডভান্স পদ্ধতি, যেমন হিস্টোপ্যাথলজি, সাইটোলজির ব্যবস্থা আছে। এমনকি ক্যানসারের সাব টাইপ আর স্টেজ শনাক্ত করার আধুনিক মেশিনও আছে। এরপর আসে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা। এভারকেয়ার হাসপাতালে সার্জারি বিভাগ বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ, দক্ষ চিকিৎসক দ্বারা পরিচালিত।

এভারকেয়ার হাসপাতালে সব রকমের থেরাপির ব্যবস্থা আছে। এর ভেতর ইমিউনোথেরাপি দেশের বাইরে থেকে এনে দেওয়া হয় এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে তার চিকিৎসাও এখানে ভালোভাবেই করা হয়। এখানে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো কেমোথেরাপির স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন আর প্রটোকল অনুসরণ করা হয়। দক্ষ টেকনোলজিস্ট আর রেডিও অনকোলজিস্ট বিভাগের ফিজিসিস্টরাই এসবের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকেন। তাঁরাই কম্পিউটার আর সিটি সিমিউলেটরের মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান করে থাকেন। এভারকেয়ার হাসপাতালে ফেট বেস সিমিউলেশন করা হয়, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও করা হয় না।

ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ক্যানসারের অনেক রোগী গ্রামের দিকে থাকেন। তাঁদের ডায়াগনসিস ঠিকমতো না করেই চিকিৎসা শুরু করা হয়। এই ভুল অনুশীলনটা অনেক আগে থেকে হয়ে আসছে, যার ফল খুব খারাপ হয়।’ তিনি আরও বলেন, আধুনিক চিকিৎসার ফলাফল পেতে গেলে ডায়াগনসিসের পাশাপাশি রিস্ক স্ট্যাটিফিকেশন জরুরি।

default-image

অনেক ব্লাড ক্যানসার আছে, যেমন ছোটদের লিউকেমিয়া কেমোথেরাপির মাধ্যমে ৯০ শতাংশ নিরাময়যোগ্য। বড়দের লিউকেমিয়া ৬০ শতাংশ নিরাময় করা যায়। আবার কঠিন পর্যায়ের ব্লাড ক্যানসার বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করে ৫০ শতাংশের মতো নিরাময় সম্ভব। রিস্ক স্ট্যাটিফিকেশন না করে চিকিৎসা শুরু করলে পরবর্তী সময়ে বের করা যায় না যে কার শুধু কেমোথেরাপি দরকার আর কার বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট দরকার। এর ফলে চিকিৎসায় কত খরচ হবে, সেটাও এর মাধ্যমে জানা যায়। ফলে যেসব রোগীর সামর্থ্য নেই তাঁদের কাউন্সেলিং করা সহজ হয়। তাঁরা নিজেদের অর্থের সঠিক ব্যবহার করে সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।

ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ আরও বলেন, যেকোনো ক্যানসার চিকিৎসার জন্যই সঠিক ডায়াগনসিস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এভারকেয়ার হাসপাতাল এদিক দিয়ে বাংলাদেশে অন্যান্য হাসপাতালের চেয়ে এগিয়ে। এখানে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নির্ণয়ের জন্য এমআরডি (মিনিমাল রেসিডিউয়াল ডিজিজ) ব্যবস্থা আছে। এটি মোটেও ব্যয়বহুল টেস্ট নয়। লোকাল হাসপাতালে কেমো নিয়ে কেউ চাইলে এখানে এসে এই পরীক্ষাটি করিয়ে নিতে পারেন।

বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন