জীবনধারার পরিবর্তনে সম্ভব ক্যানসার প্রতিরোধ

বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধিগুলোর মধ্যে ক্যানসার অন্যতম। বাংলাদেশেও এটি মৃত্যুহারের জন্য দায়ী রোগগুলোর তালিকায় রয়েছে। তাই ক্যানসার যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধ করা যায়, সে জন্য এর উপসর্গ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখতে হবে। তবে আশার কথা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করলে জটিলতা এড়ানো যায়।

বিজ্ঞাপন

কিছু ক্যানসার রয়েছে যার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, আবার কিছু রয়েছে যেগুলো আমরা জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিবর্তন করতে পারি। এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। নিয়মমাফিক চলাফেরার মাধ্যমে ক্যানসার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবসকে কেন্দ্র করেই এ পর্বের আয়োজন করা হয়।

default-image

এসকেএফ অনকোলজি নিবেদিত এ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যোগ দেন ডা. শাহিদা আলম, সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা এবং ডা. মুহাম্মদ মাসুদুল হাসান, কনসালট্যান্ট অনকোলজি, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরা, ঢাকা।

অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রথম আলো ও এসকেএফের ফেসবুক পেজ থেকে সম্প্রচারিত হয়। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ডা. মো. শাহরিয়ার ইসলাম।

ডা. শাহিদা আলম বলেন, ইউআইসিসি ৪ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব ক্যানসার দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিবছরই বিশ্ব ক্যানসার দিবসকে কেন্দ্র করে একটি স্লোগান থাকে। ২০১৯ সালে ৩ বছরের জন্য একটি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে একটি স্লোগান নির্ধারণ করা হয়, যা এ বছরেও প্রযোজ্য। ইংরেজিতে স্লোগানটি হলো: আই এম অ্যান্ড আই উইল অর্থাৎ আমি আছি এবং আমি থাকব। এখানে বোঝানো হয়েছে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে থাকার কথা।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে অসুখের জন্য মানুষের মৃত্যুর প্রথম কারণ হিসেবে ক্যানসারকে চিহ্নিত করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রথম কারণ হিসেবে কার্ডিও-ভাস্কুলার ডিজিজ শীর্ষে। তবে ধারণা করা হয়, খুব শিগগির ক্যানসার প্রথম কারণে পরিণত হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য আমাদের প্রস্তুতিটা এখন থেকেই নেওয়া প্রয়োজন। ক্যাম্পেইনের এই থিমটা নির্বাচন করা হয়েছে এই ভাবনা থেকে, আজ আমরা যে পদক্ষেপ গ্রহণ করব তার ফল আমরা ভবিষ্যতে পাব। এই লক্ষ্যে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা ভালো ফল পাব বলে আশা করা যায়।

বিজ্ঞাপন

অঞ্চলভেদে আর্থসামাজিক অবস্থা ও জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে ক্যানসারের ধরন বিভিন্ন হয়ে থাকে। এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ নেই। ক্যানসার হলো শরীরের একটি কোষ যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে কোনো চাকা তৈরি করছে, যা কোনো সিস্টেম অনুযায়ী চলছে না। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে তার মধ্যে কেমিক্যাল অ্যাসিড অন্যতম। খাবারের মাধ্যমেও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।

এ ছাড়া ধূমপান কিংবা তামাকজাত দ্রব্য সেবনকে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের পেছনে বেশি দায়ী করা হয়। কলকারখানা বা এ জাতীয় স্থানে মাস্ক না পরে কাজ করলেও এর ঝুঁকি বাড়ে। তা ছাড়া বিভিন্ন ভাইরাস যেমন আমাদের দেশের নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসকে দায়ী করা হয়। আজকাল শরীরচর্চার ওপর অনেকেই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। সার্বিকভাবে বলা যায়, আমাদের জীবনযাত্রার ধরনের ওপর ক্যানসার অনেকাংশে নির্ভরশীল।

ডা. মুহাম্মদ মাসুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের ক্যানসার রেজিস্ট্রি হলো হসপিটাল বেজড রেজিস্ট্রি। কিন্তু কমিউনিটি বেজড রেজিস্ট্রিটা আমরা এখনো শুরু করতে পারিনি। ফলে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ চিত্রটি এখনো আমরা তুলে ধরতে পারছি না; আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে আমরা তা তুলে ধরতে পারব। আমরা অচিরেই প্রান্তিক পর্যায়ে ক্যানসার রেজিস্ট্রি শুরু করার পরিকল্পনা করছি।

এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তা হসপিটাল বেজড বা আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে গবেষণা করা হয়েছে। যার ফলে এই তথ্যগুলো আংশিক গবেষণার ফল, সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। আবার ধারণা করা হয়, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০ ভাগ ক্যানসার রোগী এই দেশগুলোর অন্তর্গত এবং আমরা এর মধ্যেই আছি। এ ছাড়া মহাদেশগুলো অনুসারে এর ঝুঁকি এশিয়া মহাদেশে সবচেয়ে বেশি। বলা যায়, ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া এবং মারা যাওয়ার র‍্যাঙ্কিংয়ে এশিয়া মহাদেশ প্রথম।’

ক্যানসার থেকে নিরাপদে থাকতে হলে এর উপসর্গগুলো জেনে নেওয়া খুবই জরুরি। ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় সেগুলো একটি সূত্রের সাহায্যে সহজেই মনে রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে ইংরেজি ‘CAUTION’ শব্দটি মনে রাখতে হবে, যার ৭টি অক্ষর ৭টি উপসর্গ বর্ণনা করে। প্রথমটি দ্বারা বোঝানো হয় মলের ধরনের পরিবর্তন। দ্বিতীয়টি হলো শরীরের চামড়া বা অন্য কোনো স্থানে ঘা বা ক্ষত না শুকিয়ে ৩-৪ সপ্তাহের বেশি থাকা। তৃতীয়টি হলো অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ। চতুর্থটি হলো শরীরের কোনো স্থানে টিউমার সৃষ্টি হওয়া। পঞ্চম উপসর্গ ধরা হয় হজমে সমস্যা বা বমি ভাব কিংবা অ্যাসিডিটিকে। ষষ্ঠ উপসর্গ হলো তিলের আকার আকস্মিক পরিবর্তন। আর দীর্ঘমেয়াদি কাশি, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া কিংবা গলার স্বরের পরিবর্তনকে এই সূত্র অনুযায়ী ক্যানসারের সপ্তম উপসর্গ হিসেবে ধরা হয়।

ক্যানসার পুরোপুরিভাবে প্রতিরোধ করা না গেলেও এর ঝুঁকির কারণগুলো জানা থাকলে আমরা সচেতন হতে সক্ষম হব। ফলে এর ঝুঁকি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারব। বলা যেতে পারে, বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার ধরন আগের চেয়ে অনেক উন্নত এবং এখানে বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন