টিকা এলেও মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি

করোনা মহামারির ভয়াবহতা এখনো চলমান। ভয়-শঙ্কার মধ্যেই জীবিকার তাগিদে ছুটছে মানুষ। কিছুটা আশা জাগিয়েছে টিকা। অবশ্য এখনো তা সবার হাতের নাগালে নয়। আবার টিকার কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে নানা মত-দ্বিমত। কত দিনই-বা সুরক্ষা দেবে এই টিকা, তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প এখনো নিশ্চিতভাবে তৈরি হয়নি।

default-image

করোনায় রোগীদের নানা ধরনের স্বাস্থ্য-জটিলতা ও এর প্রতিকার নিয়ে প্রথম আলো আয়োজন করে এসকেএফ নিবেদিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ের সুরক্ষা’। অনুষ্ঠানটির অষ্টম পর্বে ডা. নাদিয়া নিতুলের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন কুমিল্লার ময়নামতি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কার্ডিওলজির সাবেক অধ্যাপক তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ।

অনুষ্ঠানটি ১৩ জানুয়ারি প্রথম আলো ও এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানের শুরুতেই অধ্যাপক তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ আলোচনা করেন রক্ত জমাট বাঁধার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে। তিনি বলেন, পুরো পৃথিবীর মানুষ এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অতিক্রম করছে। এরই মধ্যে প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা গেছেন। তবে ডাক্তারি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের বয়স বেশি, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে যাঁদের কোমর্বিডিটি আছে, বিশেষ করে যাঁদের হৃদ্‌রোগ, কিডনি, স্টোক, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে অথবা ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগে যাঁরা আগে থেকেই ভুগছেন।

দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের সংক্রমণে যাঁরা ভুগছেন, তাঁদেরও মৃত্যুঝুঁকি বেশি। করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে করা নানা গবেষণায় দেখা গেছে, ফুসফুসে রক্ত জমাট বেঁধেই বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর রোগীদের বড় একটি অংশের দেহেই কোভিড-১৯ অবিশ্বাস্য রকমের ঘন এবং আঠালো রক্ত তৈরি করে, যা এক বড় সমস্যা। এর ফলে রোগীর পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে, যাকে বলে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস এবং এটা সারা শরীরে ঘুরে ফুসফুসে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে নিউমোনিয়া আরও গুরুতর চেহারা নেয়।

জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্ক বা হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে রোগীর হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক হতে পারে। সুতরাং আমাদের মনে রাখতে হবে, শরীরের গভীর শিরাগুলোর যেকোনো একটিতে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়াকে বলা হয় ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস। এটি সাধারণত পায়ের ভেতরের দিকে একটি শিরায় হয়, যে শিরাটি পায়ের মাংসপেশি হয়ে ঊরুর মাংসপেশির ভেতর দিয়ে ওপরে উঠে যায়। এর কারণে পায়ে ব্যথা হয়, ফুলে যায়। শঙ্কার বিষয় হলো, এ থেকে পালমোনারি এম্বোলিজম হতে পারে, যার কারণে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এ আশঙ্কা আরও জটিল।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হলে, যেমন কোনো অপারেশনের পর বা আইসিইউ রোগী বা এমন অসুস্থতা, যার কারণে শয্যাশায়ী থাকতে হয়, তাঁদের ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের আশঙ্কা দেখা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের কোনো চিহ্ন বা লক্ষণ থাকে না। আবার কিছু কিছু লক্ষণ দেখা যায়। তবে লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি। লক্ষণগুলো হলো যেকোনো এক পায়ে, বিশেষ করে পায়ের গোছার মাংসপেশির কাছে যদি ফোলা, ব্যথা এবং চাপ দিলে ব্যথা অনুভূত হয় এবং দাঁড়িয়ে থেকে হাঁটু ভাঁজ করে পায়ের পাতা ঊরুর দিকে তুললে ব্যথা অনুভূত হয় অথবা তীব্র ব্যথা হয়। পায়ের পেশিতে গরম অনুভূত হলে অথবা পায়ের মাংসপেশি যদি লাল হয়ে ফুলে ওঠে।

ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের চিকিৎসা দ্রুত করা উচিত। না হলে এর থেকে পালমোনারি এম্বোলিজম ডেভেলপ হতে পারে। ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের জমাট বাঁধা রক্ত যখন সেখান থেকে ছুটে গিয়ে রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে শ্বাসতন্ত্রের প্রধান শিরা বা কোনো শাখাশিরায় আটকে যায় এবং সেখানে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেয়, তখন সেটাকে পালমোনারি এম্বোলিজম বলে। এর ফলে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। শ্বাস টানার সময় বুকে ব্যথা হতে পারে। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস ও পালমোনারি এম্বোলিজম—দুটিই খুব মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এরপর অধ্যাপক তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ আলোচনা করেন টিকার নানা মত ও দ্বিমত নিয়ে। তিনি বলেন, টিকা নিয়ে কথা বলতে হলে এর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের করা গবেষণাগুলো দেখতে হবে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যগুলো দেখতে হবে। টিকার ওপর বিশ্বাস না রাখার কোনো কারণ নেই। কারণ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই টিকা বাজারে ছাড়া হয়। এর অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। ট্রায়ালের মাধ্যমেই এর নিরাপত্তা যাচাই করা হয়। সুতরাং এ বিষয়ে সন্দেহের তেমন কোনো অবকাশ রয়েছে বলে আমি মনে করি না। একটি বিষয় রয়েছে, আমরা যদি টিকা তৈরির ইতিহাস দেখি তাহলে দেখা যাবে, একটি টিকা তৈরি করতে ৫ থেকে ১০ বছর লেগে যায়। এবারের টিকা তৈরি করা হয়েছে অনেক দ্রুততার সঙ্গে।

এখন এই মহামারি থেকে পরিত্রাণে এটি দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে। টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ সফলতার সঙ্গে কাজটি করেছে বলা যায়। এমনকি আমরা দেখেছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টরা টিকা গ্রহণ করছেন, যাতে এটি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া আমাদের উপায় নেই। টিকা চলে এলেও তা কত দিনে সবার কাছে পৌঁছাবে, তা আমরা যেমন জানি না, ঠিক আরও একটি বিষয়ে আমরা এখনো জানি না, আর তা হচ্ছে এই টিকা কত দিন পর্যন্ত কাজ করবে। হয়তো প্রতিবছরই আলাদাভাবে আমাদের বুস্টার ডোজ নিতে হবে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।

মন্তব্য করুন