বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, সারা বিশ্বের মোট ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে বাস করেন। ডায়াবেটিস রোগীর ধরন অনুযায়ী প্রায় ৯৫ ভাগ রোগী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ মারা যান হৃদ্‌রোগের কারণে। স্ট্রোকেও মারা যান অনেকে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রেশার ও লিপিড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, স্থূলতা কমাতে হবে, ধূমপান ছাড়তে হবে।

স্বাস্থ্য সংলাপে বারডেম একাডেমির পরিচালক এবং ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের অধ্যাপক ফারুক পাঠান বলেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তাঁরা ডাক্তারের কাছে আসেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পাঁচ-ছয় বছর পর। এ দেশের মানুষের আয়ুষ্কাল ৭৩ বছর হলেও, ডায়াবেটিস রোগীর আয়ুষ্কাল ৬৩ বছর। শুধু ডায়াবেটিস থাকার কারণেই জীবন থেকে তাঁদের ১০ বছর ‘নেই’ হয়ে যায়। এই ১০ বছর তাঁরা পরিবার, সমাজ ও দেশকে দিতে পারতেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ বলেন, বাংলাদেশে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে ডায়াবেটিস মাপার যন্ত্র আছে। ইচ্ছা থাকলেই কেউ সেখানে গিয়ে তাঁর সুগার মাপতে পারেন এবং বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১১ শতাংশ রোগী জানতেন তাঁদের ডায়াবেটিস আছে। ২০১৮ সালে কিন্তু সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ শতাংশ। ২-৩ বছর আগের তথ্য অনুযায়ী ডায়াবেটিসে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার রোগী মারা গিয়েছিলেন। এই মৃত্যু ঠেকাতে হলে সচেতন হতে হবে।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মীর মোশারফ হোসেন বলেন, ডায়াবেটিসের সঙ্গে প্রেশার এবং রক্তে চর্বি জমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। শুধু গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিসের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। এর সঙ্গে প্রেশার ও লিপিড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোনো ডায়াবেটিস রোগীর বয়স ৪০ বছর হলে, তাঁর লিপিড লেভেল যা-ই থাকুক না কেন, তাঁকে ওষুধ দিতে হবে।

ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে হলে সচেতনতা ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সমীর কুমার তালুকদার। তিনি বলেন, যাঁদের খাওয়ার কোনো টাইম-টেবিল থাকে না, তাঁদের গ্লুকোজের মাত্রা ঘন ঘন টেস্ট করতে হয়। লিভার বা কিডনির সমস্যা থাকলে তাঁদের ক্ষেত্রে খুব তাড়াতাড়ি সুগার লেভেল কমে যায়। ‘হোম ব্লাড গ্লুকোজ মনিটরিং সিস্টেম’ প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীর বাসায় থাকা উচিত।

অল্প বয়সে ওজনের আধিক্য থেকে ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে জানান ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহসানুল হক (আমিন)। তিনি বলেন, শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে। শুধু পড়াশোনা নয়, সন্তানের খেলাধুলার বিষয়েও বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। স্থূলতা, ওজনের আধিক্য একটা মইয়ের মতো কাজ করে। এই সিঁড়ি বেয়েই শরীরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের মতো নানা রকম জটিলতা তৈরি হয়।

বারডেম হাসপাতালের ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের প্রধান মো.ফিরোজ আমিন বলেন, এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী বিষণ্নতায় ভোগেন। সারা জীবন ওষুধ খেতে হবে, মিষ্টি খেতে পারবেন না, নিয়মিত হাঁটাচলা করতে হবে বা ওষুধের খরচ অনেক বেশি—এসব শোনার পর অনেক রোগী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যান। হতাশা থেকে কোনো কোনো রোগী হাঁটা বন্ধ করে দেন, অতিরিক্ত খাবার খান; আবার কেউ ওষুধ খাওয়াই ছেড়ে দেন।

ডায়াবেটিসের সেবা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান ফারহানা আক্তার বলেন, সবার জন্য সেবা নিশ্চিত করতে চাইলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডিজিটাল ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিভাগকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান মো. শাহ্‌ এমরান বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশের ১৫০ জন এনডোক্রাইনোলজিস্ট দিয়ে চিকিৎসা করা যাবে না। এনডোক্রাইনোলজিস্ট বাড়াতে হবে এবং এনডোক্রাইনোলজি বিভাগ খুলতে হবে। প্রতিটি জেলায় এনডোক্রাইনোলজিস্ট থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চিকিৎসক নাদিয়া ইসলাম।

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন