ডায়াবেটিস: নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণে মুক্তি
দেশে ৯৫ শতাংশের -বেশি রোগী টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। পরিবারে ডায়াবেটিস থাকলে, ওজন বেশি থাকলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

১৪ নভেম্বর ছিল বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এর প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে এসকেএফ ও প্রথম আলো আয়োজিত লাইভের শেষ দিনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. এম এ হালিম খান, সহকারী অধ্যাপক (ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা ও ডা. মো. শাহ্ এমরান, সহকারী অধ্যাপক (ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি), সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ, সিলেট এবং সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ডা. বিলকিস ফাতেমা।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের গুরুত্ব বিষয়ে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, ‘ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পাচ্ছে জ্যামিতিক হারে। এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়াতে এর ঝুঁকি আরও বেশি। আমাদের দেশে প্রতি দশজনের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। শিশুরাও এর বাইরে নয়। এটি এমন একটি ডিজিজ, যা অন্য আরও নন–ডিজিজের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং সচেতনতাই পারে এ অসুখকে নিয়ন্ত্রণ করতে। তাই বিভিন্ন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এ দিবস পালন করে দেশবাসীকে সচেতন করে তুলতে হবে।’

রোগীর মধ্যে ডায়াবেটিস বিষয়ে সচেতনতা কীভাবে তৈরি করা সম্ভব? সঞ্চালকের এই প্রশ্নে ডা. মো. শাহ্ এমরান বলেন, ‘রোগীর সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হলে বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে হবে। যেমন হাসপাতালে আমরা সপ্তাহে এক দিন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইন করি। এর বাইরে বিভিন্ন স্কুলে আমরা ডায়াবেটিস সম্পর্কে ক্যাম্পেইন করে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করি। এর বাইরে রয়েছে জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের মাধ্যমে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার পদ্ধতি।’

ডায়াবেটিসের প্রকার সম্পর্কে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, প্রধানত চার ধরনের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। টাইপ ১, টাইপ ২, গর্ভকালীন এবং বিশেষ ধরনের। আমাদের দেশে ৯৫ শতাংশের -বেশি রোগী টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। পরিবারে ডায়াবেটিস থাকলে, ওজন বেশি থাকলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর বাইরে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং যাঁদের প্রি–ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের সম্ভাবনা খুব-ই বেশি। এর বাইরে পলিসস্টিক ওভারি, স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ এবং হাইপার টেনশনের রোগীদের অচিরেই এ অসুখে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

default-image

ডা. মো. শাহ্ এমরান জানালেন কীভাবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং বিলম্বিত করা যায় সে প্রসঙ্গে। তিনি জানান, সাধারণ মানুষের খাবার গ্রহণের আগে সুগার লেভেল ৩.৫ এবং খাবার গ্রহণের পরে তার পরিমাণ হয় ৮। এর ওপর হলেই আক্রান্ত হিসেবে গণ্য হবে। প্রতিরোধের জন্য কী কী কারণে ডায়াবেটিস হতে পারে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। যেমন ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম বৃদ্ধি করতে পরামর্শ দিতে হবে। যদি চিকিৎসক খাবার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে পরামর্শ দিতে হবে সঠিক ডায়েট গ্রহণের। কারও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে তাঁকেও সচেতনতার পরামর্শ দিতে হবে। সচেতনতা ও জীবনযাপনের নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং বিলম্বিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ডা. এম এ হালিম খান বলেন, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকলে অথবা নির্ণীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়েটে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে হবে। শর্করাজাতীয় খাবার যেমন ভাত ও আলুর পরিমাণ কমাতে হবে। প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে প্রচুর ফল ও সবজি। চর্বিজাতীয় খাবার খেতে হবে পরিমিত পরিমাণে। মনে রাখতে হবে, ডায়াবেটিস রোগীর খাবার গ্রহণে পরিমিত হতে হবে, কোনো খাবার খাওয়া যাবে না, এমন নয়। সুষম খাবার গ্রহণের চেষ্টা করতে হবে। লো–কার্ব ধরনের ডায়েটে ডায়াবেটিস রোগীর শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। বিকল্প মিষ্টি গ্রহণেও হতে হবে সচেতন। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে এ ধরনের মিষ্টি খাবারও এড়িয়ে চলতে হবে।

default-image

ডায়াবেটিস রোগী রক্তদান করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে ডা. মো. শাহ্ এমরান বলেন, ডায়াবেটিস রোগীর জন্য রক্তদানের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু তাঁর শরীরে যদি অন্য কোনো কোমরবিডিস রোগ থাকে, তাহলে সে বিষয়ে আলাদা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, রোজা অর্থাৎ ফাস্টিং ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বেশ উপকারী। ফাস্টিং ইমিউনিটি বাড়িয়ে তোলে, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কিডনি রোগের মতো অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ যদি রোগীর শরীরে থাকে, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর বাইরে ফাস্টিং বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখে রোগীর শরীরে।

ডায়াবেটিস রোগীকে হিমোগ্লোবিন–এ১সি পরীক্ষা করতে দেওয়ার কারণ হিসেবে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, ‘রক্তে প্রতি মুহূর্তে সুগারের পরিমাণ ওঠানামা করতে পারে। এটা অনেকটাখানি নির্ভর করে খাবার নিয়ন্ত্রণের ওপর, তাই সব সময় এই মান দেখে রোগনির্ণয় সম্ভব হয় না। হিমোগ্লোবিন–এ১সি পরীক্ষার ফলাফল ৭–এর নিচে এলে আমরা ধরে নিই রক্তে সুগারের মাত্রা বেশি নয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত দেহ সম্পর্কে এই পরীক্ষা ধারণা দেয়।’

default-image

ডায়াবেটিস নির্ণয়ে ইউরিন টেস্ট কতটুকু কার্যকরী—দর্শকের এ প্রশ্নের উত্তরে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, ডায়াবেটিসের মাত্রা যাঁদের বেড়ে যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে ইউরিন টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আর নিয়মিত ইউরিন পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস লেভেল নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কারণ এই টেস্টের মাধ্যমে ইউরিনে কোনো ধরনের ইনফেকশন থাকলে সেটাও জানা যায়। এ ধরনের তথ্য সঠিক চিকিৎসার জন্য আবশ্যক।

ডা. মো. শাহ্ এমরান জানান, অনিয়মিত ওষুধ গ্রহণে কী কী সমস্যা হতে পারে। তিনি বলেন, অনিয়মিত ওষুধ গ্রহণে রোগীর রক্তের মাত্রা অনিয়মিত হয়। ইনসুলিন এবং ওরাল ওষুধ গ্রহণ নিয়মের বাইরে হলে রোগী দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমস্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

default-image

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের এবারের এর প্রতিপাদ্য বিষয় সম্পর্কে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, ‘ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নার্সের ভূমিকা অপরিসীম। একজন সেবক বা সেবিকা রোগীর জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেন। ওষুধ গ্রহণ, ইনসুলিন গ্রহণের পদ্ধতি, সুগার লেভেল যাচাই করার পদ্ধতি বিষয়ে রোগী বিস্তারিত ধারণা পান সেবক–সেবিকাদের কাছে। তাই তাঁদের অবশ্যই এ বিষয়ে যথাযথভাবে জানতে হবে। আমাদের দেশে মাত্র ২০ শতাংশ রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে বলে গবেষণায় জানা যায়। এর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হলে সেবক–সেবিকাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে তুলতে হবে, যাতে তাঁরা রোগীদের সঠিকভাবে সহায়তা করতে পারেন।’

ডা. মো. শাহ্ এমরান দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশের সকল স্তরে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলেই আমরা ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0