default-image
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রথম আলো ও নুভিস তা ফার্মার বিশেষ আয়োজন ‘নারী-নক্ষত্র’র প্রথম পর্বে নিজের জীবন, ক্যারিয়ার ও তরুণদের নিয়ে কথা বলেছেন ওজিএসবি’র সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. লায়লা আর্জুমান্দ বানু। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. শ্রাবণ্য তৌহিদা।

default-image

নারী দিবসকে কীভাবে দেখেন? ড. লায়লা আর্জুমান্দ বানু এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমরা এখন সমতার কথা বলছি। সেখানে বছরে এক দিন নারী দিবস পালন করাকে একটু অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও এর পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ আছে। যেমন, যতই সমতার কথা বলি, এখনো নারীরা অনেক জায়গায় পিছিয়ে আছে। মূলস্রোতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বিষয়ে সবার সচেতনতা বাড়ানোর জন্য হলেও এই দিনটি পালন করা উচিত। নারীরা মা, বোন, স্ত্রী অথবা প্রেমিকা। এই বিশেষ দিনে তাদের সঙ্গে শ্রদ্ধার সম্পর্কটি উদ্‌যাপনের উপলক্ষ হতে পারে নারী দিবস।

দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী এবং স্পিকার—সবাই নারী। নারীর ক্ষমতায়নকে উৎসাহ দিতেও এই দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামাঞ্চলে এখনো নারীরা অবহেলিত। বাল্যবিবাহের শিকার কিংবা স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। এই দিনে তাদের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা তৈরি হলেও একদিন সার্থকভাবে আমরা এই দিবসটি উদ্‌যাপন করতে পারব।’

আন্তর্জাতিক নারী দিবসটি এমন একটি সময়ে এসেছে, যেখানে বাংলাদেশের নারীরা কোভিডের বিরুদ্ধে ফ্রন্ট লাইনার হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। বাংলাদেশে এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব গড়বে নতুন সমতা’। ডা. লায়লা মনে করেন, এই চমৎকার প্রতিপাদ্য দারুণভাবে মিলে গেছে এবারের কোভিড অবস্থার সময়ও। করোনাকালে নারী ডাক্তাররা সংসার-সন্তান পাশে রেখে করোনারোগীদের চিকিৎসা করেছেন, প্রসব করিয়েছেন। নারীরা যে প্রফেশনের প্রতি অসম্ভব দায়িত্ব ও নিষ্ঠাবান, তা এই করোনার সময়েই প্রমাণিত হয়েছে। এভাবেই নারীরা সব চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে আরও এগিয়ে যাবে।

default-image

করোনার শুরুর দিকে ওজিএসবির সঙ্গে মিলে টেলিমেডিসিন কার্যক্রম শুরু করেছিলেন ডা. লায়লা আর্জুমান্দ বানু। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি না দেখে চিকিৎসা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। তাই পুরোদমে চেম্বার এবং অপারেশন চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। হয়তো ছোটবেলা থেকেই একজন সার্জন হয়ে ওঠার ইচ্ছাই এর পেছনে মূল অণুযোজক। পড়ালেখা করতে ভীষণ ভালোবাসতেন। আর্মিতে জয়েন করলেন, কিন্তু সেখানে সার্জারি করতে দিত না। গাইনির কাজ করতে করতেই পেশাটাকে ভালোবেসে ফেলেন তিনি। কারণ, অনেক জটিলতার পরে একটি সদ্য নবজাতক পৃথিবীতে নিয়ে আসার পরে নতুন মায়ের মুখে যে হাসি ফোটে, ওটাই তাঁর কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।

বিজ্ঞাপন

উদারমনা মা–বাবার সন্তান হওয়ার পরও নারী হিসেবে প্রতিবন্ধকতা এসেছে তাঁর জীবনে। কারণ, বেড়ে ওঠার পরিবেশ ছিল ভীষণ রক্ষণশীল। ইন্টারমিডিয়েট পাশের পরে বড় চাচা বলেছিলেন, আর পড়ালেখার প্রয়োজন নেই। তখন ডা. লায়লার মা বলেছিলেন, ‘আমি যদি এ বাড়িতে থাকি, তাহলে আমার মেয়ে পড়বে। আপনার সব কথা আমি মেনেছি, কিন্তু এ সিদ্ধান্ত আমি কিছুতেই মেনে নেব না।’ তখন চাচা বলেছিলেন, ঠিক আছে, কেবল ডাক্তার যদি হতে চায়, তাহলেই পড়তে পারবে। মায়ের শক্ত অবস্থানের কারণেই ডা. লায়লা ডাক্তারিতে পড়ালেখা করার সুযোগ পান। আর্মিতে কাজ করার সময় প্রায়ই মাঝরাতে কল পড়ত। তখন নিজেই ড্রাইভ করে চলে যেতেন। ঈদের দিনেও হাসপাতালে যেতে হয়েছে। ছোট ছেলেটা বলত, ঈদের দিনেও তুমি জব করো, আমি কখনো ডাক্তার হতে চাই না। কিন্তু অনেকেই যখন দেখা হলে বলেন, আপনি রাত তিনটায় আমার ডেলিভারি করেছিলেন—ওই তৃপ্তিটুকুই সব অপ্রাপ্তি মিটিয়ে দেয়।

তবে ডা. লায়লা বলেন, সব নারীর জীবন অবশ্য এমন নয়। প্রথিতযশা নারী ডাক্তারকেও ঘরে ফিরে শাশুড়ির নির্যাতন তিনি সইতে দেখেছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখেছেন। অনেকেই ডাক্তার মেয়ে বিয়ে করতে চান, কিন্তু বিয়ের পরে আর ডাক্তারি করতে দেন না। মাঝরাতে কল আসবে, সংসারে ব্যাঘাত ঘটবে—এই শঙ্কায়। এই পরিস্থিতি এখনো বদলায়নি।

ঘরের এবং বাইরের কাজে ব্যালেন্স করতে টাইম ম্যানেজমেন্টের প্রতি জোর দিলেন ডা. লায়লা। সব মেয়েকেই একসময় কমবেশি সংসারে মন দিতে হয়। ডা. লায়লা সেসব ঘড়ি ধরে করেছেন। ছেলেকে সময়মতো খাইয়ে স্কুলের জন্য রেডি করা, ঘর ও রান্না গুছিয়ে বের হওয়া, অফিস থেকে ফিরে আবার সংসারী হয়ে ওঠা। রান্নার শখ ছিল। অতিথিদের জন্য নিজেই রান্না করতেন। কষ্ট হয়েছে, কিন্তু তবু জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ তিনি। নিজের পেশাটাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন তিনি। এর পেছনে অবশ্য শ্রদ্ধেয় শিক্ষক টি এ চৌধুরীর অবদান অনস্বীকার্য। তিনিই ডা. লায়লাকে গাইনোকলজিতে উৎসাহী করে তুলেছিলেন। আরেকজন মানুষের অবদান ডা. লায়লাকে এই পেশায় ধরে রেখেছে, সে মানুষটি হলো তাঁর ছেলে। মায়ের পেশার প্রতি ছেলের যে শ্রদ্ধা ও সম্মান, তা তাঁকে এই পেশায় থিতু হতে সহায়তা করেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে এই পেশায় টিকে থাকতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কাজে আসে, তার নাম আত্মবিশ্বাস। অনেকেই পারবেন কি না, এই ভয়ে মাঝপথে ঝরে পড়েন। আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো পরীক্ষায় পাস করা সম্ভব।

default-image

যেকোনো পেশায় ভালো করতে নিজের ইচ্ছা থাকাটা অপরিহার্য। অনেকেই মা–বাবা চান বলে এই পেশায় আসেন, তারপর চলে যান। এটা জাতীয় মেধার অপচয়। নিজের যেখানে ইচ্ছা সেখানেই সবার থিতু হওয়া উচিত। আর ডাক্তারদের উচিত মেডিকেল এথিকসে মনোযোগী হওয়া। টাকার পেছনে ছোটা ডাক্তারদের জন্য নয়। কিন্তু মেডিকেল এথিকসে ঠিক থাকলে কোনো দিন আর্থিক বিষয়েও ভাবতে হয় না।
সবশেষে ডা. লায়লা আর্জুমান্দ বানু বলেন, ছোটবেলায় পড়ালেখা শেষে যার ভেতরে যে প্রতিভা, তার উচিত সেদিকেই ক্যারিয়ার গড়া। এ ক্ষেত্রে মা–বাবা নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে সন্তানকে উৎসাহ ও গাইডলাইন দিয়ে সহায়তা করতে পারেন। আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠার শতভাগ দিলে যেকোনো পেশায় সফল হওয়া সম্ভব।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন