নিরাময় হতে পারে সঠিক চিকিৎসায়

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সোমবার আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ বছর দিবসটি ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বে পাঁচ কোটি মানুষের মৃগীরোগ আছে, যার শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশে। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আমাদের দেশে এক লাখ জনগণের মধ্যে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন মৃগীরোগে আক্রান্ত। এ দেশে এই রোগ নিয়ে আছে অনেক কুসংস্কার। অনেকেই জানেন না বা বুঝতে চান না যে এটি একটি বৈজ্ঞানিক স্নায়বিক বিষয়, যা সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক মাত্রায় সঠিক ওষুধ সেবন। এ নিয়ে আলোচনা করা হয় প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠান ‘এসকেএফ নিবেদিত মৃগীরোগ সচেতনতা সপ্তাহ’-এর চতুর্থ পর্বে।

বিজ্ঞাপন

অতিথি হিসেবে ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. লুবাইনা হক। অনুষ্ঠানটি ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো ও এসএকএফের ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

শুরুতেই ডা. মো তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ দিবসের উদ্দেশ্য নিয়ে বলেন, এ রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে এবং মৃগী রোগীদের সঙ্গে একাত্ম প্রকাশের জন্য মূলত দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের উদ্যোগে দিনব্যাপী সেমিনার ও ওয়ার্কশপের আয়োজন করা।

এরপর মৃগীরোগের চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে সবার প্রথমে গুরুত্ব পায় শনাক্তকরণ। এ রোগ শনাক্ত হওয়ার পর এটির ধরন আলাদা করা হয়। ধরনটা নির্ভর করে উপসর্গের ওপর। যেমন: কারও দেখা যায় একপাশে খিঁচুনি হয়, কারও সম্পূর্ণ শরীরে খিঁচুনি হয়, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কখনো মনোযোগের অভাব দেখা দেয়, কারও হাত-পা শক্ত হয়ে যায়, কেউ অজ্ঞান হয়ে যায় আবার কেউ হয় না। এসব দেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগের ধরন নির্ণয় করে চিকিৎসা শুরু হয়।

default-image

মো. তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ছোটদের চিকিৎসা বড়দের চিকিৎসার মতো নয়। আবার নারীদের ক্ষেত্রে নববিবাহিত, অন্তঃসত্ত্বা আর যেসব মা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান, তাঁদের চিকিৎসা একদম আলাদা। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা শুরু করার আগে রোগী আর রোগীর পরিবারের সদস্যদের কাউন্সেলিংটা খুব জরুরি। তাদের রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়। চিকিৎসার জন্য ওষুধ চালিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া কোনোভাবেই ওষুধ সেবন বন্ধ না করার বিষয়ে ভালোভাবে পরামর্শ দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ওষুধ খাওয়ার পর দীর্ঘদিন মৃগীরোগের লক্ষণ দেখা না দেওয়ার সময়টিকে বলা হয় ‘ক্লিনিক্যালি সিমটম ফ্রি পিরিয়ড’। এই সময় অনেকে ভাবেন ওষুধ বন্ধ করবেন কি না। ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী মতে, ক্লিনিক্যালি সিমটম ফ্রি পিরিয়ডের স্থায়িত্ব অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর হলে তবে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে একজন রোগী ওষুধ খাওয়া থামাতে পারবেন। তিনি জানান, প্রক্রিয়াটি একটি পরিকল্পনা করে করতে হয়। যেমন ডোজ হিসেবে কেউ যদি তিনটা ওষুধ খান, তবে প্রথমে সেটা কমিয়ে দুটিতে আনা হয়। ধীরে ধীরে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়। উদ্দেশ্য একটাই, ওষুধ ছাড়া কী করে লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দেখা গিয়েছে, শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ বা তার বেশি ক্ষেত্রে খুব ভালোভাবেই ওষুধ বন্ধ করাতে সফলতা পাওয়া যায়।

default-image

নারীদের মৃগীরোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে একটা স্টেজ করা হয়। যেমন: অবিবাহিত নারীদের চিকিৎসা এক রকম, নববিবাহিত নারীদের আবার আরেক রকম। যেসব নারীর একবার বাচ্চা হয়েছে এবং আবার আর কোনো বাচ্চা নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে না, তাঁদের চিকিৎসা দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু যাঁরা নববিবাহিত, বাচ্চা নেবেন, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানতে হবে, যে ওষুধ সেবন করা হচ্ছে, এতে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হবে কি না বা এমন কোনো ওষুধে যাওয়া যায় কি না, যাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম হবে। সবকিছু ঠিকভাবে করলে ঝুঁকিমুক্ত চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া যায়।

খুব কম ক্ষেত্রে জিনগত মৃগীরোগ দেখা যায়। মা–বাবার মৃগীরোগ থাকলে বাচ্চার এটি হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। তবে বাচ্চা মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় মায়ের কোনো অসুখ বা সংক্রমণ কিংবা কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে বাচ্চার মস্তিষ্কে খারাপ প্রভাব পড়লে পরে তার মৃগীরোগ হতে পারে।

default-image

অনেক সময় দেখা যায়, স্ট্রোক বা ব্রেন টিউমারের জন্য রোগীর খিঁচুনি হয়। ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, এসব রোগীকে ভালোভাবে ডায়াগনোসিস করে স্ট্রোকের ওষুধের সঙ্গে খিঁচুনি বন্ধের ওষুধও চালিয়ে যেতে হবে। আর টিউমারের ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব সার্জারি করতে হবে।

অনুষ্ঠানে ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী দর্শকদের মৃগীরোগ–সম্পর্কিত অনেক প্রশ্নের জবাব দেন।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন