বিজ্ঞাপন

এনজিও বলতে মূলত বিদেশি সাহায্যপুষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেই বোঝায়। এরা ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য কাজ করে না। তবে বিদেশি সহায়তা ছাড়াই এ দেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনেক উদাহরণ আছে, যারা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কাজ করেছে। উদাহরণ হিসেবে কুমুদিনী ট্রাস্টের কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৪৭ সাল আর পি সাহা এই ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বিনা খরচে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে। পরিবার পরিকল্পনা আন্দোলনও শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে, ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রাও স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততার ইতিহাস পুরোনো।

তবে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেন ব্যক্তি নিজে। এরপর ব্যয় করে সরকার। মোট ব্যয়ের খুব সামান্যই আসে এনজিওগুলোর কাছ থেকে। অনেকে এই অভিযোগ করেন যে স্বাস্থ্য খাতে এনজিওগুলোর আর্থিক অবদান যতটুকু, তার চেয়ে তাদের প্রভাব বেশি। বর্তমানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাত পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় এনজিওগুলোর যুক্ত করেছে। স্বাস্থ্য খাতের বার্ষিক নিরীক্ষাতেও এনজিওগুলোর সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছে এনজিওগুলো। ওই সব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে স্বাস্থ্য।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান খায়রুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো দেশের স্বাস্থ্য খাতে সব সময় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। শুরুর দিকে তাদের ভূমিকা ছিল সেবাধর্মী। এখন তাদের ভূমিকা অনেকটাই ওয়াচডগের।’

এনজিওগুলোর কৌশল

স্বাস্থ্যের কিছু ক্ষেত্রে এনজিওগুলো জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে। বাংলাদেশ পপুলেশন অ্যান্ড হেলথ কনসোর্টিয়াম (বিপিএইচসি), আরবান ফ্যামিলি হেলথ পার্টনারশিপ (পরে সূর্যের হাসি নেটওয়ার্ক), আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট—তিনটি নেটওয়ার্ক দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করছে। তবে এদের কাজ সিটি করপোরেশন ও কিছু শহর এলাকায়। এগুলো স্থানীয় সরকারের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার মডেল।

আবার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করছে এনজিওগুলো। যেমন এইচআইভি/এইডস বিষয়ে এনজিওগুলোর জোট কাজ করছে। একইভাবে এনজিওগুলোর জোট কাজ করছে যক্ষ্মা নির্মূলে। কিছু ক্ষেত্রে এনজিওগুলো দাতাদের কাছ থেকে প্রধান গ্রহীতা হিসেবে অর্থ নিচ্ছে। আবার দেখা যায়, কোনো একটি রোগ নিয়ে একটি এনজিও কাজ করে। সরকারের পুষ্টি কর্মসূচি সফল করার জন্যও এনজিওগুলোর তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।

প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক কাজ

লবণ ও গুড় দিয়ে খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করার কৌশল দেশের মানুষকে শিখিয়েছিলেন এনজিও কর্মীরা, মূলত ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা। কর্মীরা বলেছিলেন হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করার কথা। স্থানীয় সরকারের পাশে থেকে এনজিওগুলো স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও টিউবওয়েল বিতরণ করেছে গ্রামে গ্রামে। এসব উদ্যোগ রোগনিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে।

পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের বড় অংশ এনজিও মাঠকর্মী। প্রশিক্ষিত দাই তৈরির পেছনেও এনজিওগুলো ভূমিকা রেখেছে।

অনেক এনজিও জরুরি প্রসূতিসেবা দিয়ে চলেছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি এনজিওর বড় হাসপাতালও আছে।

বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের ব্যাপক স্বাস্থ্যহানি ঘটে। যেকোনো দুর্যোগে পানীয় জল, পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি, জরুরি ওষুধ, পুষ্টিসামগ্রী নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এটা অনেকটা চর্চায় পরিণত হয়েছে।

সারা বিশ্বে শরণার্থীদের পাশে থাকে এনজিওগুলো। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। ২০১৭ সাল মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এ দেশে আশ্রয় নেওয়ার পর দেশি ও বিদেশি অনেক এনজিও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায়। এখনো বেশ কিছু এনজিও কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে চলেছে।

করোনা মহামারির সময় মানুষের পাশে আছে এনজিওগুলো। ব্র্যাক সরাসরি করোনার নমুনা পরীক্ষায় সহায়তা করেছে, মানুষের মধ্যে মাস্ক বিতরণ করেছে। হাঙ্গার প্রজেক্ট উদ্ভাবিত ‘করোনা সহনশীল গ্রাম’ প্রায় দেড় হাজার গ্রামে বাস্তবায়িত হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা এসব গ্রামে মানুষকে সচেতন করেছেন, আচরণ পরিবর্তনে সহায়তা করেছেন, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও পৃথক করেছেন এবং চিকিৎসাসেবার জন্য হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করেছেন।

নীতি ও দক্ষতা সহায়তা

স্বাস্থ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে একাধিক এনজিও। তারা নিজেরা বা আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সহায়তায় বা জাতিসংঘের সংস্থার (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ বা ইউএনএফপিএ) সঙ্গে যুক্ত থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়কে কারিগরি ও নীতিসহায়তা দেয়। এনজিওগুলো শুধু প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ঠিক করে না, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করে, প্রশিক্ষণ দেয়। তারা স্বাস্থ্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে সহায়তা করে।

অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশুমৃত্যু হ্রাস নারীর কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অর্জন বাড়তি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। শিশুমৃত্যু কমিয়েছে খাওয়ার স্যালাইন ও সম্প্রসারিক টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। জনসংখ্যার অর্জনের পেছনে আছে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি। দুটি ক্ষেত্রে এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রেখেছে।’

(প্রতিবেদনে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও প্রথমার যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিতব্য স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত বইয়ের সংশ্লিষ্ট অধ্যায় থেকে কিছু তথ্য নেওয়া হয়েছে)

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন