ছবি: ম্যাগনাস মিউলার, পেকজেলস ডট কম
ছবি: ম্যাগনাস মিউলার, পেকজেলস ডট কম

সম্পর্ক, একাকিত্ববোধ, বিচ্ছিন্নতাবোধ শব্দগুলোর সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিল্প ও দর্শনের একটি বিশাল জায়গা দখল করে আছে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বিচার-বিশ্লেষণ এবং সেই সম্পর্কের ভেতর সদা প্রবহমান একাকিত্ববোধ ও বিচ্ছিন্নতাবোধের করুণ সুর।

আদিমকালে মানুষ বনবাদাড়ে একাকী ঘুরে বেড়াত, একাকী খাবারের সন্ধান করত এবং টিকে থাকার জন্য একাকী যুদ্ধ করত। এরপর একটা সময় মানুষ টিকে থাকার প্রয়োজনে একাকী জীবনযাত্রার সিস্টেমকে ত্যাগ করে অনেক মানুষের সঙ্গে থাকা শুরু করল এবং সমাজ তৈরি করল। সেই প্রাচীন সমাজ ধীরে ধীরে বিভিন্ন পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে বর্তমান আধুনিক সমাজে রূপ নিল। সেই আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক সমাজে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল সোশ্যাল মিডিয়া।

বিজ্ঞাপন

সোশ্যাল মিডিয়া যুগের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মাঝেমধ্যে আমি চিন্তা করি, ভার্চ্যুয়ালি একে অপরের কাছে আসার মাধ্যমে মানুষের জীবনে একাকিত্বের রাজত্ব কি আসলেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, নাকি মানুষ পরস্পর থেকে আরও বেশি দূরে সরে যাচ্ছে? যেখানে এক ফ্ল্যাটের মানুষ সামনের ফ্ল্যাটের মানুষকেই চেনে না, এক পাড়ার মানুষ পাশের পাড়ার মানুষকেই চেনে না, সেখানে হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল জগতে ব্যক্তিগত ভাবের আদান-প্রদান এবং ভার্চ্যুয়াল সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন মানব জীবনের সেই প্রাচীন একাকিত্বের আধুনিক রূপ নয় তো?

default-image

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে সোশ্যাল মিডিয়া সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে প্রথমবারের মতো একে অপরের অনেক বেশি কাছে নিয়ে এসেছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসের একটি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেহেতু ৩ কোটি ৭৯ লাখ ১২ হাজার জন ছাড়িয়ে গেছে, সেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পারস্পরিক কাছে আসার গল্পটাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণ করার সময় চলে এসেছে বলে আমি মনে করি। অন্যথায় সামনে অপেক্ষা করছে ভয়ানক ঝড়। যে ঝড়ে ভেঙে যেতে পারে আমাদের মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের দুর্গ।

তাই আজকে আমি একজন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী এবং একই সঙ্গে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী হিসেবে অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহার মানুষের মন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কোন ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

default-image

পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষণের কারণে অধিকাংশ মানুষের মন চারপাশের পরিবেশকে সব সময় জাজ/বিচার করে চলে। ফলে কোনো বিষয়কে নিরপেক্ষভাবে দেখার ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সব সময় বিচার বা জাজমেন্টের ভিত্তিতে চলার কারণে আমাদের চিন্তার জগৎ এবং চিন্তার ধরন ক্রমান্বয়ে পক্ষপাতদুষ্ট হতে থাকে। কারণ, বিচার করা মানেই আপনার মনকে কোনো একটি পক্ষ নিতেই হবে। মজার বিষয় হলো, মানুষের সেই জাজ মেন্টাল/বিচারপ্রবণ মানসিক অভ্যাসের গোড়ায় নিয়মিত পানি ঢেলে প্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা আমাদের মনকে অবচেতনভাবে দিনের পর দিন আরও বেশি জাজ মেন্টাল বানিয়ে ফেলছে।

default-image

সামিজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের মনকে অবচেতনভাবে দিনের পর দিন আরও বেশি জাজ মেন্টাল বানিয়ে ফেলছেএকটু খেয়াল করলে দেখবেন, ফেসবুকে আপনি সবার পোস্টে লাইক, কমেন্ট দেন না কিংবা সব পোস্ট শেয়ার করেন না। আপনি শুধু সেসব পোস্টে লাইক ও কমেন্ট করেন বা শেয়ার দেন, যা আপনার ব্যক্তিগত ভালো লাগা, মতামত এবং জীবন দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে শুধু অন্যকে খুশি করার জন্যও অনেক সময় আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে লাইক ও কমেন্ট দিয়ে থাকি। অন্যদিকে যেসব পোস্ট আপনি পছন্দ করেন না, সেসব পোস্ট আপনি এড়িয়ে যান অথবা সেসব পোস্টে ভিন্নমত পোষণ করেন।

বিজ্ঞাপন
জাজ মেন্টাল ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে ভঙ্গুর করে তোলে, খুব সহজে একের প্রতি অপরের নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, কোনো কিছুকে সহজে মেনে নেওয়ার দক্ষতাকে কমিয়ে দেয় এবং চারপাশের যেকোনো কিছুর প্রতি মানুষকে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলে।

পুরো প্রক্রিয়াটা বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, আমরা যতক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করি, ততক্ষণ আমরা মূলত বিচারকের আসনে বসে বিচার করি কার পোস্টে সব সময় সম্মতি দেব, কোন ধরনের পোস্টে সম্মতি প্রদান করব, কার পোস্টে কখনোই সম্মতি দেব না, কোন পোস্টে দ্বিমত পোষণ করব এবং কোন পোস্ট এড়িয়ে যাব। এ প্রক্রিয়াটি আমাদের বাস্তব জীবনেও চারপাশের মানুষকে সব সময় জাজমেন্ট/বিচার করার মনমানসিকতাকে উসকে দেয়।

জাজ মেন্টাল ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে ভঙ্গুর করে তোলে, খুব সহজে একের প্রতি অপরের নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, কোনো কিছুকে সহজে মেনে নেওয়ার দক্ষতাকে কমিয়ে দেয় এবং চারপাশের যেকোনো কিছুর প্রতি মানুষকে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলে। এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুব সহজে মানুষকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে বিধায় বিভিন্ন গুজব দ্রুত ছড়ায়।

এ ছাড়া এ মাধ্যমগুলোতে হরেক রকম মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে হরেক রকম মতামত দিয়ে থাকে। যে কারণে স্ক্রিন স্ক্রল করার ক্ষেত্রে আপনার মন ও মস্তিষ্ক কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে না বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন স্ট্যাটাসের ভিন্ন ভিন্ন বিষয়বস্তুর ওপর ভিন্ন ভিন্ন আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া, যেমন ভালো লাগা, খারাপ লাগা, বিরক্তিবোধ, রাগ ইত্যাদি অনুভূতি তৈরি করে। এতে মন ও মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ স্থিরতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ কারণে যারা দীর্ঘদিন এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের মনোযোগের ক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়, ঘুমের কোয়ালিটি ধীরে ধীরে হ্রাস পায় এবং মন–মেজাজ ধীরে ধীরে খিটখিটে হয়ে যায়।

default-image

আমরা নিশ্চয়ই জানি যে প্রত্যেকটি মানুষ চিন্তা, চেতনায়, আচার-আচরণে ও ব্যক্তিত্বে আলাদা ও অদ্বিতীয়। এখানে একের সঙ্গে অন্যের তুলনা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। যারা নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজস্ব ভাবমূর্তি অথবা আইডেনটিটি নির্মাণ করতে চায়, তাদের মনের সুখ-দুঃখ মূলত নির্ভর করে অন্যের হাতে। এ ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার অন্য মাধ্যমগুলো খুব সুনিপুণভাবে ব্যবহারকারীর ভেতর নিজেদের সব সময় অন্যের সঙ্গে তুলনা করার মানসিক প্রবণতাকে উসকে দেয়।

অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষের বিভিন্ন রকম মানসিক জটিলতা, যেমন বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, ভয়, আতঙ্ক, অহংবোধ/ইগো ইত্যাদিকে আরও বেশি ডালপালা গজাতে সাহায্য করে।

ফলে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর ভেতর নিজেদের জীবন সন্তুষ্টিবোধের মাত্রা কমে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। অথচ সন্তুষ্টিবোধ ছাড়া সুখী হওয়া অসম্ভব। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন ফেসবুক ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে ফেসবুক এনভি নামক একধরনের সমস্যা পাওয়া গেছে, যা জীবন সন্তুষ্টিবোধের মাত্রাকে কমিয়ে দেয়। অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষের বিভিন্ন রকম মানসিক জটিলতা, যেমন বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, ভয়, আতঙ্ক, অহংবোধ/ইগো ইত্যাদিকে আরও বেশি ডালপালা গজাতে সাহায্য করে।

আমাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবিরোধী হিসেবে তকমা দেবেন না অনুগ্রহ করে। এ মাধ্যম ব্যবহার করবেন নাকি করবেন না, সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যেখানে ভার্চ্যুয়াল আইডেনটিটি ধীরে ধীরে অনেক মানুষের কাছে রিয়েল আইডেনটিটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেখানে এ মাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট না থাকা মানে একধরনের ভার্চ্যুয়াল সমাজ বিচ্যুতি। আর আমি চাই না, আমার কেউ সমাজ বিচ্যুত হয়ে আমাকে দায়ী করুক। আমি শুধু চাই ভার্চ্যুয়াল কিংবা অলীক একটি সমাজ মেনে চলতে গিয়ে কেউ যেন বাস্তব সমাজ জীবন থেকে দূরে সরে না যায়, পাশের মানুষের সঙ্গে মন ভরে আড্ডা মারতে ভুলে না যায়, পাশের মানুষের সুখ-দুঃখের খবর নিতে ভুলে না যায় এবং বাস্তব দুনিয়ার স্বাদ নিতে ভুলে না যায়। কারণ, দিন শেষে সবাইকে বাস্তব দুনিয়ার খেলায় ফিরতে হয়।

লেখক: মনোবিজ্ঞানী ও একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত

বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন