বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: বিশ্ব জন্মনিয়ন্ত্রণ দিবসের দরকার কী?

উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের সভাপতি, অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগম
‘দিনটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশ্বের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৬৫ জন মানুষ বাস করেন। বাইরে বের হলে শ্বাস নেওয়া যায় না। কবরের মতো অবস্থা! কবরেও এর চেয়ে জায়গা বেশি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর অরণ্য ধ্বংস—এই দুইয়ের কারণে আমাদের জীবনমান ভয়ংকর রকম খারাপ হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। বাল্যবিবাহে বাংলাদেশ প্রথম ১০টি দেশের একটি। বাংলাদেশে যত বিয়ে হয় তার শতকরা ৫১ ভাগ চাইল্ড ম্যারেজ। যে নারীর ২৫ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার কথা, তার যদি ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়, তাহলে তো জনসংখ্যা বাড়বেই। ২৫ বছর বয়সের বদলে সে যদি ১৫ বছর বয়সে গর্ভবতী হয়, তাহলে জনসংখ্যা অনেক দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। এটা কমাতে ডাক্তার, সরকার, মন্ত্রণালয় আর সাধারণ মানুষ, সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। জনসংখ্যা বাড়লে পরিবেশদূষণ হয়, রোগ বাড়ে, আরও নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়।’

প্রশ্ন: জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি কতটা কার্যকর?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা বেগম
সাধারণত সবাই জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেতে পারেন। এটা সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। তবুও সেটা শুরু করার আগে একবার ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের ক্ষেত্রে আমরা কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করি। তিনি সিগারেট খান কি না, সেটা যাচাই করি। তারপর জানাই যে তিনি খেতে পারবেন কি পারবেন না। ৪৫ বছরের ওপরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, মাইগ্রেন, ক্যানসার, মেজর সার্জারি, হার্টের অসুখ, স্ট্রোকের ইতিহাস, জন্ডিস, টিউমার, ব্রেস্ট ক্যানসার এগুলো আছে কি না দেখতে হয়। সাধারণত আমরা খেতে নিষেধ করি। খুব কম ক্ষেত্রে অ্যালাউ করি। ১৮ বছরের নিচের কম বয়সীদেরও মানা করি। ব্রেস্ট ফিডিং যাঁরা দেন, তাঁদেরও নিষেধ করি। তবে ছয় মাস পর খেতে পারবেন। তবে এই বড়িগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভালো, সাইড ইফেক্ট খুবই কম। লিপিড প্রোফাইল, জন্ডিসের টেস্ট এগুলো করি। যতটা সম্ভব সক্ষম কাপলদের হিস্ট্রি টুকে রাখি। অনেকে মনে করে, বড়ি খেলে বুঝি ভবিষ্যতে বাচ্চা হবে না। এটা একদম ভুল কথা।

প্রশ্ন: কিশোরী মেয়েদের আমরা বড়ি খেতে নিষেধ করি। সেক্ষেত্রে তারা কীভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করবে? কেননা, পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি মেয়ের কৈশোরে বিয়ে হয়ে যায়।
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী
সবচেয়ে ভালো হলো ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে না দেওয়া। ২০ বছরের আগে বাচ্চা না নেওয়া। যেহেতু সেটা আমরা কমাতেই পারছি না বা কমানোর হার কম, সেক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণমূলক কিছু ব্যবস্থা নিতেই হবে। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে কনডম ব্যবহার করতে হবে। এটা সব দিক দিয়ে সবচেয়ে ভালো। সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজও ছড়ায় না। কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তা ছাড়া এখন কমবয়সীদের জন্যও বড়ি বেরিয়েছে। এগুলোর কোনো নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। একবার বাচ্চা হয়ে গেলে যে কোনো ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া যেতে পারে। ইমপ্লান্টও ভালো। হাতের চামড়ার নিচে এটা স্থাপন করা হয়। তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য কার্যকর। কপার টিও ভালো। অনেকে মনে করেন, কপার টি স্থাপন করলে ইনফেকশন হবে। ভুল কথা। ঠিকমতো স্থাপন করলে ইনফেকশনের কোনো আশঙ্কা নেই। আর যেকোনো সময় খুলেও ফেলা যাবে। যখনই চাইবে, তখন খুলে ফেলে বাচ্চা নিয়ে নেবে। তবে বাচ্চা যদি দুধ খায়, সেই সময় স্বামীর কনডম ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। তবে একটা কথা বলে রাখি, ইমার্জেন্সি পিল যেটা, সেটা নিয়মিত না খাওয়াই ভালো। আর স্বল্পমেয়াদি পিলের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যবস্থাকেই আমরা অনুপ্রাণিত করি।

প্রশ্ন: কারা কোন জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. লায়লা আঞ্জুমান বানু

এটাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, কোনো রেসট্রিকশন নেই যাঁদের, তাঁরা দিব্যি পিল খেতে পারেন। এমনকি তাঁরা সব ধরনের ব্যবস্থার যে কোনো একটি নিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, যাঁদের সামান্য ঝুঁকি আছে, পিল নিলে অল্প ক্ষতি হতে পারে। তবে উপকারই বেশি। তৃতীয়ত, যাঁদের অল্প ক্ষতি হবে, তবে উপকার বেশি। চতুর্থত, যাঁদের বড়ি খাওয়া চলবে না। কারা খেতে পারবেন না, সেই আলাপ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। আমি বরং একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। আমার কাছে এক দম্পতি এসেছিলেন। তাঁদের আমি পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে বড়ি লিখে দিই। তিন মাস পর তাঁরা আবার আমার কাছে আসেন। স্ত্রী গর্ভবতী, খুবই রাগ আমার ওপর, দুজনেরই। আমি তো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। কেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ল? স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কখন কখন বড়ি খান? কীভাবে খান? স্ত্রী উত্তর দিলেন, ‘আমি কেন খাব, আমার স্বামী খায়।’ শুনে আমার মনে হলো, আমারই দোষ। আমি সবই বলেছি, তবে কে খাবেন, এটা বলিনি।

প্রশ্ন: কারা বড়ি ব্যবহার করবেন না?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. লতিফা শামসুদ্দিন

যত ধরনের প্রোটেকশন ব্যবস্থা আছে, এর ভেতর বড়ি সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থাগুলোর মধে৵ একটি। তবে কারা ব্যবহার করতে পারবেন না, সেই আলাপ ইতিমধ্যে করা হয়েছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বলতে হলে বলব, ওরাল পিলে এখন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম। কিছু পিলে ইস্ট্রোজেন বেশি থাকে, তাই বমি বমি ভাব হয়। অনেকের আবার বমি অনেক বেশি হয়। একটু মোটা হওয়ার প্রবণতা হতে পারে। কারও কারও পায়ে পানি আসতে পারে। তবে এগুলো সামান্য সমস্যা। এ রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে আসবেন। আমরা দেখব। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলেও জন্মনিয়ন্ত্রণ করা বেশি জরুরি। আমি কেবল বলব, জন্মবিস্ফোরণ হচ্ছে। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে একেবারে প্রাইমারি থেকেই টেক্সট বুকে অধ্যায় থাকতে হবে। কেন নেই? কেন হচ্ছে না? নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে স্কুল থেকেই কথা বলতে হবে। কথা বলার প্রাকটিস করতে হবে।

প্রশ্ন: মূলত কাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হয়?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. কোহিনূর বেগম

আসলে অনেকেই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ না করেই পিল খান। এখন তো অনেকের মধ্যে একটু দেরিতে বাচ্চা নেওয়ার একটা প্রবণতা আছে। তাদের অনেকেরই ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের জটিলতা থাকে। তাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি দেখা দিতে পারে। কিডনির সমস্যা, চোখের সমস্যা, নিউরোর সমস্যা থাকলে সাধারণ পিল খেতেই পারবেন না। তখন তাকে বিশেষ পিল খেতে হবে। যাঁদের কার্ডিয়াক ডিজিস আছে, তাঁদের ইস্ট্রোজেনের পিল দিতে পারব না। প্রোজেস্টেরনের পিল দেব। থাইরয়েড আর কিডনির ক্ষেত্রেও বিশেষ পিল আছে।

প্রশ্ন: মায়ের দুধ খাওয়াচ্ছেন, এমন মায়ের জন্য আমরা কোন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারি?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম

প্রথমত, সন্তান জন্মের পর প্রথম ৪০ দিন শারীরিক সম্পর্কে না যাওয়াই ভালো। তখন পিল খাওয়া যাবে না। তাতে দুধ কমে যেতে পারে। পরের ছয় মাস সবচেয়ে ভালো কনডম ব্যবহার করা। তবে স্বামী যদি সেটা ব্যবহার করতে না চান, সেক্ষেত্রে ইনজেকশন ব্যবহার করা যেতে পারে। তিন মাস পর পর নিজে নিজেই সেই ইনজেকশন নেওয়া যেতে পারে। কপার টিও ব্যবহার করা যেতে পারে। আর ইমপ্ল্যান্ট তো আছেই।

প্রশ্ন: ৪০ বছরের বেশি বয়সে জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কোন পদ্ধতি ভালো?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা

এ সময় অনিয়মিত মাসিক হয়। রিপ্রোডাকটিভ স্টেজ থেকে মেনোপজ স্টেজের মাঝামাঝি অবস্থা। একে পেরি মেনোপজাল স্টেজ বলে। এটা সবার জন্য সমান নয়। সাধারণত ৫১ বছরের কাছাকাছি বয়সে মেনোপজ হয়। এর ৮ থেকে ১০ বছর আগে থেকে পেরি মেনোপজাল স্টেজ শুরু হয়। অনেকে এই সময়টাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন না। মনে করেন, তিনি গর্ভধারণ করবেন না। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বেশি হয়। এই সময় জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কপার টি ব্যবহার করা যেতে পারে। ইমপ্ল্যান্ট করা যেতে পারে। এটা বোন ডেনসিটিতে ইফেক্ট করে না। প্রায় কোনো সাইড ইফেক্ট নেই। এতে সাময়িকভাবে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর সব অবস্থা ঠিক থাকলে ওরাল পিলও নেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন: যদি কেউ বড়ি খেতে ভুলে যান, সেক্ষেত্রে কী করণীয়? যদি কারও মাঝেমধ্যে ব্লিডিং হয়, তিনি কী করবেন?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান

অনেকেই পিল নিয়মিত খান না। স্বামী শহরের বাইরে গেলে খান না। আসলে নিয়মিত ২১টা ট্যাবলেট খেতে হবে। মাসিকের প্রথম দিন থেকে প্রতিদিন একই সময়ে খেতে হবে। মিস দেওয়া যাবে না। অনিয়মিতভাবে খাওয়া নিরাপদ নয়। আবার হুট করে ইমার্জেন্সি পিলও কিন্তু নেওয়া যায় না। কেউ যদি বড়ি খেতে ভুলে যান, তাহলে অসুবিধা। কেননা, এটা এত স্বল্পমাত্রায় থাকে যে, একটা ভুলে গেলে হয়তো অসুবিধা হবে না। তবে পরপর দুটো খেলে ভুলে গেলে অসুবিধা হতে পারে। কার্যকর না–ও হতে পারে। কেননা, সাইকেলটা নিয়মিত হওয়া জরুরি। একটা মিস গেলে যখনই মনে পড়বে, তখনই খেতে হবে। দুটি খেতে মিস হয়ে গেলে পরের এক সপ্তাহ স্বামীকে কনডম ব্যবহার করতে হবে। যদি ফোঁটা ফোঁটা ব্লিডিং হয়, তাহলে সাত দিন ডবল ডোজ নিতে হবে। যে পাতা চলছে, সেই পাতারই আরেকটা খেতে হবে। পরের মাসেও যদি এ রকম ব্লিডিং হয়, তাহলে বুঝতে হবে ওই পিলটা শরীরের সঙ্গে মানাচ্ছে না। তখন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ডোজ বাড়াতে হবে।

প্রশ্ন: জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই, তখনো আমরা কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করি। সেগুলোর উপকারিতা কী?
উত্তর দিয়েছেন: ওজিএসবিয়ের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. সালেহা বেগম চৌধুরী

জন্মনিয়ন্ত্রণ পিলগুলো কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়, আরও কিছু উপকার পাওয়া যায়। কিছু অসুখ যাছে, যেগুলোর অন্যান্য চিকিৎসা খুবই খরচসাপেক্ষ। সেক্ষেত্রে এই পিলগুলো কম খরচে ভালো চিকিৎসা দেয়। যেমন পিরিয়ডে বেশি রক্ত বের হলে, মাসে দুইবার পিরিয়ড হলে বা সাইকেল যদি অনেক দেরিতে হয়, এসব ক্ষেত্রে আমরা এই পিল ব্যবহার করতে পারি। আবার অনেকের মাসিকের আগে পেটেব্যথা হয়। খুব অস্বস্তি হয়। এগুলোও ওরাল পিলে সেরে যায়। এমনকি জরায়ুতে টিউমার বা অন্য সমস্যা হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়। এ ছাড়া আরও অনেক রোগের চিকিৎসায়, বিশেষ করে নানান হরমোনের চিকিৎসায় ওরাল পিল ব্যবহার করা হয়। এতে সাইড ইফেক্টও খুবই কম। এখন থার্ড জেনারেশন, ফোর্থ জেনারেশন পিল আসছে। এগুলোর ডোজও খুবই কম।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন