প্রয়োজন সুশৃঙ্খল যাপন ও খাদ্যাভ্যাস

ডায়বেটিস কী?

default-image

শুরুতে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ডা. এম এ হালিম খান। তিনি বলেন, ডায়বেটিস মূলত একটি হরমোনজনিত রোগ। আমাদের পেটের উপরিভাবে অগ্ন্যাশয় নামক গ্রন্থির বিটাকোষ থেকে ইনসুলিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। ইনসুলিনের কাজ হলো মানুষের শরীরের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা বা কমিয়ে রাখা। যদি বিটাকোষ থেকে ইনসুলিন কম তৈরি হয় বা অকার্যকর থাকে, তখন রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। এ অবস্থাকেই আমরা ডায়বেটিস মেলাইটাস বলি।

বিজ্ঞাপন

যে জন্য ডায়বেটিস হয়

default-image

এ সময়ে অনেক তরুণেও ডায়বেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর কারণ মূল্যায়ন করতে গিয়ে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, ডায়বেটিসকে বলা হয় মাল্টিফ্যাক্টোরিয়াল ডিজিজ। অনেক ফ্যাক্টর একসঙ্গে যোগ হলে তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ডায়বেটিস দেখা দিতে পারে। অনেকের হয়তো মা–বাবার ডায়বেটিস আছে বা তাঁর বাবা বা মায়ের পরিবারের কারও ডায়াবেটিস আছে। তাহলে তাঁর ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু এমন নয় যে তাঁর হবেই। তিনি যদি শুরু থেকেই সচেতন থেকে সুশৃঙ্খলভাবে জীবন যাপন করেন, তাহলে তাঁর ডায়বেটিস নাও হতে পারে। হলেও হয়তো বার্ধক্যের একদম শেষ দিকে হতে পারে।

ডা. এম এ হালিম খান বলেন, জাতিগত কারণেও আমাদের ডায়বেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি। পৃথিবীতে যত ডায়বেটিসের রোগী বাস করে, তার ৫ ভাগের ১ ভাগ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ডায়বেটিস রোগী আছে চীনে, তারপরই ভারতে। বাংলাদেশ এই তালিকার দশম স্থানে অবস্থান করছে। এ ছাড়া আমাদের জীবনযাপন পদ্ধতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। অন্যতম কারণ হলো মোটা হয়ে যাওয়া, শুয়ে-বসে থাকা। এই যে আমরা মোট হয়ে যাচ্ছি, আমাদের শিশুরা মোটা হয়ে যাচ্ছে, এগুলো ভবিষ্যতে ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ডায়াবেটিসের ধরন

এ নিয়ে ডা. এম এ হালিম খান বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ডায়বেটিসের একটি ধরন হলো প্রি–ডায়বেটিস। এখনো হয়নি, কিন্তু বর্ডারলাইনে আছেন, এমন ব্যক্তি এখনই সচেতন না হলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পরিপূর্ণ ডায়বেটিস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরেকটি ধরনের নাম গর্ভকালীন ডায়বেটিস। গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো ডায়বেটিস হলে ভবিষ্যতে তার টাইপ-টু ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। পাশাপাশি পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, কোলেস্টেরল ও হাইপার টেনশন থাকলে ডায়বেটিসের শঙ্কা থেকেই যায়।

অনেক সময় আমরা কিছু ওষুধ সেবন করি। দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন করলে রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়, যা ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। থাইরয়েড, গ্রোথ ও স্টেরয়েড হরমোনের আধিক্য থাকলেও ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অগ্ন্যাশয়ের কিছু রোগ, যেমন: অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস, ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস, ফাইব্রোসিস্টিক প্যানক্রিয়াটিক ডিজিজেও বিটাকোষ থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে ডায়বেটিস হতে পারে। এগুলো সবই টাইপ–টু ডায়বেটিসের জন্য একটা ফ্যাক্টর।

টাইপ–এ ডায়বেটিসকে বলা হয় অটোইমিউন ডিজিজ। এর ফলে যে বিটাকোষগুলো থেকে ইনসুলিন তৈরি হয়ে, সেই কোষগুলো নিজ থেকেই ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে আর ইনসুলিন নিঃসৃত হয় না এবং কমপ্লিট ইনসুলিন ডেফিসিয়েন্সি বা অভাব তৈরি হয় এবং এদের সারা জীবন ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। টাইপ–টু ডায়বেটিস যাঁদের আছে, তাঁদের সারা জীবন ইনসুলিন নিতে হবে, তা কিন্তু নয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশিদের ঝুঁকি

default-image

এ প্রসঙ্গে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, বিশ্বের সব দেশেই কমবেশি ডায়বেটিসের রোগী থাকলেও তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশিদের ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর পেছনে সুস্পষ্ট কিছু কারণ আছে। প্রথম কারণ, আমাদের খাবারে শর্করার আধিক্য। দেখা যায়, বাংলাদেশিরা সকাল, দুপুর ও রাত—তিন বেলায়ই অতিরিক্ত পরিমাণে ভাত বা রুটি খায়। এর ফলে একসময় আমাদের শরীরের ইনসুলিন নিঃসরণের পরিমাণ নিজ থেকেই কমতে থাকে।

default-image

অন্যদিকে, ইউরোপিয়ানরা ব্যালান্সড ডায়েটের দিকে জোর দেন বেশি। তাই ডা. এম এ হালিম খানের পরামর্শ হলো প্রতিদিনের খাবারে সবজি এবং সবুজের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রতিবেলা একটি খাবারের প্লেটকে সমান দুই ভাগে ভাগ করতে হবে। একপাশে থাকবে শাকসবজি এবং ফলমূল। বাকি ভাগকে আবার দুই ভাগ করতে হবে। তার একপাশে থাকবে শর্করাজাতীয় খাবার, আরেকপাশে থাকবে আমিষ বা মাছ-মাংস, দুধ ও ডিম।

ডায়বেটিসমুক্ত থাকা কিংবা নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে ডা. এম এ হালিম খান বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন:

প্রতিদিন হাঁটতে হবে

default-image

কোভিড-১৯–এর কারণে অসংখ্য ডায়বেটিস রোগীর বাইরে হাঁটাচলার রুটিন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের যেভাবেই হোক, প্রতিদিন হাঁটার ওপরে বিশেষভাবে জোর দিলেন ডা. এম এ হালিম খান। তাঁর পরামর্শ, উপযুক্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে বের হওয়া, প্রতিদিন বের হওয়া এবং উন্মুক্ত পরিবেশে হাঁটার চেষ্টা করা। যেন ভিড় ও জনসমাগমের ফলে করোনার সংক্রমণ না হয়। বের হওয়ার কারণ একটিই, তা হলো ভিটামিন ডি। রোদে বের না হলে শরীরে ভিটামিন ডির অভাব তৈরি হতে পারে। আর ভিটামিন ডির অভাবে যাঁদের করোনা হয়েছে, তাঁদের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে ডায়বেটিস রোগীরা আধা ঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা উন্মুক্ত স্থানে হেঁটে আসবেন। বাইরে যেতে না চাইলে ট্রেডমিল বা বাসার ছাদে হেঁটে নিতে পারেন। কিন্তু যেভাবেই হোক, হাঁটা বন্ধ করা উচিত নয়। কেননা, ডায়বেটিস রোগীর জন্য হাঁটা ওষুধ ও ইনসুলিনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিমিত খাবার বনাম কম পরিমাণে খাওয়া

default-image

অনেকেই মনে করেন, ডায়বেটিস হয়ে যাওয়া মানেই সারা জীবনের জন্য খাবারের পরিমাণ কমে যাওয়া। পরিমিত পরিমাণ এবং কম খাবারের অর্থ এক নয়। পরিমাণমতো মানে একজন মানুষের ওজন, উচ্চতা এবং অন্যান্য ফ্যাক্টর বিবেচনা করে তার শরীরে যতটুকু ক্যালরি প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই ক্যালরি গ্রহণ করা। কম খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। অনেক ডায়বেটিস রোগী না খেয়ে সুগার কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু না খেয়ে সুগার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; বরং পরিমাণমতো খেয়েই আরও ভালো থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।

বিজ্ঞাপন

আসক্তি যখন চিনিতে

default-image

ডায়বেটিস রোগীদের মধ্যে প্রায়ই মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যেতে দেখা যায়। অনেকেই সপ্তাহে একবার বা দুবার মিষ্টি খেয়েই ফেলেন। কিন্তু ডায়বেটিস রোগীর পক্ষে মিষ্টি খাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। যাদের ডায়বেটিস হয়নি, তারা একটি মিষ্টি খেলে ইনসুলিন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সুগার হজম করে ফেলে। কিন্তু যারা ডায়বেটিস আক্রান্ত, তাদের ইনসুলিনের পরিমাণ নির্দিষ্ট বিধায় অতিরিক্ত চিনি রক্তে থেকে যায়। এই চিনিটুকু কমাতেই দেখা যায় অনেক দিন পর্যন্ত তার ব্লাডে সুগার লেবেল ওঠানামা করবে। বিকল্প মিষ্টি দিয়ে তৈরি খাবার মাঝেমধ্যে খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু যাঁরা সন্তানসম্ভবা, তাঁরা বিকল্প মিষ্টিও খেতে পারবেন না।

চাই সর্বস্তরের সচেতনতা

সব শেষে ডা. এম এ হালিম খান বলেন, প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই ডায়বেটিস থেকে সুরক্ষিত থাকার সবচেয়ে উত্তম উপায়। শতকরা ৭০ ভাগ ডায়বেটিস প্রতিরোধযোগ্য। তাই শুধু চিকিৎসা করা নয়, যাঁদের এখনো ডায়বেটিস হয়নি, তাঁদের রক্ষা করাও আমাদের সবার দায়িত্ব। সব কয়টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে কেয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত সচেতনতা ছড়িয়ে দিয়ে আমরা ডায়বেটিস প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারি। আমরা যদি হেলথ এডুকেশন সিস্টেম ডেভেলপ করতে পারি, সব কটি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে ডায়বেটিস ডিপার্টমেন্ট চালু করতে পারি এবং একটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়বেটিস প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে ডায়বেটিসের প্রবণতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন