default-image

সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও ১৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস। এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও বিশ্বব্যাপী রোগী সুরক্ষা সম্পর্কে সংহতি প্রকাশ ও বাস্তবায়ন। এ উপলক্ষে বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের সহযোগিতায় আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘রোগীর নিরাপদ ওষুধ সেবন নিশ্চিতকরণ’।

default-image

অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন, বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্ম মহাপরিচালক ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন ফারুক এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের আওতাধীন ন্যাশনাল ফার্মাকোভিজিল্যান্স সেন্টারের উপপরিচালক ও সভাপতি ড. মো. আকতার হোসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন রুবাইয়া পারভীন। অনুষ্ঠানটি প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রথমে জানা যায় ওষুধ সেবনে রোগীর নিরাপত্তা সম্পর্কে। রোগীকে সুস্থ করে তুলতেই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। একটি ওষুধ তৈরি হয়ে রোগীর কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। এর ভেতরে বেশ কিছু গবেষণার ধাপ পার হতে হয়। গবেষণার একটি ধাপ হলো ওষুধের কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে জানতে সীমিতসংখ্যক মানুষের ওপর তার প্রয়োগ। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। কারণ, ওষুধ বাজারে আসার পর আরও অনেক রোগী তা ব্যবহার করতে পারে এবং তখন নতুন কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা আগে গবেষণায় দেখা যায়নি। এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজন নিবিড় পর্যবেক্ষণ। এ পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া ফার্মাকোভিজিল্যান্স নামে পরিচিত।

default-image

রোগীদের সুরক্ষার জন্য এ ধরনের পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ওষুধের ক্ষেত্রেই শুধু নয়, পুরোনো ওষুধের জন্যও এটি জরুরি। এ জন্য মাঝেমধ্যেই আমরা দেখি, অনেক পরিচিত ওষুধ, যা দীর্ঘদিন বাজারে চলেছে, তা হঠাৎ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর কোনো খারাপ প্রতিক্রিয়ার দেখার পর এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে।

এশিয়া, বিশেষ করে উপমহাদেশে ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রায় হয় না বললেই চলে। এসব অঞ্চলে বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে নির্ভর করতে হয় ইউরোপ–আমেরিকার ক্লিনিক্যাল ডেটার ওপর। স্বাস্থ্যগত দিক চিন্তা করলে আমাদের দেশের মানুষ ও ইউরোপ–আমেরিকার মানুষের ভেতর অনেক পার্থক্য আছে।

বিজ্ঞাপন

একটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিন্তু শুধু তার রাসায়নিক উপাদান ওপরই শুধু নির্ভর করে না, নির্ভর করে রোগীর শারীরিক গঠন, জিন, পুষ্টির মান ইত্যাদির ওপর। দেখা যায়, একটি ওষুধে ইউরোপীয়দের যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, তা আমাদের দেশের মানুষের নাও হতে পারে। এ জন্য আমাদের দেশে ব্যাপক হারে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনেক ওষুধ আছে, যা রোগীদের জন্য একদম নিরাপদ। আবার কিছু ওষুধ আছে, যাতে অনেক রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেমন ক্যানসারের উচ্চমাত্রার ওষুধ। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা নতুন ইমোথেরাপিতে যে উচ্চ রাসায়নিক উপাদানসম্পন্ন ড্রাগ ব্যবহার করা হয়, তাতে রোগীর চুল পড়ে যাওয়া, অনেক বমি হওয়া বা রক্তশূন্যতার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। আশার কথা, এখন অনেক নতুন ড্রাগ এসেছে, যাতে এই প্রতিক্রিয়ার মাত্রা কম। তবে এ ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে চিকিৎসকেরা থেরাপিগুলোর সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন। সব চিকিৎসকই কিন্তু ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করার আগে রোগীদের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত করে নেন। সেটি সব রোগের সব ওষুধের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটি সব চিকিৎসকেরই দায়িত্ব।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে আরও আলোচনা হয় স্বাস্থ্য অর্থনীতির দিক দিয়ে কীভাবে রোগীদের নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত করা যায়। একটি ওষুধ গবেষণা শেষে এর বিপণন থেকে ব্যবহার পর্যন্ত তিনটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়। ওষুধটি রোগীর জন্য সর্বোৎকৃষ্ট মানের হতে হবে, কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসম্পন্ন হতে হবে এবং সবকিছু জেনে রোগী সিদ্ধান্ত নেবেন ওষুধটি তিনি ব্যবহার করবেন কি না। যেমন একটি ওষুধে কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে এবং কী পরিমাণ খরচ হবে, সবকিছু জেনেই রোগী তার ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী ঠিক করবেন তিনি কোন ওষুধটি কিনবেন।

default-image

একটা সময় বাংলাদেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করত বিদেশি ওষুধ কোম্পানিগুলো। এ জন্য অনেক ওষুধের মূল্য রোগীদের নাগালের বাইরে ছিল। ১৯৮২ সালে আমাদের দেশে ওষুধ অধ্যাদেশ জারি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ওষুধ কোম্পানিগুলো মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরি করছে এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে তা বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তাই এখন অনেক ভালো মানের ওষুধ সহনীয় মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রোগীরা আরও কম খরচে ওষুধ পেতে পারেন। এ জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোর মূল্যনির্ধারণীর ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসনের সঠিক তদারকি করতে হবে। তাই রোগীর নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিতকরণে উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0