default-image

ক্যানসার আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি আশার কথা এই যে এর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাও রয়েছে। বর্তমানে ফুসফুসে ক্যানসার সবচেয়ে মারাত্মক ক্যানসারগুলোর একটি। প্রাথমিক স্তরে এটি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ না করলে পরবর্তী সময়ে এটি মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো এখন বাংলাদেশেও এর উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। আর ক্যানসার নির্মূলে সবার আগে প্রয়োজন জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা গড়ে তোলা।

এই লক্ষ্যে এসকেএফ অনকোলজি নিবেদিত ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ অনুষ্ঠানের চতুর্থ পর্বে অতিথি হিসেবে যোগ দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. রকীব উদ্দীন আহমেদ এবং ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও ক্যানসারযোদ্ধা অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ ফরহাদ।

এ পর্বের আলোচ্য বিষয় ছিল: ফুসফুস ক্যানসার। অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এবং এসকেএফের ফেসবুক পেজে সম্প্রচারিত হয়। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ডা. মো. শাহরিয়ার ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

ডা. রকীব উদ্দীন আহমেদ বলেন, ফুসফুস ক্যানসার একটি মারাত্মক ব্যাধি। এটি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা বেশ কঠিন। কারণ অন্যান্য ক্যানসার শনাক্তকরণে যে স্ক্রিনিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা ফুসফুস ক্যানসারের ক্ষেত্রে ততটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে না। তাই আর্লি স্টেজ পার হলে কিংবা ইন্সিডেন্টাল ফাইন্ডিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। যেমন অনেক সময় দেখা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো কারণে ফুসফুসের এক্স–রে করেছেন, সেখান থেকে সন্দেহজনকভাবে পরবর্তী সময়ে ফুসফুস ক্যানসার শনাক্ত করে চিকিৎসা প্রদান করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে পুরুষদের ক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। মৃত্যুঝুঁকির প্রসঙ্গ আসলে বলতে হবে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ফুসফুস ক্যানসার দুভাবে হতে পারে। এক. ফুসফুসে ক্যানসার যখন শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে। বলা যায় কাশি, জ্বর, গলার স্বর পরিবর্তন, কাশির সঙ্গে রক্ত কিংবা শ্বাসকষ্ট ফুসফুসে ক্যানসারের কিছু সাধারণ উপসর্গ, যেগুলো ফুসফুসে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে।

দুই. ফুসফুস ক্যানসার ফুসফুসে সীমাবদ্ধ না থেকে ফুসফুস থেকে অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়ে; যেমন হাড়ে ছড়িয়ে পড়লে প্রবল ব্যথা অনুভব হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ফুসফুস ক্যানসার মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি অনেক সময় আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা প্রদান করতে অজ্ঞান অবস্থাতেও নিয়ে আসতে হতে পারে। এটি লিভারে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এ ক্ষেত্রে পেটে ব্যথা কিংবা জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই রোগটি কোন স্তরে আছে সেটির ওপর নির্ভর করেই চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

অন্যান্য ক্যানসারের মতো ফুসফুস ক্যানসারকেও চারটি স্তরে ভাগ করা যেতে পারে। আর্লি স্টেজে এটি শনাক্ত করা খুবই কঠিন। তবে কিছু ইন্সিডেন্টাল ফাইন্ডিংসের মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে ফুসফুসের লোকাল সমস্যা নিয়ে রোগী আসতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ফুসফুস ছাড়িয়ে এটি অন্য কোথাও এমনভাবে চলে যায় যে সেসব অঙ্গে ক্ষতির লক্ষণ নিয়ে যখন রোগী পরামর্শ নিতে আসে, তখন ফুসফুস ক্যানসার ধরা পড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫%-৯০% ফুসফুসে ক্যানসারের জন্য দায়ী হলো ধূমপান। আমাদের দেশে বিভিন্ন স্থানে পানিতে আর্সেনিক রয়েছে, এটিও ক্যানসারের একটি অন্যতম কারণ। এ ছাড়া পারিবারিক সূত্রেও কিংবা বার্ধক্যজনিত অন্যান্য রোগের কারণেও অনেকে ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। তাই ফুসফুসে ক্যানসারের উপসর্গ দেখামাত্রই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ ফরহাদ বলেন, আমার ক্যানসার ধরা পড়ে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এবং প্রাথমিকভাবে এর কোনো লক্ষণ ছিল না। আমি চেকআপের জন্য গ্রীন লাইফ হাসপাতালে যাওয়ার পর এক্স–রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়। এরপর এক্স–রে রিপোর্ট দেখে আমাকে এফএনএসি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ক্যানসার শনাক্ত হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্রুত অপারেশন করাতে বলেন। তখন আমার ছাত্র ডা. এ কে এম রাজ্জাক এবং ডা. মানবেন্দ্র বিশ্বাস অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমার অনুমতি নিয়ে আমার অপারেশন করেন। বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাস থেকে আমি মার্চ মাসের ৫ তারিখ অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হলাম। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা ধরে অপারেশন চলে এবং সেটি সাকসেসফুল হয়। উন্নত মানের চিকিৎসার জন্য আমার মনোবল এতটাই বেশি ছিল যে আমার মাঝেমধ্যে মনেই হয়নি আমি একজন ক্যানসার রোগী। এরপর সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে আমি স্কয়ার হাসপাতালে একই সঙ্গে রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি নিই এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0