default-image

শারীরিক যেকোনো সমস্যাই আমাদের মানসিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে স্তনজনিত যেকোনো সমস্যা মনের ভেতর এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে থাকে। সাধারণত হয়ে থাকে, এ রকম কিছু সমস্যার কথা এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে, স্তনের এসব সমস্যার সিংহভাগই কিন্তু ক্যানসারের কারণে হয় না। সুতরাং ভয় না পেয়ে প্রয়োজন, অবশ্যই আপনার নিকটস্থ রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরামর্শ নেওয়া।

স্তনের কিছু সমস্যা

• স্তনে চাকা অনুভব হওয়া (যাকে লাম্প বলা হয়)
• স্তন ব্যথা করা
• স্তনে হালকা চাপ লাগলে ব্যথা অনুভব করা
• বোঁটা থেকে অস্বাভাবিক তরল পদার্থ নির্গত হওয়া (পরিষ্কার, সাদা, হলুদ, সবুজ অথবা লাল হতে পারে)
• বোঁটার স্বাভাবিক আকার বদলে যাওয়া
• স্তনের চামড়ার অস্বাভাবিকতা, যেমন লালচে হওয়া অথবা কুঁচকে যাওয়া

এই সমস্যাগুলো সাধারণত ৪৫ বছরের আশপাশের নারীদের হয়ে থাকে। উল্লেখিত সমস্যাগুলো কারও হয়ে থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। চিকিৎসক প্রয়োজন হলে রোগীকে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে অনুরোধ করতে পারেন এবং একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

যেসব পরীক্ষা করা লাগতে পারে

লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক যেসব পরীক্ষা করা লাগতে পারে, তা নির্ণয় করবেন। প্রচলিত কিছু পরীক্ষার কথা এখানে উল্লেখ করা হলো:

• ব্রেস্ট আলট্রাসাউন্ড: এই পরীক্ষার দ্বারা খুব সহজেই শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে আপনার স্তনের ভেতরের ছবি তৈরি করা যায়। অনেক সুবিধার মধ্যে একটা হলো, এর মাধ্যমে আমরা স্তনের ভেতরের চাকার ভেতরের পদার্থ ঘন না তরল, সেই ব্যাপারে একটা ধারণা করা যায়।

• ম্যামোগ্রাম: এটি একধরনের বিশেষ এক্স–রে, যা চিকিৎসকদের স্তন ক্যানসার নির্ণয়ে সাহায্য করে।

• ব্রেস্ট বায়োপসি (এফএনএসি/কোর বায়োপসি): বায়োপসির মাধ্যমে আপনার চিকিৎসক স্তনের টিউমার, লাম্প অথবা কোনো অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড থেকে ছোট ছোট নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যার মূল কারণ নির্ণয় করেন।

উল্লেখিত সমস্যাগুলোর কারণ

default-image

উল্লেখিত স্তনসংক্রান্ত সমস্যাগুলো বিভিন্ন কারণে হতে পারে; যার বেশির ভাগই গুরুতর কিছু নয়। যেমন মাসিকের সঙ্গে নারীদের শরীরে যে হরমোনের মাত্রা ওঠানামা করে, তা থেকেও স্তনে ব্যথা অনুভূত হওয়া অথবা চাকার সৃষ্টি হতে পারে, যা একদমই স্বাভাবিক। তারপরও স্তনের যেকোনো নতুন সমস্যা ক্যানসারের কারণ অথবা কারণে হতে পারে। এ জন্যই যেকোনো সমস্যার জন্য আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা জরুরি।

স্তনের সব চাকাই কি ক্যানসার?

স্তনের চাকা বা লাম্প সম্ভবত উল্লেখিত সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও ২০-৫০ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ স্তনের চাকাই ক্যানসার নয়, তবু যেকোনো চাকা বা লাম্প অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনে আরও পরীক্ষা করানো উচিত।

প্রাথমিক পর্যায়ে স্তনের সমস্যাগুলো নির্ণয় করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো অনেকটা নির্ভর করে আপনার বয়সের ওপর।

যাঁদের বয়স ৩০ বছরের নিচে: আপনার বয়স যদি ৩০–এর কম হয় এবং আপনি যদি মাসিকের আগে স্তনে চাকা অনুভব করেন, তাহলে আপনাকে হয়তো মাসিক শেষ হওয়ার পর তা মিশে যায় কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে বলা হবে। এই বয়সে সাধারণত চাকাগুলো শরীরে হরমোনের মাত্রা বদলের কারণে হয়, যা মাসিকের পরে স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসে।

যদি মাসিকের পরও স্তনের চাকা মিলিয়ে না যায়, তাহলে আপনার সম্ভবত আলট্রাসাউন্ড বা বায়োপসির প্রয়োজন হবে, যার মাধ্যমে লাম্পের ভেতরের পদার্থ তরল, নাকি ঘন, তা জানা যাবে। ম্যামোগ্রাম সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সী নারীদের প্রয়োজন হয় না; তবে যদি আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া না যায়, তাহলে ম্যামোগ্রাম প্রয়োজন হতে পারে।

যাঁদের বয়স ৩০ বছরের বেশি: ৩০ বছরের ওপরের নারীদের স্তনে যদি কোনো নতুন চাকা হয়, তাহলে সাধারণত একটি ম্যামোগ্রাম করা হয় এবং বিশেষ প্রয়োজনে আলট্রাসাউন্ড। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপর স্তনেরও ম্যামোগ্রাম করা হয়, যাতে করে পার্থক্যটা ভালোভাবে অনুধাবন করা যায়। যদি ম্যামোগ্রাম বা আলট্রাসাইন্ডে চাকাটা অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে সাধারণত বায়োপসির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

বিজ্ঞাপন

স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং

default-image

ব্রেস্ট ক্যানসার স্ক্রিনিং একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা স্তন ক্যানসারের প্রভাব শুরু হওয়ার আগেই তা নির্ণয় করে চিকিৎসাসেবা চালু করেন। স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের প্রধান পরীক্ষা হলো একটি বিশেষ ধরনের এক্স–রে, যার নাম ম্যামোগ্রাম।
স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্য হলো ক্যানসারটি দ্রুততম সময়ে নির্ণয় করা, যাতে তা ছড়িয়ে পড়তে না পারে। বিভিন্ন রিসার্চে দেখা গিয়েছে, নিয়মিত স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনে।

৩৫-৪০ বছর বয়সের দিকে আপনার উচিত আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের ব্যাপারে আলাপ করা এবং আপনার ক্ষেত্রে তা কবে শুরু করা উচিত, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

যাঁদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে আরও আগে স্ক্রিনিং শুরু করা জরুরি। যেমন আপনার পরিবারে যদি কারও অল্প বয়সে স্তন ক্যানসার হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে আপনি অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে যথাসময়ের পূর্বে স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং শুরু করবেন।

স্তন ক্যানসারের বিভিন্ন ধাপ

স্তন ক্যানসারের মূলত চারটি স্টেজ বা ধাপ রয়েছে।
স্টেজ ১ এবং ২: এই দুই স্টেজের ক্যানসারকে প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসার ধরা যেতে পারে।

স্টেজ ১: এই ক্যানসারে টিউমার সাধারণত ২ সেন্টিমিটারের কম হয়, যা আশপাশের লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়েনি।

স্টেজ ২: এই ক্যানসারে টিউমার সাধারণত ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে থাকে, তবে তা বগলের লসিকাগ্রন্থি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

স্টেজ ৩: এ ক্ষেত্রে ধরা হয়, ক্যানসার কিছুটা অগ্রসর হয়েছে, তবে তা সীমাবদ্ধভাবে। টিউমারগুলো সাধারণত ৫ সেন্টিমিটারের চেয়ে বড় এবং আশপাশের লসিকাগ্রন্থিতে বিস্তার করে থাকে।

যদি কোনো টিউমার স্তনের নিচের মাংসপেশি অথবা ওপরের ত্বকে ছড়িয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রেও আমরা তাকে স্টেজ ৩ বলতে পারি।
কিছু স্তন ক্যানসার খুব দ্রুত অগ্রসর হয় এবং স্তনকে লালচে ও অস্বাভাবিকভাবে ফুলিয়ে তোলে। সে ক্ষেত্রে টিউমার ছোট এবং এখনো লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে না পড়লেও তাকে স্টেজ ৩ হিসেবেই গণ্য করা হয়।

স্টেজ ৪: যখন ক্যানসার স্তনের বাইরে গিয়ে দূরবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে; যেমন হাড়, ফুসফুস, লিভার অথবা অন্য কোনো অঙ্গে, তখন তাকে স্টেজ ৪ বলা হয়।
ক্যানসারের স্টেজ ছাড়াও আরও কিছু ব্যাপার আপনার চিকিৎসাব্যবস্থা নির্ণয় করতে সাহায্য করবে; যেমন ‘হরমোন রিসেপ্টর’-এর উপস্থিতি। এ ব্যাপারে আপনার চিকিৎসক আপনার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

আশার কথা, প্রতিটা স্টেজের জন্য নির্ধারিত চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে। তবে ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয় করা হলে চিকিৎসার ফলাফল আরও বেশি সফল হয়।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যবস্থা

স্তন ক্যানসারের সুচিকিৎসার জন্য আন্তবিভাগীয় সহযোগিতা প্রয়োজন। সার্জারি, ক্যানসার ও রেডিওথেরাপি বিশেষজ্ঞরা মিলে আপনার চিকিৎসাব্যবস্থা নির্ধারণ করবেন।

সার্জারি

মূলত দুই প্রকার সার্জারি করা হয়, যা টিউমারের আকার, আকৃতি ও বিস্তৃতির ওপর নির্ভর করে:

• টোটাল মাস্টেকটমি (স্তন অপারেশনের মাধ্যমে কেটে ফেলা)

• ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি (শুধু টিউমারটুকু কেটে ফেলা)

রেডিওথেরাপি: কিছু ক্ষেত্রে সার্জারির পর রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়, যাতে শরীর থেকে ক্যানসার আরও ভালোভাবে নির্মূল করা যায়।

কেমোথেরাপি/এন্ডোক্রাইন থেরাপি/অ্যান্টি-এইচইআর২ থেরাপি: টিউমারের ওপর ভিত্তি করে আপনার ক্যানসার বিশেষজ্ঞ উল্লেখিত এক বা একাধিক চিকিৎসা আপনার জন্য নির্ধারণ করতে পারেন।
আপনার চিকিৎসক আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং সংশয় দূর করতে সাহায্য করবেন। এ জন্য কোনো ধরনের সংশয় থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ডিপার্টমেন্ট অব ল্যাপারোস্কোপিক অ্যান্ড বেরিয়েট্রিক সার্জারি, এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0