default-image
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নুভিস তা ফার্মা নিবেদিত প্রথম আলো অনলাইনের বিশেষ আয়োজন ‘নারী-নক্ষত্র’ অনুষ্ঠানের চতুর্থ পর্বে অতিথি ছিলেন ওজিএসবির স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ এবং ওজিএসবির ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. শ্রাবণ্য তৌহিদা।

default-image

শুরুতেই সঞ্চালক ডা. শ্রাবণ্যর প্রশ্ন ছিল, কীভাবে তিনি আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে মূল্যায়ন করেন? তাঁকে এবং বিশ্বের সব নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে ডা. ফারহানা দেওয়ান বলেন, নারীরা যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, কাজ করেন, সবকিছু দেখাশোনা করেন, এই দিবসে তার মূল্যায়ন করার একটা সুযোগ তৈরি হয়—এটি একটি বিরাট ব্যাপার। নইলে সব দিবসই তো নারী দিবস। এই দিনে নারী যে স্বীকৃতি পেয়েছে, সেটা সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’—এবারের এই প্রতিপাদ্যে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে কাজ করেছেন ডা. ফারহানা দেওয়ান। তিনি বললেন, করোনার সময়টা আমাদের জন্য আসলে বিজয়ের জায়গা। করোনার সময় দুই ধরনের ডাক্তার—সিনিয়র ও জুনিয়র, সবাই নিজের জায়গা থেকে অবদান রেখেছেন। জুনিয়রদের দেখে মনে হতো, তাঁরা সত্যিই যুদ্ধে গেছেন। সিনিয়ররা নীতি ও স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করেছি। প্রথম দিন থেকেই মনে হয়েছে, একজন গর্ভবতী নারী করোনার সময়ে এলে তাঁর চিকিৎসা কীভাবে হবে, তা শুধু ঢাকার চিকিৎসকেরা জানলেই হবে না, ছড়িয়ে দিতে হবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এই ভাবনা থেকে সারা বিশ্বে কী হচ্ছে, রিসার্চ কী বলে, সেগুলো নিয়ে আমরা গাইডলাইন তৈরি করলাম। বললাম, করোনা আক্রান্ত এবং সুস্থ মাকে যেন ভাগ ভাগ করে সেবা দেওয়া হয়। শুরুতে আমাদের কিছু সমস্যা হয়েছে। কিছু রোগীর প্রাণ গেছে, অনেক ডাক্তারের প্রাণ গেছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা যে এখন আমরা অনেক স্ট্রং। অনেক ভালোভাবে আমরা এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা শিখে গেছি।

বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতা এখনো অর্জিত হয়নি। কবে নাগাদ এই সমতা আসবে, বা আমাদের কী করণীয়? ডা. ফারহানা দেওয়ান বলেন, অনেক দূর মেয়েরা এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে যখন থেকে নারীশিক্ষার প্রসার বেড়েছে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে হেলপ সিকিং বিহেভিয়ার বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, অনেক মেয়ে পিরিয়ডের সমস্যা নিয়ে আসে, নানা রকম জেনেটিক বা হরমোনাল কারণে কারও কারও পিরিয়ড জীবনে কখনোই হবেই না। সেই মেয়েরা যখন মা-বাবাসহ আসে, আমরা তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার পরামর্শ দিই এবং তারা সেটা করেও দেখিয়েছে। আর বৈষম্যের বিষয়টি আসে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কাজের বণ্টনে। একটা মেয়েকে তার পরিবারে সময় দিতে হবে, সন্তানের জন্য সময় দিতে হবে, শ্বশুরবাড়িতে সময় দিতে হবে এবং তারপর নিজের প্রফেশনে আসতে হবে। অথচ একটা ছেলে শুধু প্রফেশনে সময় দিলেই হয়। ছেলেমেয়ের মধ্যে বৈষম্যে এটিই আমার চোখে বেশি পড়ে।

default-image

এই জায়গাতেই মেয়েদের প্রতিবাদ প্রয়োজন। ডা. ফারহানা দেওয়ান কতটুকু প্রতিবাদী? তিনি বলেন, যেহেতু আমি শিক্ষিত এবং একজন ডাক্তার, তাই আমার প্রাপ্য এবং করণীয় আমি বুঝি। এর ব্যত্যয় হলে আমি কোনো ধরনের সমঝোতায় যাই না এবং কখনোই যাব না। এত দূর এসেছি কেবল একটি মটো বা মূলনীতি মেনে। নারী হিসেবে আমি এটি করব না, বা এটি পারব না—এই তুলনায় আমি কখনো যাব না। আবার নারী হিসেবে আমার যে কোমলতা, স্বামী-সংসার-সন্তানের জন্য যে টান, এটি কিন্তু তার শক্তি। সে গর্ভাবস্থা নিতে পারে, সে একটি মানুষকে জন্ম দিতে পারে, এটা ছেলেরা চাইলেও পারবা না। মেয়েদের আমি অসীম শক্তির অধিকারী বলেই মনে করি। অনেক অভিভাবক আছেন, একটা বা দুইটা মেয়ে হলে আবার সন্তান নিতে চান ছেলের আশায়। আমরা তাঁদের বলি, এই মেয়েকেই যদি সঠিকভাবে বড় করো, শিক্ষিত করেন, ছেলের প্রয়োজন হবে না। অনেক সময় তাঁরা বুঝতেও পারেন। এই বোঝার সম্পর্কটাও একটা প্রতিবাদ।

বিজ্ঞাপন

নারী, বিশেষ করে মা হওয়ার পথচলাটা অন্য রকম। ঘর-সংসার ও কর্মজীবনে ভারসাম্য ছাড়া নারীদের পথচলাটা কঠিন হয়ে পড়ে। ডা. ফারহানা দেওয়ান বলেন, এসব ক্ষেত্রে নারী এবং পরিবার—দুদিকেই স্যাক্রিফাইস করা প্রয়োজন হয়। আমি দুদিকেই থাকতে চেষ্টা করেছি। যখন সন্তান অসুস্থ হয়েছে, আমি তার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমার স্বামী আমাকে সহায়তা করেছেন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের জন্য দেশের বাইরে যেতে হয়েছে, তখন পুরো পরিবার সাপোর্ট দিয়েছে। আমি একটি কথাই বলব, নিজের প্রফেশনকে ভালোবাসতে হয়। যেমন সংসার ও সন্তানকে ভালোবাসতে হয়, সেভাবেই নিজের কাজকেও ভালোবাসতে হয়।

default-image

যাঁরা ডাক্তার, তাঁরা প্রফেশনকে ভালোবাসবেন একটি বড় প্রেক্ষাপটে থেকে। শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, ভাবতে হবে, আমাদের দেশের নারীরা কেন মারা যাচ্ছে, কীভাবে মাতৃমৃত্যু রোধ করা যায়—এই ভাবনাও আমার একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্বের জায়গা থেকে কীভাবে আমি কাজ করতে পারব সেটা খুঁজে বের করতে পারলে প্রফেশনকে ভালোবাসা সম্ভব। তার মানে এই নয় যে পরিবারকে বঞ্চিত করব। যেমন কোনো দাওয়াত থাকলে আমি যেভাবেই পারি সময় বের করে সেখানে যোগদানের চেষ্টা করি। এতে করে একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, কেউই বলতে পারেন না যে আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। সময়টা নিজের হাতে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তাকে প্রয়োজনমাফিক ডাক্তার দেখাতে হবে, কনসাল্টেশন করাতে হবে। স্বার্থপরের মতো শুধু প্রফেশন দেখলেও তো হবে না। এই ব্যালেন্স ধরে রাখতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন আমার স্বামী আর আমার ছেলে ও মেয়ে। খুব ছোটবেলায় তাদের আমি অনেক সময় দিতে পারিনি, যেটা তারা নিজেদের মতো কভার করেছে। ওরা এই স্যাক্রিফাইসটুকু না করলে অনেক কিছুই করা সম্ভব হতো না।

ছোটবেলা থেকেই ডা. ফারহানা জানতেন তিনি ডা. হবেন। বাবাও বলেছিলেন, তোমাকে ডাক্তার হতেই হবে। মানসিকতাও ওভাবেই গড়ে উঠেছিল। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল গরিব মানুষের সেবা করব। ডাক্তার হওয়ার পেছনে এই ইচ্ছাটাও কাজ করেছে। আমি দেখলাম, মানুষের সেবা করতে ডাক্তার হওয়াই যথেষ্ট। আলাদা করে ভাবতেও হয় না, সময়ও দিতে হয় না। এর প্রতিদানে মানুষের যে নিখাদ ভালোবাসা পাওয়া যায়, তার তো আসলে তুলনা হয় না।

default-image

কিন্তু খুব সোজা পথে এই ভালোবাসা আসেনি। এর জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ পার হতে হয়েছে। একবার এক গ্রামে একজন রোগী এসেছেন যাঁর সন্তানের এক অংশ বের হয়েছে। চেতনানাশকও নেই। তখন একটা ঘুমের ওষুধ দিয়ে, বিশেষ মেকানিজম ব্যবহার করে ওই সন্তানকে বের করতে হয়েছে। একপর্যায়ে বুঝতে পেরেছিলাম বাচ্চাকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু মাকে বাঁচানো যাবে কি না, নিশ্চিত ছিলাম না। এমন আরও অনেক ছোট ছোট ঘটনা আছে।

২০১১ সালে ইউএন জেনারাল অ্যাসেমব্লিতে বিশ্ব থেকে ৫ জন ব্যক্তিকে তাঁদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি ছিলাম তাঁদের একজন। সেবার আমি এমন নানান ঘটনার আলোকে প্রচুর সেমিনার-টক শো-ইন্টারভিউতে কথা বলেছিলাম। আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে, কীভাবে? আমি বলেছিলাম মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে, সচেতনতা বেড়েছে। মেয়েরা সোচ্চার হয়েছে নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে। তারা খুবই প্রশংসা করেছিল। খুব গর্বিত হয়েছিলাম দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে।

আন্তরিকতা, সততা এবং সময়ানুবর্তিতা থাকলে যেকোনো নারী প্রফেশনে সফল হতে পারে বলে মনে করেন ডা. ফারহানা দেওয়ান। আমরা ডাক্তাররা হিপোক্রেটিক শপথ নিয়েছি, যেখানে বলাই আছে আমি রোগীর সেবা করব আর রোগীর জ্ঞানত কোনো ক্ষতি করব না। আমাদের যখন রোগীরা এসে বলে, আমার জন্য যেটা ভালো সেটাই করেন। তখন কী আর সেই রোগীর ক্ষতি করা যায়? তাই নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থেকে চিকিৎসা করতে হবে। জ্ঞানত আমি কোনো ভুল চিকিৎসা দেব না, এই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাসটাই সবচে বেশি জরুরি।

আমাদের হাতেও রোগী মারা যায়, বাচ্চা মারা যায়। প্রতিবার আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, বাচ্চাটা যদি মায়ের পেটে মারা যায়, কীভাবে আমি তাকে সেভ করতে পারতাম? এই টেস্টটা হয়তো আগে করা উচিত ছিল, পরের রোগীর আদ্যোপান্ত জেনে ওভাবে চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করি। দ্বিতীয় কথা হলো, আল্লাহর কাছে আমি সব সময় দোয়া করি, আল্লাহ, আমার হাতে যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আমি বলে নিই, সবকিছুর মালিক আল্লাহ, আমরা অছিলামাত্র। আমরা চিকিৎসা করব, চেষ্টা করব। আমরা এখন অনেক বেশি কথা বলার চেষ্টা করি। রোগীরা কথা বোঝেন, খুশি হন। এগুলো আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে খুব কাজে আসে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিদিন আমাদের দেশে শিশু থেকে বৃদ্ধারা নানা রকম সহিংসতা, নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণের শিকার হন। এই সহিংসতা থেকে বাঁচার উপায় কী? ডা. ফারহানা দেওয়ান মনে করেন, আমাদের মেয়েরা এখনো অনেক সরল। একটা ছেলের উদ্দেশ্য বুঝতে যে পড়ালেখা এবং বোধ প্রয়োজন, এখনো তা মেয়েরা অর্জন করেনি, ক্ষেত্রবিশেষে মায়েরাও এগুলো বুঝতে চান না। প্রায়ই আমাদের কাছে মায়েরা তাঁর মেয়ে নিয়ে আসেন। আমরা যখন বলি মেয়েটি প্রেগন্যান্ট, মায়েরা বিশ্বাস করেন না। আমরা চুপচাপ আলট্রাসনোগ্রাফি করিয়ে রিপোর্টটা দিই। সঙ্গে সঙ্গে দেখি মায়েরা কাঁদতে থাকেন। মেয়েটাকে বাইরে পাঠিয়ে তারপর সেই মাকে শান্ত করতে হয়।

ছেলেরাও অধিকাংশ সময় ভাবে না তারও তো একটা বোন আছে, মা বা মেয়ে আছে। তার সঙ্গেও তো এটা হতে পারে। এই যে দুই পক্ষের মধ্যেই এই অজ্ঞতা, অসচেতনতা, এর পুরো দায়ভার ও কষ্টটা মেয়েগুলোর ওপর পড়ে। মিডিয়া এখন যেভাবে এগিয়ে এসেছে, আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। এখন এই সরল সরল মা-বাবা ও মেয়েগুলো হয়তো বুঝবে কীভাবে সচেতন থাকা যায়। এখন অন্তত প্রতিরোধ ও প্রতিরোধ সহজ হবে।
সবকিছু নিয়েই আইন আছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে সেটার প্রয়োগ নেই।

অনেক ডাক্তার আছেন, যাঁরা অন্যায় করেন। তাঁদের জন্য আমরা সবাই খারাপ হই। সমাজে সবাই ভালো নয়। গুটিকয়েকের জন্য অন্যদের দোষ হয়। প্রয়োগ নিশ্চিত হলেই যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। অথবা বিকল্প হিসেবে প্রতিবাদ করতে হবে। বুঝিয়ে বলতে পারলে, যাঁরা অন্যায় করেন, তারাও একসময় অন্যায়ের পথ থেকে সরে আসেন। যেমন মাঝেমধ্যে কাপল আসে, ১০ বছর বাচ্চা হচ্ছে না। তখনই আমরা বুঝি যে সমস্যাটি স্বামীর। কিন্তু স্ত্রী কখনো বলেন না সমস্যা কার। বিষয়টি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যা স্ত্রীর হলে ওই স্বামী বছর তিনের মধ্যে আবার বিয়ে করে ফেলেন। এখানে নারী ও পুরুষ দুজনেরই অধিকার আছে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার। কিন্তু মেয়েরা পিছিয়ে থাকছেন। এই মনোভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে বলে ড. ফারহানা দেওয়ান মনে করেন।

সবশেষে ডা. ফারহানা দেওয়ান বলেন, নারীরা সব সময় নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করবেন, কারণ তিনি নারী। তাঁকে আত্মসম্মান বজায় রেখে, নিজের যা আছে তাই নিয়ে গর্বিত হতে হবে। কোনোভাবেই মন ছোট করা যাবে না। যিনি সন্তানকে বড় করতে পারেন, তাকে মূল্যবোধ শেখাতে পারেন, তার কোনো তুলনা নেই। বিশ্বাস করতে হবে, আমি কোনো দিক থেকে কম নই, আর নিজের কাজের মধ্যে দিয়েই আমি তা প্রমাণ করব।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন