বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জীবনের প্রথম পর্বের কথা

আমার গ্রাম ঢাকার খুব কাছেই, মুন্সিগঞ্জ জেলায়। সেখানে আমার বাবার জন্ম। তবে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার আজিমপুরে। আমার বাবা যে ঘরটায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটিকেই আমার সবচেয়ে বেশি আপন বলে মনে হয়। সেটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমি সময় পেলেই সেখানে ছুটে যাই। সেখানকার মানুষের কথা শুনি। আমরা নয় ভাইবোন। আমি মা-বাবার চতুর্থ সন্তান। আমরা সবাই বাবার আদর আর মায়ের শাসনে বড় হয়েছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই আমার মায়ের জন্ম। আমার মায়ের হাতের লেখা অসাধারণ, অনেক কবিতা মুখস্থ ছিল। বাবা অত সময় পেতেন না। তবে যখনই সময় পেতেন, আমাদের রূপকথার গল্প শোনাতেন। আমার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষে কলকাতায় চাকরি করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় চলে আসেন। এখানে ব্যবসা শুরু করেন। আমি প্রথম দিন বাবার হাত ধরেই স্কুলে ভর্তি হই। ওখানে ক্লাস ওয়ান ছিল না, সোজা টুতে ভর্তি হই।

default-image

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক একেকটা বই পড়তেন। আর ছুড়ে ছুড়ে ফেলতেন। তাঁর বাবা তা দেখে অবাক হয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন বালক শেরেবাংলা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমার তো সব পড়া শেষ।’ বই নিয়ে শেরেবাংলার বাবা পড়া ধরলেন। সবই পারলেন তিনি। এরপর তাঁর বাবা উঁচু ক্লাসের বই এনে দিলেন ছেলেকে। আমাদের পরিবারেও সেই প্র্যাকটিস ছিল। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার পর আমরা পরের ক্লাসের পড়া পড়তাম। এ কারণে আমরা সব সময় এক ক্লাস এগিয়ে থাকতাম। এভাবেই আমার ভেতর সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার একটা প্রবণতা ঢুকে যায়।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার বাবা আমাকে ‘ডিসিপ্লিন’ রচনা পড়তে দিলেন। পড়তে গিয়ে দেখি, আরে, এগুলো সবই তো আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছেন। আমার মনে পড়ে ঈদের দিনও আমি বাবার গায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে শুয়ে আছি। বাবা আমাকে জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন। আমি নানা প্রশ্নবাণে বাবাকে জর্জরিত করছি। মা বিরক্ত হয়ে বললেন, এত প্রশ্ন করো কেন। বাবা মাকে বললেন, ‘ওকে প্রশ্ন করতে দাও।’ বাবা নিউমার্কেট, সদরঘাট, বাংলাবাজার, বায়তুল মোকাররম, যেখানেই যেতেন, আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। আমি ঘোড়ার গাড়ি ও রিকশায় করে যেতাম। আমি প্রচুর প্রশ্ন করতাম। আর বাবা সবকিছুর উত্তর দিতেন। এই প্রশ্ন করা আর উত্তর পাওয়া আমার জীবন বদলে দিল। আমার স্কুলজীবনের শিক্ষকেরাও অসাধারণ ছিলেন।

পড়াশোনা

আমার বড় তিন ভাইবোন আজিমপুরে লিটল অ্যাঞ্জেল স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে। আমি প্রথম দিন ওই স্কুলে গিয়েই আব্বাকে বলেছি যে এই স্কুলে ছাদ নেই, টিনশেড, আমি এই স্কুলে পড়ব না। সামনেই ছিল ওয়েস্টার্ন হাইস্কুল। ওখানে ভর্তি হলাম। ওখান থেকে এসএসসি পাস করি। ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করি। ভর্তি হই ঢাকা মেডিকেল কলেজে। আমার অ্যানাটমি কঠিন লাগত। ছুরি, চাকু ব্যাপারটা কেমন যেন লাগত। মনে হতো, মানবতার বিরুদ্ধে এসব কাজ। ওগুলো কাটাছেঁড়া করে নার্ভের রুট দেখা, কঠিন লাগত। আমি ফিজিওলজি পাতার পর পাতা মুখস্থ করতাম। মেডিসিনে গিয়ে আমার সেই পড়াটা কাজে দিয়েছে। মানুষের শরীরে চাকু দিয়ে আঁকিবুঁকি করা আমার খুবই অপছন্দ। তাই আমি অ্যানাটমি বা সার্জারি নিইনি। ফিফথ ইয়ার আমার কাছে সবচেয়ে সহজ লেগেছে। এমবিবিএস পাস করে আমি শিক্ষক হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করি। এফসিপিএস করি। এমডি করি। দুটোই ইন্টারনাল মেডিসিনে। তারপর আমি শিক্ষকতায় জয়েন করি।

স্কলার হিসেবে উল্লেখযোগ্য অর্জন

আমি সফল কিনা জানি না। আমি সব সময় একজন সাধারণ মানুষ হতে চেয়েছি। ‘মানুষ’, এটাই সবচেয়ে বড় বিশেষণ। মানুষ ইচ্ছা করলে আকাশে উড়তে পারে, ইচ্ছা করলে পানিতে সাঁতরাতে পারে, কিন্তু ইচ্ছা করলেই মানুষ হতে পারে না। মানুষের জন্য মানুষ হওয়া সবচেয়ে কঠিন। আমি তাই সব সময় মানুষ হতে চেয়েছি। আমি সবার আগে মানুষ হতে চেয়েছি, তারপর একজন ক্লিনিশিয়ান। রিসার্চ করা শুরু করলাম। বেশ কিছু মেডিকেল জার্নালে আমার পাবলিকেশন আছে। চীন ও জাপানে আমি নিজের কাজ নিয়ে প্রেজেন্টেশন দিয়েছি। ‘আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ানস’ থেকে ফেলোশিপ পাই। সারা বিশ্ব থেকে হাতেগোনা কয়েকজনকে তারা ‘মাস্টার অব ফিজিশিয়ান’ উপাধি দেয়। এটা তাদের সর্বোচ্চ একাডেমিক রিকগনিশন। বাংলাদেশ থেকে আমার আগে তিনজন পেয়েছিলেন। আমি চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে এই উপাধি পাই।

default-image

সম্প্রতি (২০২০ সালে) আমি ‘আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স’-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের গভর্নর নির্বাচিত হয়েছি। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে থাকব। রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের একজন অবজার্ভিং এক্সামিনার হিসেবে কাজ করি। পাকিস্তান কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের আমন্ত্রণ পেয়েছি। আমেরিকান আর অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের থেকেও ডাক পেয়েছি গত বছর। করোনার কারণে যেতে পারিনি। আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে নতুন ওষুধ তৈরির গবেষণায় কাজ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধীনে ৫৬টি মেডিকেল কলেজের এডুকেশন সিস্টেমকে উন্নত করার জন্য কাজ করেছি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের কাউন্সিলর ছিলাম। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য। বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের নির্বাচিত সভাপতি ছিলাম। আমরা কোভিড গাইডলাইন করেছি। দেশবাসীকে শিগগিরই উপহার দেব। মেডিসিনের ওপর আমার একটা বই ইন্টারন্যাশনাল পাবলিকেশন পেয়েছে। এই কাজগুলো আমি করতে পেরেছি আমার আশপাশের অসাধারণ কিছু মানুষের সহযোগিতায়।

রিস্টার্ট মোমেন্ট

এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে। আমার দুলাভাই একজন স্কলার ছিলেন। উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাবল গোল্ড মেডেলিস্ট। উনি দীর্ঘদিন অধ্যাপন করেছেন। আমার যেকোনো দুঃসময়ে তিনি সাহস জুগিয়েছেন। প্রেরণা দিয়েছেন। আমাদের স্কুলের রেজাল্টের পর পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী আসতেন প্রাইজ গিভিং সেরিমনিতে। তিনি আমাদের সাহস জোগাতেন। ক্লাস টু থেকে থ্রিতে ওঠার সময় বলা হলো, তিনটা বিষয়ে যারা হায়েস্ট নম্বর পাবে, আর যে প্রথম হবে, এই চারজনকে পুরস্কার দেওয়া হবে। ওই চারটা পুরস্কারই আমি পেয়েছিলাম। তো উনি কানে কানে বলেছিলেন, জীবনে অনেক বড় হও। ক্লাস টুয়ের সেই কথা এখনো দুঃসময়ে উনি আমার কানে ফিসফিস করে বলেন। ওই মুহূর্তটা এখনো আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমাদের সময় এফসিপিএসের আগে এক বছর থানায় চাকরি করতে হতো। তারপর ভর্তি পরীক্ষা দিতে হতো। পাস করে ছয় মাস পর পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দেওয়া যেত। মজার ব্যাপার হলো, সেই পরীক্ষায় সবার ভেতর আমি ফার্স্ট হলাম। তারপর প্রথমবারের পার্ট ওয়ান পাস করে গেলাম। এই সবকিছু আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের উদ্দেশে...

ডাক্তারদের সব সময় কষ্ট করতে হতো। এখন সেই প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে। আমি বলব, কোনোভাবেই ফাঁকি দেওয়ার টেন্ডেন্সি থাকা যাবে না। দেশের ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। যে রোগী বা ছাত্র আপনার কাছে আসবে, ওই মুহূর্তে তিনিই আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাদের সেভাবেই সম্মান ও গুরুত্ব দিতে হবে। আর হাসুন। অট্টহাসি দিন। নিজে খুশি থাকুন, সেই আনন্দ ছড়িয়ে দিন। অন্যের আনন্দে আনন্দিত হোন। আপনার মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করুন। উত্থান আর পতন জীবনের ছন্দের অংশ। তাই এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন