মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসারে পুরুষেরাই বেশি আক্রান্ত

বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধিগুলোর মধ্যে ক্যানসার অন্যতম। বাংলাদেশেও এটি মৃত্যুহারের জন্য দায়ী রোগগুলোর তালিকায় রয়েছে। তাই ক্যানসার যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধ করা যায়, সে জন্য এর উপসর্গ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখতে হবে। তবে আশার কথা হলো প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করলে জটিলতা এড়ানো যায়। এর মধ্যে কিছু রয়েছে, যার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই; আবার কিছু রয়েছে, যেগুলো আমরা জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিবর্তন করতে পারি। এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। আর নিয়মমাফিক চলাফেরার মাধ্যমে ক্যানসার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

default-image

ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসকেএফ অনকোলজি নিবেদিত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ পর্বে অতিথি হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, মেডিকেল অনকোলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা এবং জেনারেল সেক্রেটারি, শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশন; ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, সহকারী অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ডা. নুসরাত জেরিন লাবণ্য, ডেন্টাল সার্জন, শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশন।

এ পর্বের আলোচনার বিষয় ছিল ‘মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসার’। অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রথম আলো ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে সম্প্রচারিত হয়। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ডা. মো. শাহরিয়ার ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসার বাংলাদেশে একটি অন্যতম প্রধান ক্যানসার এবং বলা হয়ে থাকে এ ক্যানসারের ঝুঁকির দিক হিসাব করলে বাংলাদেশের স্থান বিশ্বে তৃতীয়। এপ্রিল মাসকে মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসার সচেতনতার মাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের দেশে ক্যানসারে আক্রান্তের প্রায় ১০-১৫ শতাংশ রোগীই মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসারের রোগী; উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে এটা ২-৩ শতাংশ হয়ে থাকে।

default-image

আমাদের দেশে নারীদের তুলনায় পুরুষদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। বয়স্ক ব্যক্তিরা, বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিরা এ রোগের শিকার হন। তবে অল্প বয়সীরাও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অল্প বয়সীদের ক্ষেত্রে জিহ্বার ক্যানসারে আক্রান্তের হার বেশি। এ ছাড়া ঠোঁট, গালের ভেতরের পর্দা, দাঁতের মাড়ি, জিহ্বা ও জিহ্বাসংলগ্ন মুখের অংশ, মুখের তালু, মুখ ও মুখগহ্বরের প্রতিটি অঙ্গই ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ছোট একটি বিন্দু আকারের ঘা বা একটি ছোট পিণ্ডের মতো হতে পারে। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে এর আকার বাড়তে থাকে। আমাদের দেশে একটি কুসংস্কার রয়েছে যে দাঁতের গোড়ায় ব্যথা হলেই পান চিবানো কিংবা গুল ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে। অথচ অনেকেই জানেন না যে পান, জর্দা, সাদা পাতা ও গুল ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ক্যানসার অনেক সময় ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের ফলে গলনালি, পাকস্থলী কিংবা প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের কারণ হতে পারে।

ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান বলেন, মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসারের লক্ষণগুলোর মধ্যে মুখের অভ্যন্তরের ঘা বা ক্ষত অন্যতম, যা ধূসর, সাদা কিংবা লালচে বর্ণের হয়ে থাকে। এটি ঠোঁট, জিহ্বা, মুখগহ্বর, চোয়াল বা তার আশপাশে হয়ে থাকে। আকারে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এতে ব্যথা অনুভব করা, কোনো অংশে জ্বালাপোড়া, খোঁচানোর মতো অনুভূতি ইত্যাদি হয়ে থাকে। অনেক সময় ক্যানসার–জাতীয় আলসার হতে পারে। অ্যাডভান্সড স্টেজে গলায় কিছু আটকে আছে বলে মনে হওয়া, চোয়াল বা জিহ্বা স্বাভাবিকভাবে নাড়াতে না পারা বা ব্যথা অনুভব করা, কথা বলতে, খাবার চিবাতে ও গিলতে কষ্ট হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

default-image

খেতে না পারার কারণে রোগীর ওজন ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। এর রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে ধূমপান অন্যতম। সাধারণত তামাক বা তামাকজাত যেকোনো পণ্য সেবন, যেমন বিড়ি, সিগারেট, সাদা পাতা ইত্যাদি এবং জর্দা, সুপারি, চুন দিয়ে পান খাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের কারণেও এটি হতে পারে। এ ছাড়া বংশগত কারণেও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ডা. নুসরাত জেরিন লাবণ্য বলেন, শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশন মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসারের পাশাপাশি অন্য রোগীদেরও উন্নত চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যানসারের চিকিৎসায় স্ক্রিনিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রায় ৫০০ রোগীর দাঁত ও মুখ পরীক্ষা করে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে অধিকাংশ রোগীর দাঁত ও মুখের ভেতরের অংশ খুবই অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে।

default-image

আমরা এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি প্রোগ্রাম করেছি। এ প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে প্রতি মাসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দাঁত ও মুখের পরীক্ষা করার পদ্ধতি এবং প্রতি ছয় মাস পরপর অভিজ্ঞ ডেন্টিস্টের পরামর্শ গ্রহণের উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে। এ ছাড়া কেউ আলগা দাঁত ব্যবহার করে কীভাবে তা ব্যবহার করবে বা পরিষ্কার করবে তা–ও বলা হয়ে থাকে। আবার কারও ধারালো দাঁত থাকলে এর সঙ্গে মুখের কোনো অংশের ঘর্ষণের ফলে যে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, সে সম্পর্কে জানানো হয়। অর্থাৎ এ প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষ যেগুলো জানেন না, সে বিষয়গুলো সম্পর্কে তাঁদের সচেতন করতে পারি। পাশাপাশি এ–সম্পর্কিত কারও কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা এর চিকিৎসা করে থাকি এবং ক্যানসার ধরা পড়লে যেন আর্লি স্টেজেই তা নির্মূল হয়, সে জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।

ক্যানসার পুরোপুরিভাবে প্রতিরোধ করা না গেলেও এর ঝুঁকির কারণগুলো জানা থাকলে আমরা সচেতন হতে সক্ষম হব। ফলে এর ঝুঁকি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারব। বলা যেতে পারে, বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার ধরন আগের চেয়ে অনেক উন্নত এবং এখানে বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন