মৃগীরোগে বিভ্রান্তি নয়, সচেতন হতে হবে

৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মৃগী রোগ দিবস। এ রোগ সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথম আলো আয়োজন করেছে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘এসকেএফ নিবেদিত মৃগীরোগ সচেতনতা সপ্তাহ’। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের বিষয় ছিল, ‘মৃগীরোগ: কী এবং কেন?’
অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরী। সঞ্চালনায় ছিলেন চিকিৎসক লুবাইনা হক। অনুষ্ঠানটি ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো ফেসবুক পেজ থেকে সম্প্রচার করা হয়।

আদিকাল থেকেই মৃগীরোগ নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এ নিয়ে শুরুতেই চিকিৎসক অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মৃগীরোগ মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের একটি জটিল রোগ। আমাদের মস্তিষ্ক থেকে যখন কোনো সিগন্যাল আসে তখনই আমরা কাজ করতে পারি। যেমন, হাত-পা নাড়ানো ইত্যাদি। কিন্তু যখন অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক সিগন্যাল আসে, তখন এই রোগের সৃষ্টি হয়।’ এ রোগটি প্রকোপ শুরু হলে কাঁপুনি, খিঁচুনি হয়, হাত পা শক্ত হয়ে যায়, দাঁতে দাঁত লেগে যায়, ফলে জিহ্বা কেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, কখনো এ অবস্থায় প্রস্রাব–পায়খানাও হয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মৃগীরোগের ইতিহাস বেশ পুরোনো। শোনা যায়, প্লেটো, আইনস্টাইন, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট প্রমুখ বিখ্যাত মানুষদের এ রোগটি ছিল। অনেক আগে মানুষের মৃগীরোগ নিয়ে অনেক কুসংস্কার ছিল। মানুষ ভাবত, রোগটা ঈশ্বরের অভিশাপ। তাই রোগীদের সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া হতো তখন। এর চিকিৎসা পদ্ধতিও ছিল বীভৎস। হাতুড়ি দিয়ে মাথায় বাড়ি দিয়ে বা মাথা ফুটো করে চিকিৎসা করা হতো। এমনটাই জানা গেল চিকিৎসক অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরীর আলোচনা থেকে।

default-image

তিনি জানান, ‘এ রোগ আমাদের মস্তিষ্কে তেমন কোনো ক্ষতি করে না। এ রোগ নিয়ে সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। মৃগীরোগ হলে কেউ স্বাভাবিক কোনো কাজ করতে পারবে না, সমাজে থাকতে পারবে না, এটি কোনো চিকিৎসক মনে করে না। ভালোভাবে চিকিৎসা করলে, ওষুধ আর নিয়মের ভেতর থাকলে এ রোগ নিয়েও সব কাজ চালিয়ে যাওয়া যাবে।’

গ্রামাঞ্চলে বা কখনো কখনো শহরে দেখা যায়, খিঁচুনি শুরু হলে রোগীকে জুতা, মোজার গন্ধ শুঁকতে দেওয়া হয়, দাঁত লেগে যেন জিহ্বা কেটে না যায়, এ জন্য মুখের ভেতর চামচ বা শক্ত কিছু দিয়ে দেওয়া হয়। এগুলো করা যাবে না বলে জানান এম এস জহিরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে কাত করে দিতে হবে বা বিছানা অথবা মেঝেতে সোজা করে শুইয়ে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে খিঁচুনির সময় মাথায় যেন আঘাত না লাগে, আশপাশে যেন ধারালো কোনো জিনিস না থাকে। এই খিঁচুনি এক বা দুই মিনিট পর ঠিক হয়ে যায়।’ এ ছাড়া আঁটসাঁট পোশাক পরা থাকলে ঢিলা করে দিতে হবে। মুখে লালা এলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগী যেন শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিকমতো নিতে পারে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। এরপর যদি খিঁচুনি দীর্ঘ সময় বা বারবার হতে থাকে তখন হাসপাতালে নিতে হবে।

default-image

মৃগীরোগ কেন হয়, বেশির ভাগ সময় এর কোনো সঠিক কারণ জানা যায় না। তবে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টি–এপিলিপটিক ড্রাগের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ আনা যায়। আর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের মৃগীরোগ তিন–চার বছরের ভেতরে ভালো হয়ে যায়। এ ছাড়া ৩০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খেতে হয় এবং ৩০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় ওষুধেও কোনো কাজ হয় না।

বিজ্ঞাপন

অনেক শিশুর সেরেব্রাল পলসি রোগ হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে খিঁচুনি হতে দেখা যায়। অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘এ ধরনের মৃগীরোগ বা খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। ওষুধ দিলে সুস্থ হয় না, শুধু খিঁচুনি হওয়াটা কমানো যায়।’

default-image

মৃগীরোগীদের অনেক ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। যেমন, এসব রোগীর উচ্চ শব্দে গান শুনলে, অ্যাকশন মুভি বা স্পর্শকাতর কোনো দৃশ্য দেখলে কিংবা হঠাৎ কোনো দুঃসংবাদ শুনলে সিজার অ্যাটাক বা খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ড যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। আবার অ্যান্টি–এপিলেপটিক ড্রাগ সেবনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এ ব্যাপারে মৃগীরোগীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়।

অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মৃগীরোগীদের সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে হবে। রাত জেগে কাজ করা যাবে না, ঘুমানোর সময় বাড়াতে হবে। স্ট্রেসফুল বা চাপযুক্ত পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে হবে। এ ছাড়া আগুনের কাছে যাওয়া যাবে না, একা একা কোথাও যাওয়া যাবে না। আর খিঁচুনি সেরে গেলে ভালো নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন বন্ধ করতে হবে।’

অনেকেই মনে করেন, খাবারের সঙ্গে মৃগীরোগের সম্পর্ক থাকে। এ নিয়ে অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘এ রোগের সঙ্গে খাবারের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। আমরা সচরাচর যে খাবার খাই, মৃগীরোগীও সেই একই খাবার খেতে পারবেন।’
আলোচনা অনুষ্ঠানে অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরী দর্শকদের মৃগীরোগ–সম্পর্কিত অনেক প্রশ্নের জবাব দেন।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন