মৃগীরোগ ও নারীস্বাস্থ্য

মৃগীরোগ নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবার হয়ে থাকে। তবে নারী রোগীদের এটি নিয়ে একটু বেশিই সতর্ক থাকতে হয়। মৃগীরোগ ও নারীস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হলো আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ দিবস উপলক্ষে প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠান এসকেএফ নিবেদিত ‘মৃগীরোগ সচেতনতা সপ্তাহ’-এর শেষ পর্বে। এই পর্বের প্রতিপাদ্য ছিল: মৃগীরোগ ও নারীস্বাস্থ্য।

default-image

ডা. লুবাইনা হকের সঞ্চালনায় এ পর্বে অতিথি হিসেবে ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অবস ও গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহনাজ পারভীন। অনুষ্ঠানটি ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো ও এসকেএফের ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মৃগীরোগ বেশি হয়। কিন্তু মেয়েদের শরীরে কিছু হরমোন আছে, বিভিন্ন বয়সের শারীরবৃত্তীয় এসব হরমোনের পরিবর্তনের জন্য মৃগীরোগের প্রভাবটা একটু অন্যভাবে পড়ে। মেয়েদের শরীরে এস্ট্রোজেন নামের একটি বিশেষ হরমোন থাকে। এই হরমোনের জন্যই তাঁদের মাসিক হয়, তাঁরা গর্ভবতী হন। আবার একটা সময় শরীরে এই হরমোনের পরিমাণ কমে যায় এবং মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়টাকে বলা হয় মেনোপজ। ডা. শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘এই এস্ট্রোজেন হরমোন খিঁচুনির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এর বিপরীতে মেয়েদের শরীরে প্রোজেস্টেরন নামে আরেকটি হরমোন থাকে, যা খিঁচুনির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। এই দুটি হরমোনের ব্যালেন্স প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয়। এই হরমোনের প্রভাবে মৃগীরোগ বা খিঁচুনির তারতম্য হতে পারে।’

অনেক সময় শোনা যায় মাসিকের সময় নারী মৃগীরোগীর খিঁচুনি বেড়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে ডা. শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘ মাসিকের আগে ও পরে শরীরে এস্ট্রোজেন হরমোনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এটি বেশি থাকলে খিঁচুনির হার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হবে। যে মহিলাদের মৃগীরোগ আছে, তাঁদের ভেতর ৪০ থেকে ৭০ শতাংশের এ জন্য মাসিকের সময় খিঁচুনি হয়ে থাকে।’ এ সময় মহিলাদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। ওষুধ ঠিকমতো খেতে হবে, বিশ্রাম নিতে হবে এবং কোনো রকমের চাপ বা স্ট্রেস নেওয়া যাবে না।

আমাদের দেশে মেয়েদের মৃগীরোগ হলে সমাজে অনেক ভোগান্তি, অবহেলা, কুৎসার শিকার হতে হয়। অনেক মা–বাবা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় তার এই রোগকে লুকিয়ে রাখেন। ডা. শাহনাজ পারভীনের মতে, এটি করা মোটেও উচিত না। তিনি বলেন, ‘অনেকেই ভাবেন মৃগীরোগ একটি অভিশাপ বা জিন-ভূতের আসর। এ জন্য বিয়ের সময় রোগটি লুকিয়ে রাখেন। এটি সমাজে ঢুকে গেছে। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। মৃগীরোগীর জীবন এ রোগের জন্য আটকে থাকতে পারে না। এই রোগ নিয়ে একজন নারী সবকিছুই করতে পারবেন। মৃগীরোগ নিয়ে বিয়ে, দাম্পত্য জীবন, গর্ভধারণ সবই সম্ভব। আর বিয়ের সময় স্বামী আর তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে না লুকিয়ে তাঁদের জানাতে হবে, যাতে তাঁরাও সতর্ক থাকেন।’

অনুষ্ঠানে মৃগীরোগীর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিয়ের পর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের সময় নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। কারণ, মৃগীরোগের কিছু ওষুধের প্রভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের পিল বা বড়ির কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। মৃগীরোগের ওষুধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাই কখনো কখনো পিলের ডোজ বাড়াতে হয়। এ জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই এই দুই ধরনের ওষুধ সেবন করতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণের আরও কিছু পদ্ধতি আছে। যেমন হাতের নিচে নরপ্ল্যান্ট করা হয়। এ ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ির সঙ্গে কনডম ব্যবহার করা। এতে পিলের ডোজ বাড়ানো–কমানোর ঝামেলা থাকে না। আর কোনো রোগী যদি জন্মনিরোধের জন্য কপার–টি ব্যবহার করেন, তাহলে পিল খাওয়া লাগে না। আর মৃগীরোগের ওষুধ পরিবর্তন করা লাগে না। কারণ, কপার–টিতে কোনো হরমোন নেই।

বিজ্ঞাপন

মৃগীরোগীর গর্ভধারণ সম্পর্কে ডা. শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘অনেকের ভ্রান্ত ধারণা থাকে যে মৃগীরোগী গর্ভধারণ করতে পারবেন না বা বাচ্চা হওয়ার সময় অনেক ঝামেলা হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এগুলো কোনো প্রতিবন্ধকতাই না তাঁদের জন্য। স্বাভাবিকভাবেই মা হওয়া যাবে। কিন্তু অনেক বেশি সতর্কতা লাগবে। একটি প্রেগনেন্সি প্ল্যানিং করতে হবে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে। যে ওষুধ সেবন করা হয়, তার বেশি-কম বা পরিবর্তনের দরকার হতে পারে। কারণ, মৃগীরোগের কিছু ওষুধ আছে, যা বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। সে ধরনের ওষুধ খেলে ছয় মাস আগের থেকে আমরা তা পরিবর্তন করে দিতে পারি। বাচ্চা নেওয়ার আগে আমরা তাঁদের ফলিক অ্যাসিড খেতে বলি। সব মহিলারই উচিত গর্ভধারণের আগে থেকে ফলিক অ্যাসিড খাওয়া শুরু করা। মৃগীরোগীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই খেতে হবে। আর গর্ভধারণ হওয়ার পর নিয়মিত চেকআপে থাকতে হবে।’

গর্ভকালে খিঁচুনি শুধু মৃগীরোগের জন্য নয়, আরও কিছু কারণে হতে পারে। যেমন প্রেসার বেড়ে গেলে হতে পারে। এ অবস্থাকে এক্লামশিয়া বলে। পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা যায়।

গর্ভকালে খিঁচুনি হলে বাচ্চার রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হয়ে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। এতে বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হয়। আর খিঁচুনির সময় মা পড়ে গিয়ে পেটে জোরে আঘাত পেলে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এর ফলে বাচ্চার অনেক সমস্যা হতে পারে।
গর্ভবতী মৃগীরোগীর ওষুধ চলাকালে বাচ্চার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য বিশেষ টেস্ট আছে। ডা. শাহনাজ পারভীন বলেন, এনোমেলি স্ক্যান নামের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম আছে, যেখানে বাচ্চার অবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। ১১ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে আর ২০ থেকে ২২ সপ্তাহের মধ্যে করতে হয়। এতে বাচ্চার কোনো জন্মগত শারীরিক ত্রুটি থাকলে তা ধরা পড়ে।

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে যে মৃগীরোগীর প্রসবে কোনো সমস্যা হতে পারে কি না। এ প্রসঙ্গে ডা. শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘মৃগীরোগীর স্বাভাবিক প্রসব হওয়া সম্ভব এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা হচ্ছেও। মায়ের বা বাচ্চার অন্য কোনো সমস্যা থাকলে তখন সিজার করা লাগতে পারে। আর হাসপাতালে যাওয়ার আগে অবশ্যই ওষুধ সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।’

পরিবারের সদস্যদের, বিশেষভাবে গর্ভবতী মৃগীরোগীর পাশে থাকতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে রোগী ঠিকমতো ওষুধ সেবন করছে কি না, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিচ্ছে কি না।
আর বাচ্চা প্রসবের পর বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মৃগীরোগের ওষুধের কোনো পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই বলে জানান ডা. শাহনাজ পারভীন। তবে সেই সময় মাকে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি খেতে হবে। আর বাচ্চার যত্ন নিতে গিয়ে মায়ের ঘুম কম হলে খিঁচুনি বেড়ে যেতে পারে। এ জন্য পরিবারের অন্য সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে। মাকে বিশ্রামের সুযোগ করে দিতে হবে।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন