মৃগীরোগ চিকিৎসায় সার্জারির ভূমিকা

মৃগীরোগ সাধারণত নিয়মিত ওষুধ সেবনেই সেরে যায়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে শল্যচিকিৎসার। এ নিয়েই আলোচনা হলো আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত প্রথম আলোর বিশেষ অনুষ্ঠান এসকেএফ নিবেদিত ‘মৃগীরোগ সচেতনতা সপ্তাহ’-এর পঞ্চম পর্বে। এ পর্বের প্রতিপাদ্য ছিল: মৃগীরোগ চিকিৎসায় সার্জারির ভূমিকা।

default-image

ডা. লুবাইনা হকের সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ফজলে এলাহী মিলাদ। অনুষ্ঠানটি ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল: ‘মৃগীরোগ খিঁচুনির চেয়ে বেশি কিছু’। অর্থাৎ কোনো রোগীর যদি বারবার খিঁচুনি হয় এবং এর কারণে সেই রোগীর জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়, তখন এ অবস্থাকে বলা হয় মৃগীরোগ। এ দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সচেতন করা এবং সবাইকে বোঝানো যে বৈজ্ঞানিকভাবে চিকিৎসায় এ রোগ ভালো হয়। অনেক রকমের চিকিৎসাপদ্ধতি আছে। প্রথমে ওষুধের মাধ্যমে শুরু করতে হয়। এতে কাজ না করলে দরকার হয় সার্জারির।

ডা. মো. ফজলে এলাহী মিলাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সেবনের পর যখন মৃগীরোগের কোনো উন্নতি হয় না, ঘন ঘন খিঁচুনি হতে থাকে, তখন নিউরোলজির চিকিৎসক রোগী নিউরোসার্জনের শরণাপন্ন হতে বলেন। মৃগীরোগে অপারেশন ব্যাপারটি গত শতাব্দীতেই আবিষ্কৃত হয় এবং আশি–নব্বইয়ের দশকে বিষয়টি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আমাদের দেশের নিউরো সার্জনদের একটা অংশ নিবেদিতভাবে এই সিজার (খিঁচুনি) সার্জারি, মুভমেন্ট ডিসঅর্ডার সার্জারি নিয়ে কাজ করছেন। সুখের বিষয় যে এখানে এ ধরনের সাবস্পেশালিটি অন্যান্য সাবস্পেশালিটির মতো সম্প্রসারিত হচ্ছে।’

মূলত তিন ধরনের মৃগীরোগে সার্জারির প্রয়োজন হয়। মেসিয়াল টেম্পোরাল স্লেরোসিস, এটি মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবের একটা রোগ। এ ছাড়া বাচ্চাদের লেনক্স গ্যাসটট সিনড্রোম এবং ইনফেন্টাইল হেমিপ্লেজিয়া। এ তিন ধরনের মৃগীরোগের সার্জারিও তিন রকমের। রিসেকশন—যেখানে মস্তিষ্কের যে অংশের জন্য বেশি খিঁচুনি হয়, সেটি অপারেশন করে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। ডিসকানেকশনে মস্তিষ্কের খিঁচুনির যে ট্রান্সমিশনটি হয়, সেটিকে ব্লক করে দেওয়া হয়। আর এ সেক্টরের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় অপারেশন পদ্ধতি হলো ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন।

সার্জারি করার আগে বেশ কিছু দিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এ নিয়ে ডা. মো. ফজলে এলাহী মিলাদ বলেন, ‘অপারেশনের আগে ওষুধে রোগীর খিঁচুনি বন্ধ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা হয়েছিল কি না, এটি নিশ্চিত করতে হবে। বলা হয়ে থাকে, এক-তৃতীয়াংশ রোগীর ওষুধে এ রোগ সারে না। এরপর কোন রোগীর জন্য কোন সার্জারি প্রয়োজন, তা বের করতে ইভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়ন করা হয়। এ ধাপের প্রথমে আছে নিউরোলজিক্যাল এক্সামিনেশন। এরপর নিউরো–সাইকোলজিক্যাল এক্সামিনেশন এবং ইইজি টেস্ট। ভিডিও ইইজিও করা হয়। ইইজির মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোন অংশে সমস্যা, তা সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এমআরআই বা ফাংশনাল এমআরআইও করা হয়।’

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে দর্শকদের মৃগীরোগের নিউরোসার্জারি নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়। এখানেই জানতে চাওয়া অপারেশনে সফলতার হার সম্পর্কে। জবাবে ডা. মো. ফজলে এলাহী মিলাদ বলেন, ‘অপারেশনে মৃগীরোগ সম্পূর্ণ ভালো হবে কি না, এটি কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। মস্তিষ্কের যে অংশটি ফোকাস করা হয়েছে, তার ব্যাপ্তি যদি অনেক বেশি হয়, তাহলে রিসেকশন বা ডিসকানেকশন যা–ই করা হোক না কেন, এটি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার কারও ফোকাস কম, কিন্তু সিম্পটম অনেক বেশি, সে ক্ষেত্রেও অপারেশন করে ভালো না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বলতে দ্বিধা নেই, এটি খুব সুপার স্পেশাল সার্জারি। সব সময় সফলতা পাওয়া যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধু আমাদের দেশে বিশ্বব্যাপী সিজার অপারেশনের অসফলতার হার নেহাত কম নয়।’

উন্নত বিশ্বে অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশ এই সার্জারির ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে আছে। রিসেকশন সার্জারিতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য না থাকলেও ডিসকানেকশন আর স্টিমুলেশনের জন্য যে উন্নতি প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ একদম নতুন।

ডা. মো. ফজলে এলাহী মিলাদ আলোচনা থেকে আরও জানা যায়, মৃগীরোগের সার্জারিতে কিছু ঝুঁকি থাকে। মস্তিষ্কের কিছু এলোকেন্ট এরিয়া থাকে, যেখান থেকে আমাদের ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রিত হয় বা হাত–পায়ের নাড়াচাড়া নিয়ন্ত্রিত হয়, সেই অংশে কোনো ফোকাস পয়েন্ট থাকলে অপারেশনের পর ওই অংশের স্বাভাবিক কাজের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে আগেই রোগী আর তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাউন্সেলিং করা হয়। আর চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে অপারেশনের কাজটি পরিচালনা করেন।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন