মৃগীরোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভূমিকা

মৃগীরোগ এমন একটি রোগ, যা যথাসময়ে নির্ণয় হলে দ্রুত আরোগ্য লাভ সম্ভব। এই মৃগীরোগের নির্ণয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ‘এসকেএফ নিবেদিত মৃগীরোগ সচেতনতা সপ্তাহ’-এর তৃতীয় পর্বে। এ পর্বের বিষয় ছিল ‘মৃগীরোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভূমিকা’।

default-image

ডা. লুবাইনা হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. নাহিদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানটি ৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো ও এসকেএফের ফেসবুক পেজ থেকে সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রথমেই ডা. মো. নাহিদুল ইসলাম কীভাবে মৃগীরোগ নির্ণয় করা হয়, সে সম্পর্কে আলোচনা করেন। এ রোগের ডায়াগনোসিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোগীর ইতিহাস, যা রোগী বা তাঁর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া হয়। কিছু উপসর্গ আছে, তা বিশ্লেষণ করে রোগটি শনাক্ত করা যায়। এ ক্ষেত্রে এই ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিসেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তারপরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে, যার মাধ্যমে মৃগীরোগ নিশ্চিত করা হয়। এর ভেতর রয়েছে ইইজি, এমআরআই (এপিলেপসি প্রোটোকলসহ)। এ দুটো পরীক্ষা করতেই হবে। এ ছাড়া কিছু আধুনিক ইমেজিং টেস্ট আছে এখন। যেমন: পেট (PET) এবং স্পেক্ট (SPECT) টেস্ট।

মাঝেমধ্যে খিঁচুনির সমস্যা নিয়ে কোনো রোগী এলে রক্ত পরীক্ষা করতে দেওয়া। কারণ, রক্তে গ্লুকোজ, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম লেভেল বেড়ে বা কমে গেলে খিঁচুনি হতে পারে।
ডা. মো. নাহিদুল ইসলাম ইইজি টেস্ট নিয়ে বেশ কিছু তথ্য দেন। তিনি বলেন, এটি একটি ইনভেসিভ পদ্ধতি। ইলেকট্রিক লিড মাথার তালুতে সংযুক্ত করে স্নায়ুতন্ত্রের কোষের ক্রিয়াকলাপ শনাক্ত করার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। কোনো রোগী মৃগীরোগের উপসর্গ নিয়ে এলে তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে ইইজি টেস্টের দরকার হয়। এটির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মৃগীরোগ আলাদা করে শনাক্ত করা যায়। এতে ওষুধ বাছাই করতে বেশ সুবিধা হয়। কারণ, সব মৃগীরোগের ওষুধ এক নয়।

মো. নাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, কখনো কখনো মৃগীরোগে সার্জারির প্রয়োজন হয়। এ সময় ইইজি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষের অস্বাভাবিকতা দেখাতে সাহায্য করে। আবার কোনো রোগী দুই থেকে তিন বছর ওষুধ সেবন করলে এবং তাঁদের আর কোনো উপসর্গ দেখা না গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটির ক্ষেত্রেও ইইজির সাহায্য নেওয়া হয়।
ইইজি টেস্ট বাংলাদেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেই করা হয়। এই টেস্ট রেকর্ড করা খুবই সহজ। তবে রিপোর্ট করার জন্য দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব আছে। আবার ইইজির আগে কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে। সেখানেও কিছু ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকতে পারে। ইইজি যখন-তখন গিয়ে করা যায় না। আমাদের দেশে আবার যেকোনো ডায়াগনোসিস সেন্টারে গেলে রেকর্ড করে দেয়। ডা. মো. নাহিদুল ইসলাম জানান, এটা করা মোটেও ঠিক নয়। ইইজি করার আগে মাথার স্ক্যাল্প শ্যাম্পু দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এই টেস্ট করার আগের দিন রোগীকে কম ঘুমাতে হয়। যাতে ল্যাবের ভেতর এসে টেস্টের সময় একটু ভালো করে ঘুমিয়ে নিতে পারেন। ঘুমন্ত ও জাগ্রত—এই দুই অবস্থায় ইইজি করলে রোগ শনাক্তকরণ সহজ হয়ে যায়।

এমআরআই করেও মৃগীরোগ শনাক্ত করা যায়। মস্তিষ্কে কোনো গঠনগত পরিবর্তন হলে এমআরআইয়ের মাধ্যমে সেটা দেখা যায়। মৃগীরোগ শনাক্তের জন্য কিছু প্রোটোকল মেনে এমআরআই করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, যাঁদের টিউমার আছে বা রক্তনালির অস্বাভাবিকতা (এভিএম, অ্যানুরিজম) আছে, তাঁদের ভেতর মৃগীরোগের উপসর্গ দেখা যায়। এমআরআইয়ের মাধ্যমে গঠনগত পার্থক্যটা ধরা পড়ে। সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে ব্রেন সার্জারির মাধ্যমে তা থেকে উপশম পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

অনেক সময় ডায়াবেটিক রোগীরা খিঁচুনি নিয়ে আসেন। তখন ব্লাড টেস্টের মাধ্যমে তিনি হাইপার বা হাইপোগ্লাইসেমিয়াতে ভুগছেন কি না, তা বের করে কেবল গ্লুকোজ লেভেল স্বাভাবিক মাত্রায় এনে খিঁচুনির সমস্যা সমাধান সম্ভব। আবার রক্তের ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেশিয়াম লেভেল বেড়ে বা কমে গেলে তখন অ্যান্টি–এপিলেপটিক ড্রাগ না দিয়ে কেবল তাঁদের মাত্রা স্বাভাবিক করেই খিঁচুনি প্রতিহত করা যায়। এ জন্যই অন্যান্য টেস্টের মতো ব্লাড টেস্টেরও বেশ গুরুত্ব আছে বলে জানান ডা. মো. নাহিদুল ইসলাম।

এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে বা বিশ্বের অনেক দেশেই মৃগীরোগকে কোনো রোগই মনে করা হয় না। অনেক রোগী বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক চিকিৎসায় আসেন না বা সুযোগ পান না। গ্রামাঞ্চলে এমন ঘটনা অনেক বেশি। এ নিয়ে ডা. মো. নাহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারিভাবে যদি এ রোগ নিয়ে প্রচারণা বাড়ানো হয়, সবাইকে যদি বোঝানো যায় যে এটি একটি রোগ, তাহলে মানুষ সচেতন হয়ে চিকিৎসা নেবে। অনেক সময় দেখা যায়, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নববধূর খিঁচুনি দেখা দেওয়ায় ডিভোর্স পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্য জাতীয় এবং অবশ্যই তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন