বিজ্ঞাপন

করোনায় কেমন আছে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা?

বাংলাদেশ যে এ রকম ভয়ংকর মহামারির ভেতর দিয়ে যাবে, এটা সাধারণ মানুষ যেমন বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারেননি চিকিৎসকেরাও। চীনের উহানেও যখন প্রথম এই মহামারির সংক্রমণ ধরা পড়ল, তখনো সেখানের চিকিৎসকেরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিলেন। আর এখন তো কোভিড বাংলাদেশে মোটামুটি একাকার করে দিয়েছে। বয়স, শ্রেণি, পেশা, অবস্থাননির্বিশেষে আক্রান্ত হয়েছেন। শুরুতে আমাদের তেমন প্রস্তুতি ছিল না। চিকিৎসকেরাও শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হয়েছেন। মাস্ক, পিপিপি থেকে হাসপাতালের বেড—সবখানেই ছিল সংকট। আমরা আমেরিকা থেকে মাস্ক নিতাম, যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি জরুরি, তখন তারা মাস্ক রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। কেননা, নিজেদের চাহিদাই মেটাতে পারছিল না তারা। তাই অস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় আমাদের চিকিৎসকদের। পরে ধকল সামলে খানিকটা গুছিয়ে নিয়েছিল। ভ্যাকসিনেশন একটা বড় সুবিধা করেছে। যেহেতু সবার আগে চিকিৎসক, নার্সরা পেয়েছেন। তাই চিকিৎসাকর্মীদের সংক্রমণের হারও কমেছে।

ওষুধ খাওয়া কি ঠিক হবে? কোন ওষুধ খাব?

মানুষ কোনো অসুখে পড়লে আগে ভাবে কী ওষুধ খাওয়া যায়। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে আত্মীয় বা স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছ থেকে ধারণা নিয়ে তারা ওষুধ খায়। তার ভেতর অ্যান্টিম্যালেরিয়াল রিপারপাসিভ ওষুধগুলো রয়েছে। দেদার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে। ডক্সিসাইক্লিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন অন্যতম। মানুষ হাতের কাছে যা পেয়েছে, যেটাতে একটু বিশ্বাস পেয়েছে, তাই খেয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি করোনার ওষুধ নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। আমরাও গবেষণা করেছি। এরপর ডব্লিউএইচও যেটা বলেছে, তার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছি। আমরা ন্যাশনাল গাইডলাইনে স্পষ্ট বলে দিয়েছি, নিজে নিজে কোনো ওষুধ খাবেন না। বেশির ভাগ করোনা রোগী অ্যাসিম্পট্রোমেটিক বা মাইল্ড সিনড্রোম নিয়ে থাকে। বাড়িতে ঠিকঠাক যত্নে থাকলেই সেরে উঠবেন। সেলফ মেডিকেশনের ফলে তারা শুধু শুধু ওষুধ খেয়ে সেই ওষুদের প্রতিক্রিয়ায় জটিলতা বাড়ান।

করোনায় আক্রান্ত হলে কি হার্ট অ্যাটাক হয়?

করোনা হলেই যে হার্ট অ্যাটাক হবে, এমন নয়। তবে হতে পারে। পোস্টকোভিড সিনড্রোমের ক্ষেত্রেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আর এটি এমন একটা ব্যাপার যে সময় খুবই অল্প পাওয়া যায়। খুব অল্প সময়ের ভেতরেই তিনি মারা যান। কোভিড–পরবর্তী একটা গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প কিছু লক্ষণ নিয়ে যারা বাসায় থেকে ট্রিটমেন্ট হয়েছে, তাদের ভেতরেও দেখা গেল ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে হার্টে কোনো না কোনো ক্ষতি করছে। সেটি বড় কোনো অসুবিধা না করলেও ব্যক্তি অল্প শারীরিক পরিশ্রমেই হার্টবিটরেট অনেক বেড়ে যায়, খুব ক্লান্ত লাগে। তাই করোনা হলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। হার্টের বিশেষ যত্ন নিতেই হবে।

রক্ত তরল রাখার ওষুধ খাওয়া কি ঠিক?

করোনা হলে অনেকের শরীরের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। তবে আমাদের শরীর খুবই বিশেষভাবে তৈরি, কোথাও কেটে গেলে যেমন অটোমেটিক রক্ত জমাট বাঁধার ব্যবস্থা আছে, আবার কোথাও রক্ত জমাট বাঁধলে সেখানে সেই জমাট রক্ত গলিয়ে তরল করারও ব্যবস্থা আছে। তাই খুব বেশি আক্রান্ত না হলে রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাওয়ার কোনো দরকার নেই। কেননা, রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেলে যদি ব্রেনে বা পেটে রক্তক্ষরণ হয়, তবে জীবননাশের পর্যন্ত আশঙ্কা থাকে।

নতুন ভেরিয়েন্ট নিয়ে কি আতঙ্কিত হব?

গণমাধ্যমে বিষয়টি দারুণ আলোচিত হয়েছে। পত্রিকা আর টেলিভিশনে শুনে মানুষ কিছুটা বোঝে, বাকিটা কল্পনা করে নেয়। আসলে ভাইরাস নানা কারণে রূপ বদলায়। সহজভাবে বোঝার জন্য বলা যেতে পারে, যুদ্ধের শত্রুকে আঘাত করলে সে তো ঢাল–তলোয়ার ব্যবহার করে। সেগুলোতে কাজ না হলে নতুন কিছু করে। প্রত্যেকেই বাঁচতে চায়। ভাইরাসও তা–ই। সে জন্য ভাইরাস স্পাইক প্রোটিনে কিছু সিকোন্সিয়াল চেঞ্জ করে। এখন আগের ভাইরাসের ক্ষমতা যদি আমি এক ধরি, তাহলে ডেলটা ভেরিয়েন্টের ক্ষেত্রে সেটা ২ দশমিক ২৫ গুণ। তাই আগের চেয়ে সংক্রমণ অনেক বেশি। এ জন্যই বলা হচ্ছে, যিনি ভ্যাকসিন নিচ্ছেন না, তিনি ডেলটা ভেরিয়েন্টের কারখানা। তিনি মাইল্ড, মডারেট, সিভিয়ার, ক্রিটিক্যাল আর ডেথ—যেকোনো সিচুয়েশনই হতে পারে। যিনি টিকা নিয়েছেন, তিনি শতকরা ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে করোনায় আক্রান্ত হলেও মাইল্ড আর মডারেটরে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন না। তাই ঘরে ট্রিটমেন্ট নিয়েই বেঁচে যাচ্ছেন। এখন তো ফাইজার আর মডার্নার টিকা চলছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আমরা আরও দুটো বড় চালান পাব। ভারত নতুন ধরনের ভ্যাকসিন বাজারে আনছে।

একটা টিকা নিয়েছি, আরেকটা টিকা কীভাবে নেব?

অনেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছে। একটা ডোজ দেওয়ার পর টিকা ফুরিয়ে গেছে। আরেকটা দিতে পারেনি। এখন কি টিকার রিমিক্স হবে? এখন রিমিক্স নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। তবে ভ্যাকসিনোলজিস্টরা বলছেন, মিক্স করার কোনো প্রশ্নই আসে না। যে টিকা নেওয়া হয়েছে, ঝুঁকি না নিয়ে সেটিই দেওয়া উচিত। ভারতের কথা ছিল আমাদের অ্যাস্ট্রোজেনেকা দেওয়ার। ওদের অবস্থা এখন চরম খারাপ বলে দিতে পারেনি। তবে বিপদে পড়ে দেরিতে নিলেও ভালো ফল হবে। জাপান থেকে এই ১৩ লাখ মানুষের জন্য ভালো অ্যামাউন্টের অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা আসছে। আপনারা পাবেন। চিন্তার কিছু নেই। খুবই দুঃজনক ঘটনা হলো আমেরিকা অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা ব্যবহার করছে না। কিন্তু তাদের কাছে ৬ কোটি ডোজ টিকা আছে। দিচ্ছে না। এটাই জিওপলিটিকস বা ফার্মাপলিটিকস অব দ্য ওয়ার্ল্ড। আশা করি, সরকার ২০২২ সালের ২৪ কোটি টিকা দিতে পারবে। তখন বাংলাদেশ একটা ভালো অবস্থানে থাকবে। আমেরিকা ৫৩ শতাংশ ও ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ৪৮ শতাংশ টিকা কনজিউম করে। যেটা তাদের হয়তো কখনো লাগে না।

কেননা, এটা এখনো পরীক্ষিত নয় যে টিকাটা কতকাল কার্যকর হবে। সাধারণত টিকা নেওয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হলে যে অ্যান্টিবডি থাকে, সেটা ছয় মাস কার্যকর থাকে। আর করোনায় আক্রান্ত না হলে ৯ মাস থেকে ১ বছর কার্যকর থাকবে। তবে পারসোনাল একটা ইমিউন এস্টিমেশন তৈরি হয়ে থাকে। এই বছর যাঁরা টিকা নিয়েছেন, আগামী বছর যদি আমাদের আবার বুস্টার টিকার দরকার পড়ে তাহলে অন্য টিকাও নেওয়া যাবে।

দেশে করোনার কী অবস্থা, কী করণীয়?

জুন মাসের করোনায় ১ লাখ ১২ হাজার ৭০০–এর বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। আর চলতি জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। এখন আমরা অতিসংক্রমণের মধ্যে আছি। করোনা ঠেকাতে প্রাইমারি প্রিভেনশন খুবই জরুরি। তিনটা কাজ করার আছে। মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, আর হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজ করা। আমরা কেউ এগুলো মানছি না। লকডাউন তুলে নেওয়া হলো। এরপর কী যে হবে আমরা কেউ জানি না। এ মুহূর্তে আমাদের মোটিভেশনাল ওয়ারটা খুবই জরুরি। মসজিদের ইমাম, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, প্রশাসন—তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আছে। তাতে কাজ না হলে কঠোর ব্যবস্থায় যেতে হবে। সৌদি আরবে যেমন, যাদের মাস্ক থুতনিতে, তাদের ১ হাজার রিয়াল জরিমানা। আর যদি মাস্ক না থাকে তাহলে ১০ হাজার রিয়াল জরিমানা। আর কেউ ভ্যাকসিনেটেড, করোনা নেগেটিভ এই সার্টিফিকেট না নিয়ে হজ করতে পারবেন না।

করোনার ভয়াবহতা যদি আমরা মানুষকে বেশি বেশি দেখাতে পারি, তাহলেও হয়তো কমবে। আর ভ্যাকসিনেশনের তো কোনো বিকল্প নেই। ভারতে কেবল ভ্যাকসিন দিয়েই সংক্রমণ ৩ শতাংশ নিচে নিয়ে চলে এসেছে। তাদের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ মানুষ কিন্তু ইতিমধ্যে অন্তত একটি টিকা পেয়ে গেছে। আর আমাদের এখনো ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ। আমাদের কেবল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ পেয়েছেন। ভ্যাকসিন নিলে করোনার প্রকোপ অনেক কমে যাবে।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন