ছবি: প্রথম আলো
ছবি: প্রথম আলো

মহামারি আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে করোনা। লাফিয়ে বেড়ে চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা। ফলে আতঙ্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না সাধারণ মানুষের মন থেকে।

দেশেও ক্রমশ বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ঘন ঘন হাত ধোয়া আর মাস্ক পরার পাশাপাশি একে প্রতিরোধ করার জন্য বাড়াতে হবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি তাঁদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে যাঁরা প্রেশার, ডায়াবেটিস, ফুসফুসের নানা রোগ ও স্থূলতাজনিত সমস্যায় ভুগছেন তাঁদের রয়েছে করোনাজনিত নানা জটিলতায় ভোগার আশঙ্কা। তাই রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম।

বিজ্ঞাপন

এ জন্য রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর কিছু উপায় আমরা অনুসরণ করলে সুফল পেতে পারি। কমাতে পারি করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা।

default-image

১. আমাদের খাদ্যতালিকায় ৬০ শতাংশ থাকা উচিত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, ৩০ শতাংশ প্রোটিন এবং ৫ শতাংশের মতো চর্বিজাতীয় খাবার। অতিরিক্ত শর্করাজাতীয় খাবার শরীরে ফ্যাট বা চর্বিতে রূপান্তরিত হয়। এ ছাড়া স্বল্প পরিমাণে শর্করা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তাই শর্করাজাতীয় খাবার কম খাওয়া নানাভাবেই শরীরের জন্য উপকারী।

২. প্রোটিন শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বাড়ায় ও রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি জোগায়। এই সময়ে শরীর সুস্থ রাখতে উন্নত মানের প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে হবে। ডিম, মাছ, মুরগির মাংস আর ডাল থেকে পেতে পারি প্রয়োজনীয় প্রোটিন। ওমেগা থ্রি ও ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ দিন মাছ খাওয়া বাঞ্ছনীয়।

বিজ্ঞাপন

৩. সবুজ শাকসবজি ও ফলে থাকে ভিটামিন সি ও ই, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। টকজাতীয় যেকোনো ধরনের ফল: লেবু, আমলকী, কমলা, বাতাবিলেবু ও পেয়ারায় ভিটামিন সি আছে। এই ভিটামিন পানির সঙ্গে মিশে যায়। এগুলো শরীরে জমা হয় না। তাই প্রতিদিনই কিছু পরিমাণে ভিটামিন সি–জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দৈনিক ৯০ মিলিগ্রাম এবং নারীর ৮০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি দরকার।

default-image

৪. দুধ ও দই জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার। দুধ ও দই রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। দুধ হজম না হলে দুধের তৈরি খাবার খাওয়া যেতে পারে। দিনে অন্তত ১০০ গ্রাম দই অথবা ১ কাপ দুধ খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। টক দইয়ে বেশ কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া রয়েছে; যা দেহের জীবাণু দূরকরণে সাহায্য করে।

৫. অতিরিক্ত চিনি ও লবণ মেশানো খাবার যথাসম্ভব পরিহার করা উচিত। এ ছাড়া প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, জাঙ্ক ফুড ও তেলে ভাজা খাবার খাওয়া যাবে না।

৬. দৈনিক ৮-১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে। কোমল পানীয় না খাওয়াই শ্রেয়। খেলেও খুবই সামান্য পরিমাণে।

বিজ্ঞাপন

৭. ৮ ঘণ্টা ঘুম আমাদের জন্য পর্যাপ্ত এবং আমাদের রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।

৮. অতিমাত্রায় চা-কফি পান করবেন না। তুলসী চা ও সবুজ চা (গ্রিন–টি) দেহের জন্য দারুণ উপকারী। এগুলো অর্গানিক আর ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের জন্য উপকারী। ক্যালরি অনেক কম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। গ্রিন–টি খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।

default-image

৯. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিন থেকে জানানো হয়েছে, ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়স্ক সুস্থ ও ফিট মানুষের সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি গতিতে বা ৭৫ মিনিট জোর গতিতে অ্যারোবিক ব্যায়াম করা দরকার। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন করতে হবে পেশির শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম।

অ্যারোবিক এক্সারসাইজ বলতে হাঁটা, জগিং, সাইকেল চালানো, স্কিপিং, সাঁতার কাটা ইত্যাদি বোঝায়। এই সময় বাইরে না বেরোতে চাইলে ছাদেই হাঁটুন, স্পট জগিং করুন, স্পট স্কিপিং করুন বা স্ট্যাটিক সাইকেল চালান।

এ ছাড়া সাধ্যমতো জোরে হাঁটলে হার্ট ও ফুসফুসের বেশি উপকার হয়। তাই জোরে হাঁটতে হবে টানা ২০-৩০ মিনিট। টানা না পারলে সকালে ২০ মিনিট ও বিকেলে ২০ মিনিট হাঁটা যেতে পারে। এমন গতিতে আপনাকে হাঁটতে হবে, যাতে হাঁপিয়ে উঠলেও যেন দু-চার কথা বলা যায়, কিন্তু গান গাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

১০. মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও হতাশা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই নিয়মিত মনকে শান্ত রাখা, মন ভালো করার নানা উপায় অবলম্বন করা, এমনকি মেডিটেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানো যেতে পারে।

১১. এ ছাড়া এই সময়ে ধূমপান ও মদ্যপান না করা একান্ত আবশ্যক। পাশাপাশি কোনো ধরনের নেশাজাতীয় সামগ্রী গ্রহণ থেকে বিরত থাকা জরুরি।

default-image

পরিশেষে চিকিৎসক হিসেবে আপনাদের বলতে পারি, সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। তবে আহার হতে হবে পরিমিত। আর অবশ্য জীবনকে নিয়মের নিগড়ে বেঁধে রাখতে হবে। তাহলেই শক্তিশালী হবে আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা; যা পরোক্ষে রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করার পাশাপাশি আমাদের জীবনকে করে তুলবে সুস্থ ও রোগমুক্ত। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলা—এটাই হবে আমাদের রক্ষাকবচ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

মন্তব্য পড়ুন 0