শব্দদূষণ প্রতিরোধ

শব্দদূষণ একধরনের মারাত্মক পরিবেশদূষণ। আমাদের সঠিক অনুধাবনের অভাবে দিন দিন এই দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। অনেক পরিবেশবাদী বাংলাদেশের শব্দদূষণের বর্তমান পর্যায়কে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করেছেন। আর এই ‘শব্দ–সন্ত্রাস’ আমাদের মাথাব্যথার কারণ। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা হলো এসকেএফ নিবেদিত বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আমাদের যত মাথাব্যথা’র পঞ্চম পর্বে।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও স্টামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। আরও ছিলেন রয়েলের ছবি বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনকর্মী মমিনুর রহমান রয়েল। সঞ্চালনায় ছিলেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। অনুষ্ঠানটি ৯ নভেম্বর প্রথম আলো ও এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

default-image

শুরুতেই ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বললেন, ‘শব্দদূষণের মতো সরব ঘাতক আর নেই। সাধারণভাবে আমরা যে শব্দ চাই না, সেটাই শব্দদূষণ। মানুষ ও প্রাণীর শ্রবণসীমা অতিক্রম করে এবং শ্রবণশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সে শব্দকেই শব্দদূষণ হিসেবে জেনে থাকি।’

দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্সের তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। তার অন্যতম প্রধান কারণ শব্দদূষণ। এই দূষণ এখন ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সমন্বিত একটি অংশীদারিমূলক কর্মসূচির আওতায় সারা বাংলাদেশে, বিশেষ করে আটটি বিভাগীয় সদরের শব্দদূষণের পরিমাপ করে। সেখানে দেখা যায়, শব্দদূষণের জন্য মূলত গাড়ির হর্ন সবচেয়ে বেশি দায়ী।

ঢাকা শহরের এমন কোনো রাস্তা পাওয়া যাবে না, যেখানে শব্দের মাত্রা ওই এলাকা বা বাণিজ্যিক এলাকার শব্দের নির্দিষ্ট মাত্রার ভেতরে থাকে। ২০ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা হলেই আমরা সেটি শুনতে পাই। এর কম হলে পারি না। ২০ থেকে ২০০০০ হার্জ পর্যন্ত শব্দ আমরা শুনতে পারব। এর চেয়ে বেশি হলে আমাদের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা (২০০৬) অনুযায়ী, নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্প এলাকা ও মিশ্র এলাকা—এই পাঁচটি জোনে দিন ও রাতে আলাদা করে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকার জন্য দিনের বেলা ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল মাত্রা দেওয়া হয়েছে। শিল্প এলাকায় সর্বোচ্চ ৭০ এবং রাতে ৭৫ ডেসিবেল মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের কোথাও এই মাত্রা মেনে চলা হয় না, শব্দ সব জায়গায় এই মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

শব্দদূষণ প্রতিরোধ নিয়ে একটি ক্যাম্পেইন করছেন মমিনুর রহমান রয়েল। অনুষ্ঠানে নিজের ক্যাম্পেইনের অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেন। তাঁর ক্যাম্পেইনের স্লোগান, ‘হর্ন হুদাই বাজায় ভোদাই’। প্রমিত বাংলায়, ‘বোকারাই অকারণে হর্ন বাজায়’। প্রচণ্ড শব্দের বিরুদ্ধে মমিনুর রহমান রয়েল প্রতিবাদ করেছেন একেবারে কোনো শব্দ না করে। অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি যেমন হয়েছেন, তেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও পেয়েছেন।

default-image

যখন কোনো অ্যাকটিভিস্ট পরিবেশবিষয়ক আন্দোলন করেন, তখন তাঁদের তথ্য–উপাত্তের দরকার হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে গবেষণা হয়, তাতে যদি পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনের তথ্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে মানুষকে সচেতন করা সহজ হবে। এ লক্ষ্যে স্টামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ঢাকা শহরের ৭০টি এলাকায় প্রতিনিয়ত শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে এই তথ্য-উপাত্ত মানুষকে জানিয়ে সচেতন করা হয় বলে জানান ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। এর সুফলও পাওয়া গেছে বলেও তাঁর অভিমত।

ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছর ডিসেম্বরে সচিবালয় এলাকাকে শব্দদূষণমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও মন্ত্রণালয়গুলো চিন্তা করছে, ঢাকা শহরের শব্দের পরিমাণ এত বেশি যে কয়েকটি এলাকাকে প্রতীকী হিসেবে হর্নমুক্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করছে, যাতে সবাই সচেতন হয়। তবে কোনো এলাকাকে ‘নো হর্ন জোন’ হিসেবে ঘোষণা করার আগে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সবাইকে জানানোর জন্য আরও বেশি প্রচার–প্রচারণা চালাতে হবে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।

ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার আরও বলেন, ইদানীং বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় সামাজিক অনুষ্ঠানের নামে অযাচিত মাইক ও সাউন্ডবক্স বাজানো হয়। খুব দুঃখজনক এই যে জনপ্রতিনিধিরাও প্রচারণার কাজে শব্দদূষণের মাত্রা অতিক্রম করেন। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সারা দেশে ২০ শতাংশ মানুষ বধিরতায় আক্রান্ত। আর ২০ শতাংশে ভেতর প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। আর যারা ট্রাফিক পুলিশ, তাদের ১১ শতাংশের শ্রবণ সমস্যা আছে।

default-image

একটি রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ঢাকা শহরের ৬১ শতাংশ মানুষ শব্দদূষণের জন্য হতাশা ও উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এসব ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে সচেতনতার পাশাপাশি সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই। ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘এ জন্য আমাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল হতে হবে। যেখানে–সেখানে অযথা হর্ন বাজানো যাবে না, হাইড্রোলিক হর্ন পরিহার করতে হবে, সামাজিক অনুষ্ঠানে বেশি জোরে গান বা বাজনা বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে।’ তাহলেই শব্দদূষণের পরিমাণ অনেক কমে আসবে বলে মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ।

মন্তব্য পড়ুন 0