default-image

রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া খুবই পরিচিত সমস্যা। নারী ও শিশুদের এ সমস্যা বেশি হয়। আয়রনের ঘাটতির কারণেই মূলত এমনটা হয়। তবে শুধু রক্তশূন্যতাই নয়, আয়রনের ঘাটতির কারণে শিশুর মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ মানে বয়স অনুসারে শারীরিক বৃদ্ধির সঙ্গে মেধা, বুদ্ধি, আচার–আচরণ, কর্মদক্ষতা ইত্যাদির যথাযথ বিকাশও হতে হবে।

মেধা বা মননের এ বিকাশের প্রধান নির্ধারক হলো মস্তিষ্ক। শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময়েই একজন মানুষের কর্মদীপ্ত মস্তিষ্কের ভিত গড়ে ওঠে। তাই বাড়ন্ত শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য দরকার উন্নতমানের পুষ্টি, বিশেষ করে আয়রন ও আয়োডিনসমৃদ্ধ খাবার। আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে। হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে মস্তিষ্কসহ শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছায় এবং কোষের জন্য নির্ধারিত কার্যক্রম গতিশীল রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে রক্তের এ উপাদান কোষে তৈরি বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসও শরীর থেকে বের করে দিতেও মুখ্য ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া মস্তিষ্কের কোষের ভেতরে নানাবিধ কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এ আয়রন।

আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতায় ভোগা শিশু নানা স্নায়বিক ও আচরণগত জটিলতায় ভোগে। যেমন ক্ষুধামান্দ্য, মেধার বিকাশ, বুদ্ধিমত্তা ও মনঃসংযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়া। আয়রনের ঘাটতি থাকলে হঠাৎ দমবন্ধ করা অনুভূতি হতে পারে, খিঁচুনির ঝুঁকি বাড়ে। শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়, ঘুম কম হয়। অনেকে আবর্জনা যেমন দেয়ালের প্লাস্টার, জুতা, স্যান্ডেল বা ময়লা খায়।

বিজ্ঞাপন

যেসব শিশুর আয়রন ঘাটতির ঝুঁকি বেশি

■ নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মালে অথবা কম ওজন নিয়ে জন্মালে।

■ শিশুর জন্মের সময় মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে।

■ শিশুর নাড়ি জন্মের পর খুব দ্রুতই (৩০ সেকেন্ডের মধ্যে) কেটে ফেলা হলে।

■ মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত শিশু। কারণ, মায়ের দুধের আয়রন গরুর বা অন্য দুধের আয়রনের তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি রক্তে শোষিত হয়।

■ শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পরপরই বুকের দুধের পরিবর্তে নিয়মিতভাবে গরুর দুধ, ছাগলের দুধ, টিনের দুধ ইত্যাদি খাওয়ালে।

■ যাদের নিয়মিতভাবে আয়রনহীন খাবার যেমন সুজি, চালের গুঁড়া, বার্লি বা টিনজাত শিশু খাদ্য খাওয়ানো হয়।

■ যেসব শিশু দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়ায় বা ক্রিমির সংক্রমণে ভোগে।

করণীয়

● জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের দুধ দিতে হবে। বুকের দুধে আয়রনের মাত্রা ধরে রাখতে মাকেও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

● নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়া ও কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুর দেড় মাস বয়স থেকে অতিরিক্ত আয়রন দিতে হবে। এ ছাড়া যেসব শিশুর আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাদেরও আয়রন দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

● শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পরও বুকের দুধ অব্যাহত রাখতে হবে। এর সঙ্গে তাকে বাড়িতে তৈরি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন মাংস, লিভার, কিডনি, ডিমের কুসুম, মাছ, শাকসবজি, ডাল, বিনস, মটরশুঁটি, পাকা কলা, কাঁচা কলা, কচুর তরকারি, লালশাক, পালংশাক, মাশরুম, ব্রকলি ইত্যাদি ধীরে ধীরে খাওয়ানো শুরু করতে হবে।

● অনেকে মনে করেন, সন্তান প্রসবের ছয় মাস পর মায়ের দুধ কমে যায়। এ কারণে তাঁরা এ সময়ের পর শিশুকে গরুর বা টিনের দুধ দিতে চান। এ ভাবনাটা নিতান্তই ভুল।


অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা, বিভাগীয় প্রধান, শিশুরোগ বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0