শৃঙ্খলায় স্বস্তি

১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য নিয়ে এসকেএফ ও প্রথম আলো আয়োজিত অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. এম সাইফুদ্দিন, সহকারী অধ্যাপক (এন্ডোক্রাইনোলজি) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ডানে) ও ডা. এ বি এম কামরুল হাসান, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (এন্ডোক্রাইনোলজি) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (বামে)। সঞ্চালক ছিলেন ডা. বিলকিস ফাতেমা।

অনুষ্ঠানটি প্রথম আলো ও এসকেএফের ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।

default-image

ডা. এম সাইফুদ্দিন বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস সম্পর্কে বলেন, এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য: ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নার্সের ভূমিকা অপরিসীম।

‘একজন রোগী কখন ডায়াবেটিস চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?’ সঞ্চালকের এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. এ বি এম কামরুল হাসান জানান, আমাদের দেশে টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। টাইপ ২ রোগীর সংখ্যা বেশি। এই সমস্যার তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। সাধারণত কোনো কারণে রক্ত পরীক্ষা করাতে গিয়ে এ রোগ নির্ণীত হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, এর বাইরে উপসর্গ হিসেবে দেখা যায় ওজন কমে যাওয়া এবং বারবার প্রস্রাবের বেগ। বিশেষ করে রাতে। এ ধরনের কোনো কিছুর সম্মুখীন হলে এবং পরীক্ষায় ডায়াবেটিস নির্ণীত হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
ডা. এম সাইফুদ্দিন ডায়াবেটিস রোগীর জরুরি অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ‘এ ধরনের রোগীর মধ্যে হাইপোগ্লাইসোমিয়া অর্থাৎ সুগার লেভেল কমে যাওয়া একটি জরুরি অবস্থা। রক্তে সুগার লেভেল ৩.৯-এর নিচে নেমে যাওয়াকে হাইপোগ্লাইসোমিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এর লক্ষণ বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা ঘেমে যাওয়া এবং দুর্বল অনুভূত হওয়া।

আবার ইমারজেন্সি হাইপারগ্লাইসেমিক হলে সুগার লেভেল ৩০-এর ওপরে চলে যায়। এর লক্ষণ জ্ঞান হারানো, বমি এবং শারীরিক দুর্বলতা। ডায়াবেটিসের রোগীদের মনে রাখতে হবে সুগার লেভেল ব্যালেন্স এই অসুখে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট মাত্রার সুগার লেভেল তাই ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে এবং ইমারজেন্সিতে প্রাথমিকভাবে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সে সম্পর্কে রোগীর আত্মীয়স্বজনকে সচেতন থাকতে হবে।

ডা. এ বি এম কামরুল হাসান বলেন, ডায়াবেটিস মূলত একটি কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ। রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে রক্তনালির ওপর বিরূপ প্রভাব তৈরি করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রোগীর রক্তনালি আক্রান্ত হতে পারে। ডায়াবেটিস উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলস্টেরলকে প্রভাবিত করে। আক্রান্তের পরিমাণ বাড়ে। উচ্চ রক্তচাপ আর ডায়বেটিসের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, অন্যদিকে কোলস্টেরলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে। কারণ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা কোনো না কোনোভাবে লিপিড অ্যাবনরমালিটি বা কোলস্টেরলজনিত সমস্যায় ভোগেন।

ডা. এম সাইফুদ্দিন গর্ভবতীর ডায়াবেটিস পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ‘এ সময়ে দুই ধরনের ডায়াবেটিস হতে পারে। গর্ভবতী নারী আগে থেকেই আক্রান্ত থাকতে পারেন, যা তিনি যথাযথভাবে পরীক্ষা না করানোর কারণে জানতেন না; অথবা গর্ভকালেও আক্রান্ত হতে পারেন। এ সময়ে ওরাল চিকিৎসা না দিয়ে ইনসুলিন প্রেসক্রাইব করে থাকি। কারণ এটি তুলনামূলক নিরাপদ।

একজন গর্ভবতী নারী এবং তাঁর পরিবারের অবশ্যই জানতে হবে এ সময়ে খালি পেটে সুগার লেভেল ৫.৩ এবং খাওয়ার পরে ৬.৭ স্বাভাবিক। এ সময়ে ব্যায়ামের ক্ষেত্রে ভারী কোনো কিছু বেছে নেওয়া যাবে না। ডায়েটের দিকে মনোযোগী হতে হবে। ডেলিভারির পরপর বাচ্চার সুগার লেভেল পরীক্ষা করতে হবে। কারণ অনেক সময় শিশুকেও আক্রান্ত হতে দেখা যায়।’

করোনার সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক ভালো নয় বলেই মন্তব্য করেন ডা. এ বি এম কামরুল হাসান।

ডা. এম সাইফুদ্দিন বর্তমান সময়ের উন্নত চিকিৎসা সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন আধুনিক ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। মুখে খাওয়ার ওষুধ এবং ইনসুলিন—দুই ক্ষেত্রেই চিকিৎসার আধুনিকতা দেখা যাচ্ছে। ইনসুলিন পাম্প এ ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক। সব আধুনিক চিকিৎসাই এখন বাংলাদেশে সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

কিটো ডায়েট সম্পর্কে ডা. এম সাইফুদ্দিন বলেন, ‘একটি গবেষণায় দেখা যায় কিটো ডায়েটের মতো লো কার্ব-হাই প্রোটিন ডায়েটে দ্রুত ওজন কমলেও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।’ এ সম্পর্কে ডা. এ বি এম কামরুল হাসান যোগ করেন, বর্তমান সময়ে ডায়াবেটিসের রোগীদের মধ্যে কিটো ডায়েট বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু কিটো ডায়েটের পুষ্টিগুণ হিসেবে এটি কোনো ব্যালেন্স ডায়েট নয়। একজন ডায়াবেটিসের রোগীকে অবশ্যই ব্যালেন্স ডায়েট মেনে চলতে হবে। সব ধরনের পুষ্টিগুণ নির্দিষ্ট পরিমাণে গ্রহণ করা দরকার। মনে রাখতে হবে, ভুল ডায়েটে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। তাই, চিকিৎসকের পরামর্শের বাইরে কোনোভাবেই কিটো ডায়েট গ্রহণ করা উচিত নয়।

দর্শকের প্রশ্নের উত্তরে ডা. এ বি এম কামরুল হাসান বলেন, একজন তরুণ রোগীর চিকিৎসায় মুখে খাওয়ার ওষুধ অথবা ইনসুলিন ব্যবহারে ক্ষেত্রে চিকিৎসা নির্ভর করবে শারীরিক অবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রার ওপর।
ডা. এম সাইফুদ্দিন বলেন, ‘এশিয়াতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশেও এই ঝুঁকির মাত্রা অনেক। ২০ বছরের পর থেকে এ বিষয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। এর বাইরে ওবেসিটি অথবা পারিবারিক ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে আরও আগে থেকেই সচেতন হতে হবে।

দর্শকদের উদ্দেশে ডা. এম সাইফুদ্দিন বলেন, বর্তমানে ডায়াবেটিসের সর্বাধুনিক চিকিৎসা আমাদের দেশেই সম্ভব। আবার সারা দেশেই রয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণে উদ্যোগী হতে হবে।

ডা. এ বি এম কামরুল হাসান বলেন, ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা জরুরি। কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শের বাইরে মেডিসিন গ্রহণ বন্ধ করা যাবে না। ডায়েটে ব্যালেন্স রাখতে হবে। শারীরিক ব্যায়াম করতে হবে এবং সঠিক মাত্রায় ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0