default-image

মানবদেহে মোট হাড়ের সংখ্যা ২০৬। হাড়ের অন্যতম একটি সমস্যা ডিস্ক সরে যাওয়া বা স্থানচ্যুতি। আমাদের দেশে বহু মানুষ এ অসুখে ভুগছেন। সাধারণত কর্মক্ষম মানুষের শরীরে ডিস্ক স্থানচ্যুতির সমস্যা বেশি হয়ে থাকে।

প্রথম আলো ও উইমেনস হরলিকসের স্বাস্থ্যবিষয়ক যৌথ আয়োজন ‘সুস্থ হাড় সুস্থ জীবন’-এর প্রথম পর্বে আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞ ছিলেন ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক ছিলেন ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস।

অনুষ্ঠানটি ২৯ অক্টোবর প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রচারিত হয় উইমেনস হরলিকসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও।

বিজ্ঞাপন

ডিস্ক স্থানচ্যুতিবিষয়ক সমস্যা এবং তার সমাধান নিয়ে আলোচনার শুরুতেই ডিস্ক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, মানবদেহের মেরুদণ্ডের ৩৩টি কশেরুকার দুটি হাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় চাকতি আকৃতির অংশকে ডিস্ক বলা হয়। ডিস্কের বাইরের অংশে শক্ত পর্দা থাকলেও ভেতরের অংশ হয় নরম জেলির মতো। মেরুদণ্ডের পেছনেই থাকে স্পাইনাল কর্ড বা স্নায়ু রজ্জু। বাহ্যিক কোনো কারণে শরীরের এই ডিস্ক কখনো পেছনের দিকে সরে এলে ডিস্কের স্থানচ্যুতি ঘটে থাকে।

রোগীদের বয়স সম্পর্কে ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, সাধারণত কর্মক্ষম লোকের এ সমস্যা হয়ে থাকে। ১৫ থেকে ৫০-এর মধ্যে বয়স যাঁদের, তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, ডিস্ক স্থানচ্যুতির পেছনে বেশির ভাগ সময়েই নির্দিষ্ট কারণ থাকে। যেমন: মেঝে থেকে ভারী কিছু তুলতে গিয়ে একধরনের ব্যথা অনুভূত হওয়া। শারীরিক ভঙ্গির কারণে ডিস্ক স্থানচ্যুতির কারণে এ ধরনের ব্যথা হয়ে থাকে, যা কোমর থেকে তা পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর বাইরে আরও একটি কারণ বলা যায়, ডিস্কচ্যুতি রোগীর একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় মোটরসাইকেল চালান। এসব কারণ ছাড়াও রোগী আক্রান্ত হতে পারেন।

রোগীর দেহে এ সমস্যা নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে ক্লিনিক্যাল কিছু পরীক্ষা করে রোগীর দেহে ডিস্ক স্থানচ্যুতি বিষয়ে ধারণা নেওয়া হয়। তারপর কোমরের এক্স-রে এবং এমআরআইয়ের রিপোর্টের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন ডাক্তাররা।

চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, ‘দুই ধরনের চিকিৎসা রয়েছে—কনজারভেটিভ ও অপারেশন। অর্থাৎ অপারেশন না করে চিকিৎসা এবং অপারেশন করে চিকিৎসা। প্রথমেই আমরা কমপ্লিট বেড রেস্ট করতে বলি। এ এর সঙ্গে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়। মাসল রিলাক্সেশন ও নিউরোপ্যাথিক পেইন কমানোর ওষুধ। ৭ থেকে ১৪ দিনের বেড রেস্ট এবং ওষুধ সেবনের পরে রোগীর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে পরবর্তী চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

কনজারভেটিভ চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, হাত–পায়ে দুর্বলতা এলে দ্রুতই পরবর্তী চিকিৎসা হিসেবে সার্জারি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর রোগীর যদি প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম, যেমন প্রস্রাব, পায়খানা বাধাগ্রস্ত হয় বা এসবের অনুভূতি বুঝতে না পারেন, তাহলে দ্রুত অপারেশন করতে হবে।

মেয়েদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করেন। এ বিষয়ে এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, হাতে অথবা পায়ে এ সমস্যা হলে এই অঙ্গগুলোয় দুর্বলতা অনুভূত হয়, যেমন অবশ ভাব ও শক্তি কম। এ ক্ষেত্রে অনুভূতির তীব্রতা কমতে পারে, আবার শিরশিরে অনুভূতিও হতে পারে। দেরি করে চিকিৎসা শুরু করলে অপারেশনের মধ্যমে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নাও হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রবাসীদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যার কথা শোনা যায়। তাঁদের উদ্দেশ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, যেহেতু এ সমস্যার আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া যায় না, তাই ফিটনেস সব সময়েই ধরে রাখতে হবে। কোমর ভাঁজ করে কাজ করা অথবা মেঝে থেকে কোনো কিছু তোলার অভ্যাসের কারণে এ সমস্যা হতে পারে। এ ধরনের পজিশন ক্ষতিকর। তাই এসব অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি রোগাক্রান্তের চিকিৎসা সম্পর্কে ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, ডায়াবেটিস, কিডনি, হাইপারটেনশন ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এদের ব্যথার ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। ব্যাক ম্যাসাজ এক্সারসাইজের মতো ফিজিওথেরাপি দিতে হবে। ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ কোমর ব্যথায় ভোগে, কিন্তু ১০ থেকে ১৫ শতাংশের অপারেশন দরকার হয়। তবে ওষুধ সেবনে শরীরে সমস্যা হলে অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে ভাবা যেতে পারে।

কোমরের ব্যথায় আক্রান্ত রোগীদের উদ্দ্যেশে ডা. এ কে এম খালেকুজ্জামান বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ব্যথানাশক ওষুধ কোনোভাবেই সেবন করা যাবে না। কেননা, এর কারণে কিডনি–আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর বাইরে স্টেরয়েড ব্যবহারের ফলে শরীরের হাড় নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

মন্তব্য পড়ুন 0