default-image

বিশ্বব্যাপী অক্টোবর মাসকে স্তন ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। এই লক্ষ্যে এসকেএফ নিবেদিত ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে অতিথি হিসেবে ছিলেন মহাখালী জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার। এ পর্বের আলোচ্য বিষয় ছিল স্তন ক্যানসার।
অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এবং এসকেএফের ফেসবুক পেজে সম্প্রচারিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ডা. মো. শাহরিয়ার ইসলাম।

ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যানসার নারীদের এক নম্বর ক্যানসার। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত প্রতি ৪ জন নারীর মধ্যে ১ জন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। এটি নারীদের মধ্যে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর পঞ্চম কারণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। ২০ বছর বয়সের নিচে এর তেমন কোনো ঝুঁকি থাকে না।

বর্তমানে পৃথিবীর সব দেশেই স্তন ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে বলে উল্লেখ করে ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, সব দেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার এবং মৃত্যুর হার এক নয়। উন্নত দেশগুলোতে স্তন ক্যানসারের হার অনেক বেশি হলেও মৃত্যুর হার অনেক কম।

বিজ্ঞাপন

ডা. পারভীন শাহিদা আখতার অবগত করেন, আন্তর্জাতিক স্তন ক্যানসার সচেতনতার রং হলো গোলাপি। সার্বিকভাবে ২০০৮ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর যে সংখ্যা ছিল, তা ২০১২ সালে এসে ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই, ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৬৪ শতাংশ।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে ৯০ থেকে ১১৫ জন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। আবার বাংলাদেশ বা আমাদের কাছাকাছি দেশগুলোতে দেখা গেছে, প্রতি লাখে ১৯ জন বা ২০ জন আক্রান্ত হচ্ছেন, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। কিন্তু তা আগের তুলনায় অনেক বেশি।

উন্নত দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর হার অনেক কম। কারণ, স্ক্রিনিং পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে ৬০ শতাংশের বেশি রোগীর প্রাথমিক পর্যায়েই স্তন ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এতে ৯৯-১০০ শতাংশ রোগ নিরাময় করা যায়। আমাদের দেশের মানুষ এখনো এ বিষয়ে তেমন সচেতন নয়, তাই বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে তাঁরা চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন। এ কারণে আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার নির্ণয়ের হার ৫ শতাংশের নিচে। তাই স্তন ক্যানসার নিরাময়ের হারও অনেক কম। এর পেছনে পারিবারিক সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, চিকিৎসার অপ্রতুলতা ইত্যাদি নানা কারণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ডা. পারভীন শাহিদা আখতার।

বিজ্ঞাপন

ডা. পারভীন শাহিদা আখতার আরও বলেন, একেবারে শুরুর দিকে স্তন ক্যানসারের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা দেয় না। এ জন্যই বেশির ভাগ রোগীই লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আসেন। প্রায় শতভাগ রোগীই আসেন যে উপসর্গ নিয়ে তা হলো, স্তনে বা বগলে চাকা অনুভব করা এবং এসব রোগী কিন্তু লক্ষণ দেখামাত্রই চিকিৎসকের কাছে আসেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ৩ মাস থেকে ৫ বছর অপেক্ষা করে চিকিৎসা নিতে আসেন। গড়ে তাঁরা প্রায় ১৮ মাস দেরি করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে স্তনে চাকা অনুভূত হওয়ার সঙ্গে ব্যথাও অনুভূত হলে কিংবা শুধু ব্যথা অনুভূত হলেই রোগীরা স্তন ক্যানসার পরীক্ষা করাতে আসেন। অর্থাৎ ব্যথা না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা বিষয়টিকে তেমন আমলে নেন না বলে জানান তিনি।

default-image

তাই স্তনে শুধু চাকা অনুভব করলেই দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, আরেকটি উপসর্গ হলো স্তনের আকার-আকৃতির পরিবর্তন হওয়া। এ ক্ষেত্রে স্তনবিন্দু দেবে যায় কিংবা স্তনের নিপল থেকে পানির মতো তরল বা রক্তক্ষরণ কিংবা হলুদ রঙের তরল ঝরতে পারে। আবার স্তনের আশপাশে ক্ষত কিংবা স্তনের রং লালচে হয়ে যায় কিংবা স্তনের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এসব লক্ষণ থাকলেই যে ক্যানসার নিশ্চিত তা নয়, তবে লক্ষণ দেখামাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ডা. পারভীন শাহিদা আখতার মনে করেন, নারীদের ২০ বছর বয়স থেকেই সচেতন হতে হবে এবং নিয়মিত নিজেকে নিজে পরীক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ২০-৩৯ বছর বয়সী নারীদের প্রতি ২ থেকে ৩ বছরে একবার দক্ষ চিকিৎসক দ্বারা স্তন ক্যানসার পরীক্ষা করানো উচিত। আর বয়স ৪০ বছর হয়ে গেলে প্রতিবছরে একবার চিকিৎসক দ্বারা এবং প্রতি মাসে একবার নিজেকে নিজে পরীক্ষা করতে হবে।

ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সূত্রেও স্তন ক্যানসার হয়ে থাকে এবং পরিবারের কারও স্তন ক্যানসার থাকলে তাঁর আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তখন আমরা স্থূলতা কমানোর এবং হালকা ব্যায়াম কিংবা খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। তাই সার্বিক বিবেচনায় স্তন ক্যানসার নির্মূলে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

মন্তব্য পড়ুন 0