বিজ্ঞাপন

একটা সময় ছিল যখন হৃদ্‌রোগীদের প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকেরা লিখে দিতেন, চর্বিজাতীয় খাবার ও গরু–খাসির মাংস খাওয়া যাবে না। শুধু এই কয়েকটি খাবার না খেলেই যে তাঁরা ভালো থাকতে পারবেন, বিষয়টি কিন্তু তা নয়। একটি মায়োকার্ডিয়াক ইনফ্রাকশন বা হার্ট অ্যাটাকের পর একজন রোগীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুষ্টি। এ সময় অপুষ্টিজনিত সমস্যা যেন না হয়, অন্যান্য অঙ্গ যেন ঠিক থাকে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ভবিষ্যতে আরেকটি হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোনো হার্ট ডিজিজ প্রতিরোধ করতে পারেন, সে জন্যই একজন রোগীকে একটি খাদ্যব্যবস্থা বা ডায়েটের ভেতর থাকতে হয়। সেই সঙ্গে পুরো জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে হয়।

তাই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর একজন রোগীর কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন করতে হয়। এই পুনর্বাসনের সময় রোগীর সঠিক খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ও ফিজিওথেরাপি, ওষুধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে কাউন্সেলিং—এসবের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা হয়। এ জন্য বর্তমানে অনেক হৃদ্‌রোগী নিজের বা পরিবারের সদস্যদের আগ্রহে এবং চিকিৎসকের পরামর্শে পুষ্টিবিদের কাছে যাচ্ছেন।

সব হৃদ্‌রোগীর ডায়েট কিন্তু এক রকম হয় না। এই ডায়েট নির্ভর করে রোগীর ওজন, বিএমআই, রক্তে চিনি ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ, বয়স, লিঙ্গ, খাদ্যাভ্যাস (মাংসভোজী বা নিরামিষাশী), খাবার চিবিয়ে খাওয়ার ক্ষমতা—এসবের ওপর। এ সবকিছু মূল্যায়ন করেই ডায়েট প্ল্যান ঠিক করতে হয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ।

হৃদ্‌রোগীদের জন্য ডায়েটের পাশাপাশি কাউন্সেলিং খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো বাড়িতে কেউ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে সেই বাড়ির সবার মনমানসিকতার পরিবর্তন হয়। তাঁরা সবাই আতঙ্কে থাকেন। এ জন্য পুষ্টিবিদদের শুধু রোগীকেই নয়, তাঁর পরিবারের সব সদস্যকেই কাউন্সেলিং করতে হয়।

default-image

বাংলাদেশে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে পুষ্টিবিদের কাছে যাওয়া হৃদ্‌রোগীদের পরিমাণ আগের থেকে অনেক বেড়েছে। কিন্তু এমন অনেক রোগীই আছেন, যাঁরা খাদ্যাভ্যাসের জন্য শুধু চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করে থাকেন। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু খাবার যেমন লাল মাংস, ডিমের কুসুম, লবণ খাওয়া যাবে না। এসব মেনে অনেক রোগী কিন্তু আবার অন্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

যেমন অনেক রোগীর শরীরে ভিটামিন ডি বা জিঙ্কের অভাব থাকে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। তাঁরা যদি ডিম, দুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন, তাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই কিন্তু বেশি হয়। দুধ খাওয়া বন্ধ করলে অনেক বয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। আবার অনেক রোগীকে চিকিৎসক লবণ খেতে নিষেধ করেন। শরীরে লবণেরও কিন্তু প্রয়োজন আছে। এর অভাবে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যায়। ফলে রোগী হাইপোনেট্রিমিয়া নামের জটিল রোগে আক্রান্ত হন। আর হৃদ্‌রোগীদের ভেতর এই রোগ বেশি দেখা যায়। একেবারে বন্ধ না করে নির্দিষ্ট পরিমাণে লবণ খেলে হৃদ্‌রোগীর কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। রান্নায় কতটুকু লবণ খাওয়া যাবে, সেটি একজন পুষ্টিবিদ রোগীর ইলেকট্রোলাইট রিপোর্ট দেখে ঠিক করে দিতে পারেন।

অনুষ্ঠানে হার্ট সার্জারি হওয়ার পরে একজন রোগীর খাদ্যাভ্যাস কেমন হয়, তা নিয়েও আলোচনা হয়। হার্ট সার্জারির পরবর্তী ছয় সপ্তাহকে ‘সেনসিটিভ পিরিয়ড’ হিসেবে ধরা হয়। এ সময়ে খাদ্যব্যবস্থা সংগত কারণেই অন্য সময়ের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এ সময় নরম এবং সহজে হজমযোগ্য খাবার খেতে হয়।

যেমন নরম গলা ভাত, নরম রুটি। নরম রুটি নিয়ে বলতে গিয়ে বিশেষজ্ঞ পাউরুটি খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিলেন। অনেকেই ভাবেন, পাউরুটি যেহেতু নরম, তাহলে এটি খাওয়া যাবে। এ সময় কোনোভাবেই রোগীকে বেকারির খাবার দেওয়া যাবে না। এ সময়ের খাদ্যাভ্যাসও অন্যান্য সময়ের মতো রোগীর ওজন, রক্তের চাপ—এসবের ওপর নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ। যেমন প্রতি কেজি ওজনের সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ গুণ করে যতটুকু কিলোক্যালরি হয়, রোগীকে সেই পরিমাণের খাবারের একটি ডায়েট চার্ট করে দেওয়া হয়। ছয় সপ্তাহ পর রোগী স্বাভাবিক টেক্সচারের খাবার খেতে পারবেন।

আর রোগী বাইরে যাওয়া শুরু করলে খাবারের কিলোক্যালরির মাত্রা বাড়ানো হয়। এ সময় দিনে মোট ছয়বার খাবার খেতে বলা হয়। রাতের খাবার আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে শেষ করতে হবে। রাতে ঘুমানোর আগে লো ফ্যাট দুধ খেতে হবে। এ ছাড়া সকাল ও দুপুরের খাবারের সঙ্গে তিনটি ‘মিড মিল’ করতে বলা হয়। এ সময় হৃদ্‌রোগীদের জন্য হালকা ফলমূল, টক দই, সবুজ চা ইত্যাদি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরীর কাছ থেকে আরও জানা গেল, নারী–পুরুষভেদেও হৃদ্‌রোগীদের খাদ্যব্যবস্থা শুধু ওজন হিসেবে ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে যেহেতু আমাদের দেশে বেশির ভাগ মহিলাই রক্তস্বল্পতায় ভোগে, সেহেতু অল্প বয়সী নারীর আয়রন হিমোগ্লোবিন এবং পেশার কথাটিও মাথায় রেখেই ডায়েট চার্ট করা হয়। ক্যালরির মাপ পুরুষের তুলনায় মহিলাদের কম হয়। তবে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম বা অন্যান্য খনিজের পরিমাণ নারী–পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে ওজন অনুযায়ী ঠিক করা হয়। আবার কিছু খাবার আছে, যেটা সবার জন্যই সমান। যেমন খাবারে লবণ বা তেলের পরিমাণ।

default-image

বংশগত কারণেও কিন্তু হৃদ্‌রোগ হয়ে থাকে। তবে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। একটি পরিবারের কোনো সদস্যের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থেকে থাকে, তাহলে সে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিজেদের খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। এটি শুধু বড়দের জন্যই নয়, ছোটদের জন্যও বটে। ছোটবেলা থেকে কেউ যদি কাঁচা লবণ, ফাস্ট ফুড, বাইরের চা-কফি, কার্বনেটেড বেভারেজ, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ বেশি করে খায়, তাহলে তার হৃদ্‌রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। এ জন্য বিশেষজ্ঞরা ছোটবেলা থেকেই হৃদ্‌বান্ধব সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে বলেছেন।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন