default-image
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নুভিস তা ফার্মা নিবেদিত প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন ‘নারী–নক্ষত্র’।  চিকিৎসক শ্রাবণ্য তৌহিদার সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে অতিথি ছিলেন ওজিএসবির সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম।

default-image

অনেকেই প্রশ্ন করেন, পুরুষ দিবস তো পালিত হচ্ছে না, তাহলে নারী দিবস কেন পালিত হবে? চিকিৎসক রওশন আরা বেগম বলেন, শারীরিক কাঠামোর কারণে নারীরা পুরুষের তুলনায় একটু কোমল কিন্তু সে জন্ম নেয় মানুষ হিসেবেই। এ কারণেই বুদ্ধিবৃত্তিক সব কাজে নারী সব সময় পুরুষের সমকক্ষ। শারীরিক কাঠামোর কারণে নারীকে পদে পদে বঞ্চিত হতে হয়। এই বঞ্চনা ও নানা ধরনের কটূক্তি থেকে রক্ষা পেতে এবং মানুষ হিসেবে জন্মসূত্রে পাওয়া সব অধিকার নিশ্চিত করতেই নারী দিবস করা প্রয়োজন।

নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে নারীকেই প্রশ্ন করতে হবে বলে মনে করেন ডা. রওশন আরা বেগম। ছেলে ও মেয়ের সমাজের সব অধিকার নিয়ে জন্মায়। কিন্তু বাবা–মায়েরা ছোট থেকেই ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে বৈষম্য করতে থাকেন। ছেলেদের চলাফেরায়, ঘোরাফেরায় বাধা থাকে না কিন্তু মেয়েদের পদে পদে নিষেধ দেওয়া হয়। তাই প্রশ্নের শুরুটা হতে হবে পরিবার থেকে। সব মেয়ের উচিত বৈষম্য টের পেলেই অভিভাবকদের সরাসরি প্রশ্ন করা। রওশন স্মৃতিচারণা করে বলেন, তাঁর বিয়ের সময় তাঁর বাবা শ্বশুরবাড়ির মানুষকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, আমার মেয়েকে কেন বিয়ে করাচ্ছেন? ও কিন্তু রাতবিরাতে বের হয়ে যাবে। ছেলেদের সঙ্গে কাজ করবে। তখন যেন আমার মেয়েকে নিয়ে কোনো প্রকার অভিযোগ বা কটূক্তি না শুনি। মা–বাবা যদি এভাবে চিন্তা করেন, মেয়েদের পথচলা সহজ হয়ে যায়। যেমন বিয়ের সময় ছেলের হাতে মেয়ের হাত তুলে দেওয়ার পর্বকে বলে কন্যাদান। তাঁর প্রশ্ন, মেয়েকে দান করতে হবে কেন? হাত ধরে দুজন একসঙ্গে পথ চলবে। এই ছোট ছোট পরিবর্তনই নারীর অধিকার রক্ষায় একসময় বিরাট সাফল্য নিয়ে আসবে।

default-image

কর্মক্ষেত্রে নারীর সঙ্গে বৈষম্য শুরু হয় তৃণমূল থেকে। মেয়েরা ছেলেদের সমানই কাজ করে কিন্তু পারিশ্রমিকে আকাশপাতাল ফারাক। আমাদের মানসিকতায় ঢুকে গেছে মেয়েদের কম দিতে হয়। অফিসে, ব্যাংকে মেয়েরা সমান বেতন পেলেও আচরণে বৈষম্য দেখা যায়। একটি অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে তাঁর পুরুষ সহকর্মীরা সব সময় যথাযথ সম্মান দিতে পারেন না। প্রায়ই তাঁর শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে হাসিঠাট্টা চলে। এগুলো একটি মেয়ের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। তবে দিন বদলাচ্ছে। তাই তিনি আশা করেন, শিক্ষিত যুবসমাজ এ বিষয়ে আরও সচেতনতা দেখাবে।

বিজ্ঞাপন

রওশন যখন ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখন মাত্র ১১ জন মেয়ে ক্লাস করত। এখন শত শত মেয়ে কাজ করছে। প্রতিযোগিতা বেড়েছে। কিন্তু পরিশ্রম কমেনি। গাইনির কাজে অনেক পরিশ্রম লাগে। একটি শিশুকে গর্ভ থেকে বের করতে, অপারেশন করতে অনেক ফিজিক্যাল প্রেশার নিতে হয়। অন্যান্য দেশে এই কাজ পুরুষেরা করে কিন্তু আমাদের দেশে এই কাজ মেয়েরাই করেন।

default-image

আজকাল ভাসকুলার, অর্থপেডিক ও অন্যান্য সার্জারিতে মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যখনই তিনি সন্তানসম্ভবা হন, তখনই তাঁকে কটূ কথা শুনতে হয়। মেটারনিটি লিভ নিয়ে কথা শুনতে হয়। তাঁর কাজের দক্ষতা নিয়ে কথা ওঠে। অথচ তাঁকে এই সময় দ্বিগুণ সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন। অফিসে বাচ্চা রাখার সুবিধা, ব্রেস্ট-ফিডিংয়ের জায়গা রাখতে হবে। রওশন আরও বলেন, নারী চিকিৎসককে প্রায়ই নাইট ডিউটি করতে হয়। তাঁকেও করতে হয়েছে। তাই যাঁরাই চিকিৎসক মেয়েকে বিয়ে করাবেন, মাথায় রাখবেন, যখন–তখন তার কল আসবে, তাঁকে ডিউটিতে যেতেই হবে। এ বিষয়ে মনস্থির করতে পারলেই পরিবর্তন সম্ভব।

করোনার সময়ে যাঁরা ফ্রন্টলাইনার হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের স্যালুট জানান চিকিৎসক রওশন আরা। ওই সময়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। পিপিই অ্যাভেইলেবল ছিল না, তাই ছাতার কাপড় দিয়ে বা প্লাস্টিক দিয়ে পিপিই বানিয়ে তারা কাজ করেছেন। কারণ, প্রসববেদনা উঠলে মায়েরা হাসপাতালে আসবেনই। এসে তাঁরা যেন হাসপাতাল খালি না পান, সেই চেষ্টাই চিকিৎসকেরা করে গেছেন। ওই সময়ে মেয়েরা রাতে একটা, তিনটা, চারটায় কাজ করেছেন। তাঁরা এমনও বলেছেন, সেবা দিতে গিয়ে যদি মরেও যাই, ভয় পাই না। ফ্রন্টলাইনের মেয়েরা, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কেউই ডিউটি খালি রাখেননি। টেলিমেডিসিনে চিকিৎসকেরা সারা দেশে কাজ করেছেন। পলিসি লেভেলে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা গেছে কিন্তু আমাদের নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা দমে যাননি। কোভিড, নন-কোভিড সবাইকে তারা সেবা দিয়ে গেছেন।

ছোট থেকেই চিকিৎসক রওশন আরার ইচ্ছা ছিল গ্রামে ফিরে যাবেন। অসহায় মানুষকে সেবা দেবেন। এটা তাঁর বাবার ইচ্ছাও ছিল। তিনি বাবার ইচ্ছা পূরণ করেছেন। নিজের গ্রামে তিনি মা–বাবার স্মরণে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন। করোনার সময়ে এই হাসপাতাল থেকে সবাইকে টেলিমেডিসিনে সেবা দেওয়া হয়েছে। করোনার প্রকোপ কমেছে, চিকিৎসকদের একটি দলও সেখানে কাজ করা শুরু করেছে। তাঁর বাবা সব সময় বলতেন, কখনো অর্থের পেছনে ছুটবে না। সব সময় নিজের নীতিতে, কাজে অটল থাকো। জীবনের এই প্রান্তে এসে চিকিৎসক রওশন আরা অভিভাবকের ইচ্ছা অনুযায়ী নিজের শিকড়েই ফিরে যাচ্ছেন। এখন থেকে তিনি গ্রামেও সমানতালে চিকিৎসাসেবা দেবেন। প্রাইমারি শিক্ষক, পোশাককর্মী, মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে বিনা খরচে চিকিৎসা ও অপারেশন করা হবে। ডা. রওশন আরা মনে করেন, এঁদের জন্য এটুকু করাই যায়। তিনি মনে করেন, যে যেখানেই থাকেন না কেন, সবার উচিত অন্তত একবার নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়া। গ্রামের মানুষগুলো মনে রাখে, তাদের এই মেয়েটা বা ছেলেটা ডাক্তার। একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়। সবারই উচিত ওটাকে সম্মান দেওয়া।

আর এসব কাজের পাশাপাশি সংসার ব্যালান্স করাটাও জরুরি। সব নারী চিকিৎসক সংসার করেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন। হয়তো একসঙ্গে খাওয়া হয়নি, একসঙ্গে পার্টিতে যাওয়া হয়নি। এই ব্যাঘ্যাত হয়েছে কিন্তু এটা তো মেনে নিতেই হবে। একজন ডাক্তার মেয়ের জীবন তো অন্যদের মতো নয়। কিন্তু এরপরও ব্যালান্স করে নিয়েছেন তিনি। একসঙ্গে খাওয়া হয়নি কিন্তু রাতে খাবার রান্না করে রেখেছেন। পার্টিতে যেতে পারেননি কিন্তু সন্তান কী পরবে তা ঠিক করে রেখে গেছেন। কাজ এবং কাছের মানুষ, কাউকেই তো বাদ দেওয়া যায় না। যাঁরা আজ সিনিয়র ডাক্তার হয়েছেন, সবাইই এভাবে ব্যালান্স করেই এই পর্যায়ে এসেছেন।

সবশেষে ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, নারীকে ভাবতে হবে তিনি একজন মানুষ। আর তিনি যাঁদের সঙ্গে কাজ করেন, তাঁদেরও মনে রাখতে হবে নারীরাও মানুষ। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হলেই আমরা সুখী এবং সফল আগামী গড়ে তুলতে পারব।

বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন