default-image

উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা সাধারণত বিদেশ যান। এর বিপরীত দিকটিও আছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হাতেকলমে শিখতে ভিনদেশি চিকিৎসকেরাও বাংলাদেশে আসছেন। তাঁদের শেখাচ্ছেন এ দেশের চিকিৎসকেরা। দাঁতের চিকিৎসায় এমনই উদাহরণ তৈরি করেছেন ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের দন্ত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুর রহমান। গত আগস্ট মাসে তাঁর কাছে তাইওয়ান থেকে চারজন দন্ত চিকিৎসক এসেছিলেন ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট বা কৃত্রিম দাঁত বসানোর পদ্ধতি হাতেকলমে শিখতে। ঘটনাটির পোশাকি নাম ছিল কর্মশালা। শিরোনাম ছিল: ‘হ্যাভ ইট অ্যান্ড ফিল ইট: ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট ফর অল’।

যত সহজে বিষয়টি বলা হলো বাস্তব ঘটনা তত সহজ নয়। দাঁতের চিকিৎসায় ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট আধুনিকতম প্রযুক্তি। অন্যদিকে প্রযুক্তিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সৈয়দ আতিকুর রহমান বিদেশিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেননি। শর্ত ছিল বিদেশিরা সঙ্গে করে ইমপ্ল্যান্ট আনবেন। সেই সব ইমপ্ল্যান্ট বিনা মূল্যে দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের মুখে লাগানো হবে। বনানীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ৮ ও ৯ আগস্ট ১৭ জন রোগীর মুখে এসব ইমপ্ল্যান্ট লাগানো হয়। এই কর্মশালার আয়োজন করে সৈয়দ আতিকুর রহমানের নিজস্ব সংগঠন বর্ন টু লিভ ফাউন্ডেশন। সহায়তা করে জেটিকে ফাউন্ডেশন।

সৈয়দ আতিকুর রহমান বললেন, ‘আমি চাই সাধারণ মানুষ এই আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পাক, তাই বিনা মূল্যে তাদের ইমপ্ল্যান্ট দিয়েছি। যাঁরা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তাঁরা দেশে ফিরে বাংলাদেশের সুনাম করবেন। এটা কম কী!’

default-image

কোন সে প্রযুক্তি

দাঁতের সমস্যার শেষ নেই। অনেকের দাঁত পুরো পড়ে যায়, অনেকের অর্ধেক আবার অনেকের দাঁত ভেঙে যায়। অনেকে দাঁত ফেলে দেন। দাঁতের অভাবে চিবিয়ে খাওয়া যায় না, খাওয়ার আনন্দও পাওয়া যায় না। তাঁদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা হচ্ছে দাঁত প্রতিস্থাপন।

এই প্রযুক্তিতে চোয়ালের হাড়ে একটি স্ক্রুর মতো পদার্থ ঢোকানো হয়, যা দাঁতের শিকড়ের কাজ করে। স্ক্রুর মতো বস্তুটি টাইটেনিয়াম দিয়ে তৈরি। টাইটেনিয়ামের বিশেষ গুণ হচ্ছে এর গায়ে হাড় গজাতে পারে। চোয়ালের হাড়ে দুই–তিন মাস থাকার পর ধাতব স্ক্রুর খাঁজে খাঁজে হাড় লেগে যায়। ফলে এটি আর বের হয়ে আসতে পারে না। শক্তভাবে চোয়ালের হাড়ের সঙ্গে আটকে থাকে। এরপর এই স্ক্রুর ওপরে ক্রাউন বা ক্যাপ লাগানো হয়। কৃত্রিম দাঁত হলেও তা কাজ করে জন্মগত দাঁতের মতোই।

নিলুফার ইয়াসমিন কাজ করেন বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে। তাঁর মুখে ও দাঁতে অনেক সমস্যা ছিল। তাঁর মুখে বড় অস্ত্রোপচারসহ ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট করেছেন দন্ত চিকিৎসক সৈয়দ আতিকুর রহমান। নিলুফার ইয়াসমিন বললেন, ‘আমি বোঝাতে পারব না আমার দাঁতে কত সমস্যা ছিল। ভালো করে খেতে এমনকি ভালো করে কথাও বলতে পারতাম না। অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট করার পর আমি এখন অনেক ভালো আছি। দাঁতের এমন চিকিৎসা হতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল।’

ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট আসার আগে বিকল্প কী ছিল? দুটো দাঁতের মাঝে কোনো দাঁত পড়ে গেলে চিকিৎসকেরা ‘ব্রিজ’ ব্যবহার করেন। দুই পাশের দুটি ভালো দাঁতের সহায়তা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দাঁতে ক্রাউন বা ক্যাপ পরানো হয়। এটাই বহু দিন ধরে চলে আসছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, পাশের দুটি দাঁতের কিছু ক্ষতি করে এই প্রযুক্তি। তবু এটি মন্দের ভালো। তবে ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট অন্য দাঁতের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।

সাহস চাই সাহস

সৈয়দ আতিকুর রহমানকে প্রশ্ন করলাম কোথায় ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্টের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন? উত্তরে বললেন, ‘সাহস চাই সাহস। আমি সেই অর্থে হাতেকলমে কারও কাছে শিখিনি। বইয়ে পড়েছি, ইন্টারনেট ঘেঁটেছি। সাহস করে কাজে নেমে পড়েছি। এই কাজে বলতে পারেন আমি সেল্ফ মেড।’

সৈয়দ আতিকুর রহমানের জন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে। অনেক সাধ থাকলেও তা মেটানোর সাধ্য ছিল না। উচ্চতর ডিগ্রির জন্য বিদেশে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের ওপর চাপ দেননি। সব সময় মুখে হাসি এনে কথা বলেন। কথা বলেন জোর দিয়ে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। মুখের বা দাঁতের কোনো সমস্যা তাঁর কাছে সমস্যা নয়, সমাধান দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। চিকিৎসক ও বন্ধু মহলে রাজু নামেই পরিচিত। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসহায়তায় গড়ে তুলেছেন বর্ন টু লিভ ফাউন্ডেশন। ঢাকা ডেন্টাল কলেজ থেকে বিডিএস ডিগ্রি নেওয়ার পর দন্ত চিকিৎসার ওপর দেশেই এমসিপিএস, এফসিপিএস ও এমএস করেছেন। তিনি মূলত অরো ডেন্টাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন। মুখের হাড়, চোয়াল ভাঙলে তা মেরামত বা জোড়া লাগানোর কাজ করেন তিনি।

দাঁতের সমস্যা অনেক মানুষের। কিন্তু ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট অনেক দামি হওয়ায় তা শুধু ধনীরাই ব্যবহার করতে পারেন। সৈয়দ আতিকুর রহমান বললেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পাবে না—এটা আমি মানতে পারছিলাম না। তাই এ ক্ষেত্রে নেমে পড়ি। আমি চেষ্টা করছি ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসে। এর চাহিদা যেন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হয়।’

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রিজ করতে গেলে দুটো দাঁতের খুব ক্ষতি হয়। এ জন্য সৈয়দ আতিকুর রহমান যে কাজটি করছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কম দামে বেশি মানুষকে ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতো তরুণ চিকিৎসকেরা এগিয়ে এলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার আরও অনেক উন্নতি হবে।’

গল্পটা এ রকম

২০১৪ সালে জি জ্যাং নামের চীনের একজন চিকিৎসক বাংলাদেশে এসেছিলেন, তিনি একই সঙ্গে ব্যবসায়ী। ওই হার্ভার্ড ফেলো ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্টের নকশা করতেন। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কী করে বাড়ানো যায় তা নিয়ে তিন ঘণ্টার সভা হয় সৈয়দ আতিকুর রহমানের সঙ্গে। দুজনের মধ্যে একটি চুক্তির মতো হয়। সৈয়দ আতিকুর রহমান চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেবেন, আর বিভিন্ন কর্মশালায় ইমপ্ল্যান্ট দেবেন জি জ্যাং।

২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ দেশের প্রায় ৫০০ দন্ত চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সৈয়দ আতিকুর রহমান। দেশে বর্তমানে প্রায় ১০০ দন্ত চিকিৎসক ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্টেশন করতে পারেন। সৈয়দ আতিকুর রহমান বলেন, কাজটি এখন ছড়িয়ে গেছে। অনেকে কাজ করছেন বলে ইমপ্ল্যান্টের চাহিদা বেড়েছে। দামও কমেছে।

২০১৬ সালে চীন থেকে চারজন চিকিৎসক প্রথম এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে যান। সৈয়দ আতিকুর রহমান বলেন, ‘তাঁরা ওই দেশে ইমপ্ল্যান্ট শুরু করেন। আমার ও বাংলাদেশের প্রতি তাঁদের আস্থা বেড়ে যায়। তাঁদের দেখাদেখি গত বছর ও এই বছর চীন ও তাইওয়ান থেকে চিকিৎসকেরা বাংলাদেশে এসেছেন। বিদেশিরা জানতে পারছেন আমরাও পারি।’ ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট এখন আর দূরের প্রযুক্তি না। ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট এখন মধ্যবিত্ত, দরিদ্র সবার।

চীন বা তাইওয়ানের চিকিৎসকেরা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতেই পারেন। কিন্তু ওই সব দেশে প্রশিক্ষণ খরচ অনেক বেশি। বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন বিনা মূল্যে। ওঁদের শুধু ইমপ্ল্যান্ট আনতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0