default-image
বিজ্ঞাপন

১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে দিনটি ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। দিনটি স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করে। ২০২১ সালের ৭ এপ্রিল, বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের জন্য ডব্লিউএইচও ‘উন্নততর, স্বাস্থ্যকর বিশ্ব গড়ার’ প্রতিপাদ্যটি বেছে নিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার অসমতার দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে স্বাস্থ্যকর বিশ্ব গড়ার জন্য সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে বিশ্বব্যাপী আয়োজিত এটি একটি সচেতনতা দিবস। স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য মানের সন্তুষ্টি হলো জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক বিশ্বাস, অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থার বৈষম্য ছাড়াই প্রত্যেকটি মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার।  

যখন কোভিড-১৯ মহামারিটি আঘাত হানে, তখন চিকিত্সা পরিষেবা ছাড়া সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কোভিড নিয়ে বাংলাদেশ লড়াই করার কারণে হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলো বন্ধের ফলে মানুষের, বিশেষত দরিদ্র পরিবারের স্বাস্থ্য ও খাদ্যের ওপর এক বিপর্যয়কর প্রভাব পড়েছে। কোভিডের কারণে স্বাস্থ্যসেবার যে বাধা তৈরি হয়েছে, তার ফলে বাংলাদেশে আরও মৃত্যু বাড়তে পারে।  

কোভিড সারা দেশকে আঘাত করেছে। তবে এর প্রভাব সেই গোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বেশি পড়েছে, যারা ইতিমধ্যে ঝুঁকির মধ্যে ছিল এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলো যাদের পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাদের জন্য মহামারি মোকাবিলা করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে প্রতিকূল পরিণতিগুলো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, কোভিড আমাদের দেখিয়েছে যে কিছু মানুষ স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে সক্ষম এবং তারাই অন্যের চেয়ে উন্নততর স্বাস্থ্যসেবাগুলোর সুবিধা পাচ্ছে।

কোভিড মহামারি স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অসমতার বিষয়টি তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ বর্তমান সংকটের জন্য শারীরিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে লড়াই করছে। এ লড়াই তাদের স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং এর ফলে তাদের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়ছে। স্বাস্থ্যবৈষম্য একটি অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা। এ যন্ত্রণা এড়ানো যায়, এমন অসুস্থতা, অক্ষমতা ও অকালমৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে সাধারণ মানুষকে। এ প্রক্রিয়া বিদ্যমান অসুবিধাকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির ক্ষতি করে। আয় ও সম্পদ, আবাসন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পরিষেবা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, পরিবহন, সামাজিক পরিবেশ, জননিরাপত্তা এবং শারীরিক পরিবেশ—৯টি নির্ধারক হলো স্বাস্থ্যবৈষম্যের চালক।

বিজ্ঞাপন

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে যে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অল্প কিছু মানুষের জন্য সংরক্ষিত ও বিলাসবহুল হওয়া উচিত নয়। এ কারণেই প্রত্যেকটি মানুষের জীবনযাপন ও কাজের পরিবেশ সুস্বাস্থ্যের পক্ষে উপযুক্ত রাখতে সহায়তা করার জন্য ডব্লিউএইচও বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা নেতাদের অনুরোধ করছে, যাতে সবাই যেকোনো পর্যায়ের মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পায়।

স্বাস্থ্য–অসমতার মূল কারণগুলো মোকাবিলায় আমাদের সবার ভূমিকা রয়েছে। যখন সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী ও সমাজের প্রত্যেক সদস্য আমরা একসঙ্গে কাজ করব, তখন স্বাস্থ্য–অসমতার মোকাবিলায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য হ্রাস করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

স্বাস্থ্যসেবার অসমতা হলো বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অবস্থার অসম বণ্টন থেকে তৈরি হওয়া মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিরোধযোগ্য, অন্যায় ও অন্যায্য পার্থক্য, যা মানুষের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, অসুস্থতা প্রতিরোধে তাদের ক্ষমতা হ্রাস করে।

স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যগুলোর মধ্যে জাতি, লিঙ্গ, শিক্ষা, আয়, অক্ষমতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং যৌন দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত। যে পরিস্থিতি চিহ্নিত স্বাস্থ্যবৈষম্য বাড়িয়ে তোলে, তার কারণগুলো সমাজের সব সদস্যের জন্য ক্ষতিকর।

কোভিড মহামারি ইতিমধ্যে সমাজের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার অসংখ্য বৈষম্য উদ্‌ঘাটন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ মহামারিতে দরিদ্র মানুষ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নগর ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ, উদ্বাস্তু এবং সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার অসমতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোভিড স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য এবং তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত রোগের বোঝা বাড়িয়ে তুলেছে। তাই এটিকে সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের জন্য সহসংঘটিত, সিনারজিস্টিক মহামারি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া কোভিড নিঃসন্দেহে আরেকটি জনগোষ্ঠীর ওপর অন্যদের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। বয়স্কদের মধ্যে ৮০ বছর বা তারও বেশি বয়সীদের মৃত্যুহার বেশি। সব বয়সের নারীদের তুলনায় পুরুষদের মৃত্যুহার বেশি। বিশ্বব্যাপী কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে মৃত্যুহার অন্যদের চেয়ে ২–৩ গুণ বেশি।

আমরা কীভাবে স্বাস্থ্যবৈষম্য হ্রাস করতে পারি?

সরকারের উপার্জন সহায়তা, যেমন কর ও বেনিফিট সিস্টেমস, করোনাভাইরাস জব রিটেনশন স্কিম (সিজেআরএস), স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর আবাসনসুবিধা বৃদ্ধি, মহামারিজনিত বেকার পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা ইত্যাদি সিওভিডি-১৯–এর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এগুলো অর্থ–সম্পর্কিত স্বাস্থ্যবৈষম্য কমিয়ে আনতে উপকারী হতে পারে।

আমরা জানি যে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো ব্যয় বাঁচানোর জন্য নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম ওষুধ গ্রহণ করে। মহামারি চলাকালে স্বল্প আয়ের ব্যক্তি বা পরিবারগুলোকে সহায়তা করার জন্য স্বল্পমূল্যে বা নিখরচায় চিকিৎসা দেওয়া বা চিকিৎসার তহবিল সরবরাহ করা যেতে পারে।

মহামারি চলাকালে স্বাস্থ্যসেবা খাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। চেম্বারে গিয়ে ডাক্তার ও রোগীর ঐতিহ্যবাহী ‘মুখোমুখি পরামর্শ’ এখন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। চিকিত্সকেরা এখন টেলিমেডিসিন বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেছেন। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগানো যেতে পারে আরও প্রবলভাবে।

বিজ্ঞাপন

সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে শিশুদের বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহ করা যেতে পারে। রোগপ্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে দামের প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারে সরকার। এটি কোভিডের বোঝা কমিয়ে দিতে সহায়তা করতে পারে।

গর্ভবতী ও প্রসবোত্তর নারী, যাঁরা তাঁদের গর্ভকালীন যত্নের ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, তাঁদের অসামর্থগুলো দূর করতে স্থানীয়ভাবে সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ছাড়া শিশুদের যত্ন, শিক্ষা, আশপাশের সাহায্যসহ বাড়ি থেকে কর্মরত বাবা–মায়েদের সহায়তা করতে অনলাইন কার্যক্রম বাড়ানো যেতে পারে।

আমরা দেখেছি যে দরিদ্র জীবনযাপনের ফলে মানুষ সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট, মানসিক বিপর্যয় এবং হতাশা থেকে শুরু করে অসংখ্য স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত হয়। স্যাঁতসেঁতে, ঠান্ডা এবং জরাজীর্ণ বাসস্থান হাঁপানির মতো শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগের পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নিরাপদ পানীয় জল, পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রয়োজনীয় পানি, কার্যকর বর্জ্যনিষ্কাশন, পর্যাপ্ত খাবারের সঞ্চয়সহ একটি মানসম্পন্ন আবাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ ব্যবস্থা সংক্রামক রোগের সংক্রমণ কমিয়ে আনতে পারে। এ জন্য সরকার গৃহনির্মাণের উন্নত–স্বাস্থ্যকর মানদণ্ডসহ নির্দেশিকা, কৌশল প্রবর্তন করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের উন্নত জীবনযাত্রার দিকে পরিচালিত করবে এবং স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত বৈষম্য কমিয়ে ফেলবে।

আয়, সম্পদ, নিরাপদ কর্মপরিবেশের সুষ্ঠু বণ্টন এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমান স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ হলো উন্নতির আদর্শ পথ। স্বাস্থ্যবৈষম্য প্রতিরোধযোগ্য। তাই আসুন আমরা সবাই একটি নিরপেক্ষ, স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ ও বিশ্ব গড়ার প্রচারে যোগ দিই।

লেখক: অধ্যাপক, শিশু সার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং শিশু ইউরোলজিস্ট ও হেলথ ইকোনমিস্ট।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন