অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

মানবদেহের রক্তের মাত্র ২ শতাংশ মস্তিষ্ক ব্যবহার করে। কিন্তু এ অংশের কোষগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। অক্সিজেন বা শর্করা সরবরাহে সমস্যা হলে দ্রুত এই কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলেও নালিকাগুলো ফেটে গিয়ে স্ট্রোক হয়। এ সময় যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নিতে হয়, তা না হলে কোষগুলো শরীরের যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করত, ওই অংশগুলো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে অথবা রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে।

default-image

স্ট্রোক বিষয়ে সচেতন করতে ২৯ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। এ উপলক্ষে প্রথম আলো আয়োজন করে এসকেএফ নিবেদিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান ‘স্ট্রোক প্রতিরোধ ও পরামর্শ’। অনুষ্ঠানটির দ্বিতীয় পর্বে ডা. লুবাইনা হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ।

অনুষ্ঠানটি ২৮ অক্টোবর প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রচারিত হয় এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে স্ট্রোকে মারা যাওয়ার প্রধান কারণ অসচেতনতা। স্ট্রোকের রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমে যায় বলে মনে করেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। তিনি বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় কারও স্ট্রোক দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত, তা না হলে রোগীর মস্তিষ্কের বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। রোগী দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভুগতে পারে, আবার মৃত্যুও ঘটতে পারে।

মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে ইসকেমিক স্ট্রোক হতে পারে অথবা রক্তনালি ফেটে গিয়েও হিমোরজিক স্ট্রোক হতে পারে বলে জানিয়ে অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, স্ট্রোক হয়েছে কি না, বোঝার উপায়গুলো হলো, হঠাৎ শরীরের একদিকে দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া। কথা অস্পষ্ট, জড়িয়ে যাওয়া বা একেবারে বুঝতে ও বলতে না পারা। চোখে ঝাপসা দেখা। দুটো দেখা বা একেবারেই না দেখা। হঠাৎ মাথা ঝিমঝিম, ঘোরা, হতবিহ্বল হয়ে পড়া বা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা। মারাত্মক লক্ষণ হলো হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, বমি, খিঁচুনি বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।

লক্ষণগুলো সঠিকভাবে নির্ণয় করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে চলা সম্ভব। সহজে ও দ্রুত স্ট্রোক শনাক্ত করার কার্যকর একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন চিকিৎসকেরা, যাকে বলে ফার্স্ট। এর সাহায্যে যেকোনো সাধারণ মানুষও স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিনে নিতে পারেন। স্ট্রোক হওয়ার সময় এই লক্ষণগুলো ভালোভাবে দেখতে হয়।

ফার্স্টের (first) পূর্ণাঙ্গ রূপগুলো জেনে নেওয়া যেতে পারে:
• এফ (f) ফর ফেস: অর্থাৎ লক্ষ করতে হবে রোগীর চোখমুখ ঝুলে গেছে কি না। অথবা মুখ বেঁকে গেছে কি না বা হাসলে মুখ বেঁকে যাচ্ছে কি না।
• আই (i) ফর আর্মস: হাত-পায়ে শক্তি কমেছে কি না। রোগী নিজে নিজে দুই হাত ওপরে তুলতে পারে কি না এবং একইভাবে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে পারে কি না।
• এস (s) ফর স্পিচ: খেয়াল করতে হবে কথা বলতে গেলে জড়তা আসে কি না অথবা মুখের কথা এলোমেলো হয়ে যায় কি না।
• টি (t) ফর টাইম: যদি ওপরের তিনটি লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা যায়, তবে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিউরোলজির চিকিৎসা দেওয়া হয়, এমন হাসপাতালে নিতে পারলে ভালো।

তবে স্ট্রোক প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে বেশি জোর দেন অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। অনুষ্ঠানে দর্শকদের নানা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, স্ট্রোক একটা প্রতিরোধযোগ্য রোগ। একবার আক্রান্ত হলে চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি। তাই প্রতিরোধই উত্তম। এ জন্য সচেতন হতে হবে এবং জানতে হবে। বেশি পরিমাণে লবণ খাওয়া, চর্বি খাওয়া এবং রক্তে অতিমাত্রায় কোলেস্টেরলের উপস্থিতি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ায়। আমাদের দেশে শতকরা ৬০-৭০ ভাগ রোগী অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা হিসেবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে থাকে। যদিও স্ট্রোকের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা এখনো সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0