বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা নিতে ব্যক্তির নিজের ব্যয় কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্ট সেলের ফোকাল পারসন সুব্রত পাল। অন্যদিকে ব্যক্তির নিজের ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের গবেষণা পরিচালক মো. নুরুল আমিন।

সেবা নিতে গিয়ে ব্যক্তি যে আর্থিক চাপে পড়ছে, তার সঙ্গে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য রাখা বরাদ্দের সম্পর্ক আছে। বহুদিন ধরে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ একই ধারায় চলছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। অবশ্য স্বাস্থ্য খাতের সাফল্যের বর্ণনা করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘আমরা আহ্বান করব স্বাস্থ্য খাতে বাজেট যেন বাড়ানো হয়।’ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, এ পর্যন্ত ১৯ হাজার কোটি টাকার টিকা কেনা হয়েছে। এই খরচের মধ্যে বিমানে টিকা আনার খরচ বা অন্যান্য খরচ ধরা হয়নি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওষুধের অপচয় হয়, নষ্ট হয়। ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লেখা ও ওষুধ বিক্রির ওপর নজরদারি বাড়ানো দরকার। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় কমাতে সরকার বিকল্প হিসেবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা প্রণোদনার কথা ভাবতে পারে।

ব্যক্তির ওপর চাপ বাড়ছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ নিশ্চিত করতে হলে ব্যক্তির ওপর স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমাতে হবে। এই চাপ কমাতে ২০১২ সালে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ২০১২-৩২ সাল মেয়াদি একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ক্রমান্বয়ে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে আনা হবে এবং ২০৩২ সালে ব্যক্তির ব্যয় কমে হবে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৩২ শতাংশ। যখন ওই কৌশলপত্র করা হয়েছিল, তখন ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল ৬৪ শতাংশ।

ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় না কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং উল্টোটা ঘটছে। ২০১৫ সালে ব্যক্তির ব্যয় ৬৪ থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশ হয়েছে।

এই ঊর্ধ্বগতি থেমে থাকেনি। সর্বশেষ ২০২০ সালে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের গবেষণায় দেখা যায়, ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় আরও কিছুটা বেড়েছে। গতকালের অনুষ্ঠানে বলা হয়, স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যক্তি নিজেই বহন করেন।

তাহলে সরকার কী করছে? তারও উত্তর দিয়েছেন গবেষকেরা। তাঁরা দেখেছেন, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ে সরকারের ভাগ ১৯৯৭ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে ছোট হচ্ছে। সর্বশেষ হিসাবে কিছুটা বেড়েছে।

default-image

কোথায় যায় টাকা

গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ব্যক্তির সিংহভাগ টাকা চলে যায় ওষুধের পেছনে। অর্থাৎ বছরে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে মোট ১০০ টাকা খরচ করলে তার মধ্য থেকে ৬৪ টাকা চলে যায় ওষুধ কিনতে।

ব্যক্তির ব্যয়ের অন্য খাতটি হাসপাতাল। ১২ শতাংশ টাকা ব্যয় হয় হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে। আর হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে সেবা নিতে ১১ শতাংশ ব্যয় হয়। অন্যদিকে ৮ শতাংশ ব্যয় হয় ল্যাবরেটরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এক্স-রেসহ নানা ধরনের সেবার পেছনে। বাকি ৫ শতাংশ অর্থ চলে যায় স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত পেশাজীবীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পেছনে।

অনুষ্ঠানে অবশ্য এ-ও বলা হয় যে বাংলাদেশ ওষুধে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দেশে ওষুধের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম। অবশ্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্যক্তির টাকা কোন খাতে কত যায়, সেই তথ্যও তুলে ধরেন গবেষকেরা। তাতে দেখা যায়, দেশটিতে ওষুধের জন্য ব্যয় হয় ২৮ শতাংশ। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সাধারণ ও বিশেষায়িত হাসপাতালের অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগে খরচ হয় ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ। বাকি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ খরচ হয় রোগীর যাতায়াতের পেছনে।

কেন বেশি ব্যয়

গবেষকেরা বলছেন, দেশের মানুষ কোন হাসপাতাল বা কার কাছ থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে, সেটিও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ কম। কিন্তু মাত্র ১৪ দশমিক ৪১ শতাংশ মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে যায়। এর মধ্যে আছে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র (৫.২২ শতাংশ), উপজেলার নিচে (৩.৬৬), জেলা হাসপাতাল ও মাতৃসদন (৩.৫৭), মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল (১.৮৭) এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান (০.০৯ শতাংশ)।

এর অর্থ হচ্ছে দেশের ৮৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেয় বেসরকারি খাত থেকে। এর মধ্যে এনজিও পরিচালিত প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নেয় ১ শতাংশের কম মানুষ। সেখানে খরচ তুলনামূলক কম। বেসরকারি খাতে অন্য যেসব জায়গা থেকে মানুষ চিকিৎসা নেয়, সেখানে খরচ অনেক বেশি এবং তাতে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

সবচেয়ে বেশি মানুষ সেবা নেয়, গবেষকদের ভাষায় ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’ সেবাদানকারীদের কাছ থেকে। ৬০ শতাংশ মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে আছে ওষুধের দোকান, হাতুড়ে চিকিৎসক। ব্যক্তি নিজেও অনেক সময় নিজের চিকিৎসা করেন বা ওষুধ কিনে খান। বেসরকারি খাতের অন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবার জায়গা চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার। ১৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেয় এসব চেম্বার থেকে। বাকি ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা কম নেওয়ার কারণে, অর্থাৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি নির্ভরশীলতার কারণে ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় বেশি।

করোনাকালেও বেশি

গবেষকেরা দেখেছেন, সরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যায় থাকা একজন রোগীর ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গড়ে খরচ হয়েছে যথাক্রমে ১৭ হাজার ৩৮৫ টাকা ও ৩ হাজার ২৯৭ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে এমন খরচ যথাক্রমে ৬৫ হাজার ৫৫১ টাকা ও ৪১ হাজার ৬৩৭ টাকা।

একই ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে আইসিইউতে ভর্তি থাকা রোগীর ক্ষেত্রে। গবেষকেরা প্রশ্ন করেন, করোনার রোগীর একই ওষুধ হওয়ার কথা। তাহলে ওষুধের ব্যয়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পার্থক্য হবে কেন?

ক্ষতি কী হচ্ছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করতে হলে ব্যক্তিকে তার প্রয়োজনের সময় মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে মানুষ যেন সেবা নেওয়া থেকে বিরত না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণার তথ্যে সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষার বিপরীত চিত্রই ফুটে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে গবেষকেরা বলছেন, ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে দেশের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ খানা বা পরিবার, অর্থাৎ তিন কোটির বেশি মানুষ হাসপাতাল, ক্লিনিক বা কোনো চিকিৎসকের কাছে যায় না। প্রয়োজন থাকলেও তারা সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকে।

অন্যদিকে আয়ের তুলনায় চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ খানা একধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। তাতে দেখা যায়, সাড়ে ৪ শতাংশ খানার বা ৮৬ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক শ্রেণির পরিবর্তন ঘটে। যারা মধ্যবিত্ত তারা নিম্নবিত্তে, যারা নিম্নবিত্ত তারা দরিদ্রশ্রেণিতে পরিণত হয়।

রোগীর নিজ পকেটের ব্যয় হ্রাস ও রোগীকে আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরকারি হাসপাতালে সেবার মান বৃদ্ধি, ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার বৃদ্ধি, জনবল বৃদ্ধি, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদকরণ, বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে নজরদারি বাড়ানোসহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছেন ওই দুই গবেষক।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক আহমেদ মোস্তাক রাজা চৌধুরী বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তির নিজ পকেটের ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার যে পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট দিয়েছে, তা উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বা ২০৪১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।’

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন