হাঁটুর ব্যথায় অবহেলা নয়

বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারে একজন করে হলেও হাঁটুর ব্যথার রোগী আছেন। এই হাঁটুর ব্যথার কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ করার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো সাপ্তাহিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান এসকেএফ নিবেদিত ব্যথার সাতকাহনের ষষ্ঠ পর্বে।

default-image

এতে অতিথি ছিলেন ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও নিটোর সাবেক কনসালট্যান্ট ডা. পারভেজ আহসান এবং এভারগ্রিন ইয়োগা প্রতিষ্ঠানের যোগ প্রশিক্ষক বাপ্পা শান্তুনু। সঞ্চালনায় ছিলেন অমৃতা তালুকদার। অনুষ্ঠানটি ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো ও এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রথমে জানা গেল হাঁটুর ব্যথার কারণ সম্পর্কে। জন্মগতভাবে হাঁটুর প্যাটেলা বা বাটি স্থানচ্যুত হলে, ওজনাধিক্য, আঘাত পেলে বা খেলতে গিয়ে যদি মিনিস্কাস, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়, বাত, গাউট, হাই লেভেল ইউরিক অ্যাসিড ইত্যাদির জন্য হাঁটুর ব্যথা হয়ে থাকে।

default-image

এ ছাড়া মহিলাদের মেনোপোজ হলে এ ব্যথার প্রকোপ বাড়ে। আর বয়সজনিত হাড়ক্ষয় বা অস্টিওপরোসিস এবং অস্টিও-আর্থ্রাইটিস হলে অনেক বেশি পরিমাণে হাঁটুর ব্যথা হয়ে থাকে বলে জানান ডা. পারভেজ আহসান।

হাঁটুব্যথা নিয়ে যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক বাপ্পা শান্তুনু বলেন, ‘লাইফস্টাইলের অনিয়মের জন্য আমরা সবচেয়ে বেশি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকি। এরপর আবার আমরা অসুস্থ হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে নিজে নিজে চিকিৎসা করি। এটাও ঠিক নয়। রোগ হলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। আর অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খেলে, অনিয়মিত ঘুম আর স্ট্রেসের কারণে ব্যথা হয়ে থাকে।’ অনুষ্ঠানে তিনি হাঁটুর ব্যথার রোগীদের জন্য বেশ সহজ ধরনের যোগব্যায়াম করে দেখান।

default-image

যাঁরা ডেস্ক জব করেন, তাঁদের উপযোগী এই ব্যায়াম চেয়ারে বসে করা যাবে। এ ছাড়া তিনি আরও বলেন, টানা ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা একই পজিশনে হাঁটু রাখা যাবে না। মাঝে মধ্যে একটু নাড়াচাড়া করতে হবে বা দাঁড়াতে হবে। আর ব্যায়ামের সময় দমের ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে বলেছেন। কারণ, শরীরের প্রতিটি কোষে ঠিকমতো অক্সিজেন সরবরাহ না হলে ব্যথা কমবে না এবং শরীর ড্যামেজ হবে। তাই যাঁরা আগে থেকেই কোনো ধরনের ব্যায়াম করে থাকেন, তাঁদের পরামর্শকদের কাছ থেকে দমের ব্যাপারে ভালোভাবে জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

বিজ্ঞাপন

হাঁটুর ব্যথা পুরুষের চেয়ে নারীদের হওয়ার সম্ভাবনা বা ঝুঁকি বেশি থাকে। এ নিয়ে ডা. পারভেজ আহসান বলেন, মেনোপোজ হয়ে গেলে পোস্ট মেনোপোজাল অস্টিওপরোসিস হয়। কারণ, এ সময় তাঁদের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা যায় এবং হাড়ক্ষয় হয়। এ থেকে পরে আবার অস্টিও–আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকে। অন্যদিকে ব্যথায় লাইফস্টাইলের ভূমিকা অনেক। চলাফেরার ফলে জয়েন্টে একধরনের ফ্লুইড তৈরি হয়। এতে জয়েন্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এ ক্ষেত্রে যাঁরা বসে থাকেন, সে নারী হোক বা পুরুষ, তাঁদের এ জন্য জয়েন্টে ক্ষতি হবে এবং হাঁটুর ব্যথা আগে হবে। আর ষাটোর্ধ্ব নারী-পুরুষ সবার ব্যথার প্রবণতা অনেক।

অনুষ্ঠানে ডা. পারভেজ আহসান হাঁটুর ব্যথার আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে কিছু কথা বলেন। আধুনিক চিকিৎসায় অস্টিও-আর্থ্রাইটিসকে তিনটি স্টেজে ভাগ করা হয়। প্রাথমিক অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসায় প্রথমে ব্যথার ওষুধ দিয়ে ব্যথা কমিয়ে, ব্যায়াম করতে বলা হয়। এরপর ব্যথা না কমলে দ্বিতীয় ধাপে, জয়েন্টে ইন্ট্রা-আর্টিকুলার ভিস্কোসাপ্লিমেন্টেশন ইনজেকশন দেওয়া হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের পিআরপি, স্টেম সেল, কারটিলেজ ইমপ্ল্যাটেশন ইত্যাদি চিকিৎসা আছে। এত কিছুর পরও ব্যথা না কমলে শেষ ধাপে অপারেশন করা হয়।

স্ট্রেস ব্যথার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর কারণে আমাদের থেকে যে হরমোন বের হয়, তা হাড়ে বেশ প্রভাব ফেলে। তাই অনুষ্ঠানে বাপ্পা শান্তুনু এমন কিছু মেডিটেশন বা প্রাণায়াম করে দেখান, যা স্ট্রেস রিলিফের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

হাঁটুর ব্যথা প্রতিরোধে নজর দিতে হবে খাদ্যাভাসের দিকে। ডা. পারভেজ আহসান বলেন, ‘আমাদের দেশের খাদ্য তালিকায় কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি থাকে আর ভিটামিনে ভারসাম্য থাকে না। তাই ব্যথা প্রতিরোধে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে ফেলতে হবে। খাদ্যে সব রকমের ভিটামিনের পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে। আর চিনি–জাতীয় খাবার খাওয়া কমিয়ে দিতে হবে।’ অর্থাৎ, বেশি প্রোটিন এবং কম কার্বোহাইড্রেট ও সুগার—এই হিসাবে ব্যালান্স ডায়েট মেনে চলতে হবে। আর এড়িয়ে চলতে হবে জাঙ্ক ফুড, কার্বোনেটেড বেভারেজ।

স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন